সুস্বাদু “সয়াবিন বড়ি” আমিষের ভান্ডার, হাড়ক্ষয় রোধ ও স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।

সয়াবিন-শব্দটা আমাদের বাঙালিদের খুবই পরিচিত একটি শব্দ এবং সয়াবিন মানে আমরা সবাই সয়াবিন তেলকেই বুঝি। আমাদের দেশে সয়াবিনের তেল বহুল পরিচিত এবং ব্যাপক ব্যবহৃত হলেও সয়াবিন অর্থাত্‍ সয়া বীজ তেমন একটা প্রচলিত নয়। সয়াবিন থেকে শুধু তেল নয়, তৈরি হয় আরো অনেক কিছু। সয়া বীজ থেকে উৎপন্ন খাদ্য পণ্য যেগুলো বহুল ব্যবহৃত সেগুলো হলো- সয়াবিন তেল, সয়াবিন বড়ি, সয়া ময়দা, সয়া প্রোটিন, টফু, সয়া দুধ, সয়া সস ইত্যাদি। সয়াবিন বীজ দিয়ে তৈরি খুবই সুস্বাদু ও পুষ্টিকর একটি খাবার হলো “সয়াবিন বড়ি”। বাংলাদেশ ও ভারতে এটি খুবই জনপ্রিয়। চীন, জাপান ও কোরিয়াতে সয়াবিন বীজ থেকে তৈরি খাবার টোফু, সোয়ামিল্ক খুবই জনপ্রিয়।

বন্ধুরা, আমরা আমাদের শরীরের প্রোটিন বা আমিষের চাহিদা পূরণ করি সাধারণতঃ প্রাণীজ আমিষ দ্বারা। যেমনঃ মাছ, মাংস ডিম দুধ ইত্যাদি। কিন্তু প্রাণীজ আমিষের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি এখন আর কারো অজানা নয়। সেই তুলনায় উদ্ভিজ্জ আমিষে স্বাস্থ্যঝুঁকি একেবারেই কম বা নেই বললেই চলে। সয়াবিন বড়ি উদ্ভিদ-ভিত্তিক প্রোটিনের অন্যতম উৎস। শুকনো সয়াবিনে 36 -56% প্রোটিন রয়েছে। ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের মতে, যারা নিরামিষ খাচ্ছেন বা মাংস কম খান তাদের জন্য সয়াবিন প্রোটিনের একটি প্রধান উৎস।

সয়াবিন হচ্ছে এক প্রকারের শুঁটি জাতীয় উদ্ভিদ। অতিরিক্ত চর্বিবিহীন সয়াবিন দিয়ে তৈরি খাবার প্রাণিদেহের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনের উৎস। এই সয়াবিনের বড়ি আমাদের দেশে সুপরিচিত একটি খাবার। সয়া তৈরির উপকরণ হিসেবে ডিওসি বা সয়াবিন বীজ ভাঙা, সামান্য সুজি, পরিমাণ মতো অ্যামোনিয়া ও পানির মিশ্রণ দিয়ে এ বড়ি তৈরি করা হয়। তাই এ সবজি শতভাগ নির্ভেজাল। পাশাপাশি মাংসের মতো সুস্বাদু ও কম দামে মেলায় এর কদর দিন দিন বাড়ছে। সয়াবিনের বড়ি দিয়ে তৈরি তরকারির স্বাদই অন্যরকম। রান্না করাও খুব সহজ। সোয়াতে ভিটামিন এবং খনিজগুলি : আয়রণ, ফসফরাস, ম্যাঙ্গানীজ্, বিভিন্ন বি ভিটামিন, ফোলেট, molybdenum, থায়ামিন, কপার থাকে।

প্রোটিনের চাহিদা পূরণে প্রাণীজ আমিষের বিকল্প “সয়াবিন বড়ির” স্বাস্থ্যসুবিধা :

প্রতি ১০০ গ্রাম সয়াবিনে প্রোটিনের পরিমাণ ৪৩ গ্রাম। শর্করা রয়েছে ৩০ গ্রাম। ফ্যাট ২০ গ্রাম। ক্যালোরি ও পুষ্টিগুণের হিসাবে এই খাদ্য অনেক পুষ্টিবিদেরই প্রথম পছন্দ। শরীরচর্চায় অভ্যস্তরা নিয়মিত ডায়েটে রাখেন সয়াবিন। জানেন কি কেন? দেখে নিন কী কী গুণ রয়েছে এই খাদ্যে। তার পর ডায়েটে ব্যবহার করুন সয়াবিন।

প্রোটিনের খনি বা ভান্ডার :

উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের সেরা উপাদানগুলোর অন্যতম সয়াবিন। ভিটামিন ও প্রোটিনে ভরপুর এই খাবার আদতে সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি। সয়াবিনের প্রধান প্রোটিন গ্লাইসিনিন এবং কংগেলিসিনিন যা সয়াবিনের প্রায় ৮০% প্রোটিন উপাদান তৈরি করে। আজকাল ডায়াবিটিকদেরও নিশ্চিন্তে সয়াবিন খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। আসলে এক বাটি ডালের চেয়েও বেশি প্রোটিন রয়েছে এক বাটি সয়াবিনে। যে কোনও প্রাণিজ প্রোটিনের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে সয়াবিন। তাই নিরামিষাশীদের ডায়েটে এই খাদ্য রাখার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। সয়াবিনের প্রোটিন মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্সকে সতেজ রাখে, তার কাজ করার ক্ষমতা বাড়ায়। ফলে সহজে ক্লান্তি আসে না।

বি-ভিটামিনের কারখানা :

সয়াবিন ভিটামিন বি কমপ্লেক্সের খনি। বিশেষ করে থায়ামিন, নিয়াসিন, ফলিক অ্যাসিড ও রিবোফ্লেভিন। এই ভিটামিন হার্ট ও লিভারের সক্রিয় কার্যকলাপ বজায় রাখতে সাহায্য করে। সয়াবিনে যে প্রচুর ভিটামিন বি কমপ্লেক্স রয়েছে যার কারণে হার্ট ও লিভারকে চাঙ্গা রাখতে সাহায্য করে এই খাবার। হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে সয়াবিন।

স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ :

মেয়েদের ডায়েটে সয়াবিন রাখা অত্যন্ত কার্যকর। কারণ সয়াবিনের অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ব্রেস্ট ক্যানসার প্রতিরোধ করে।সয়াবিনে উদ্ভিদের যৌগ রয়েছে যা স্তন এবং প্রস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে। এগুলি বিভিন্ন শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করে যা অন্ত্রে স্বাস্থ্যের উন্নতি করে এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস করতে সহায়তা করে।

ফাইবার সমৃদ্ধ সয়াবিন হার্টের জন্য খুব ভালো। – বয়ঃসন্ধিকালের মেয়েদের ডায়েটে সয়াবিন রাখুন যথেষ্ট পরিমাণে। পরবর্তীকালে ব্রেস্ট ক্যান্সারের সম্ভাবনা কমে। – সয়াবিন তেলে ক্ষতিকর স্যাচুরেটেড ফ্যাট অনুপস্থিত। – সয়া মিল্কে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ কম হলেও এর আইসোফ্ল্যাবনস (এক ধরনের প্ল্যান্ট হরমোন) শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের সমান কাজ করে অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধ করে। সয়া মিল্ক দিয়ে তৈরি খাবার ক্যালসিয়াম, প্রোটিন ও ভিটামিনের ভালো উত্‍স। সয়া মিল্কে গরুর দুধের সমমানের প্রোটিন রয়েছে। মিল্ক প্রোটিনে যাদের অ্যালার্জি আছে তারা নির্দ্বিধায় খেতে পারেন সয়া মিল্ক। – সয়াবিন ফারমেন্ট করে সয়া সস তৈরি করা হয়। সয়া মিল্কের মতো সয়া সস উপকারী নয়।

হাড়ক্ষয় দূর করে :

প্রতি ১০০ গ্রাম সয়াবিনে পাওয়া যায় ২৮০ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম, ২৭৭ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ৭০৪ মিলিগ্রাম ফসফরাস। তাই সয়াবিন দাঁত ও হাড় মজবুত রাখে।অস্টিওপোরোসিস হলো হাড়ের ঘনত্ব হ্রাস এবং ফ্র্যাকচারগুলির ঝুঁকি বৃদ্ধি দ্বারা চিহ্নিত করা হয়, বিশেষত বয়স্ক মহিলাদের মধ্যে। সয়া পণ্য ব্যবহারের কারণে মেনোপজ ভোগা মহিলাদের মধ্যে অস্টিওপরোসিসের ঝুঁকি হ্রাস হতে পারে।

মেনোপজ পরবর্তী জটিলতা দূর :

মেনোপজ একটি মহিলার জীবনের সময়কাল যখন মাসিক বন্ধ হয়ে যায়।এটি প্রায়শই অপ্রীতিকর লক্ষণগুলির সাথে যুক্ত হয় – যেমন ঘাম, গরম ঝলক এবং খিটখিটে মেজাজ – যা ইস্ট্রোজেনের মাত্রা হ্রাস দ্বারা ঘটে থাকে। মজার বিষয় হচ্ছে, এশিয়ান মহিলারা – বিশেষত জাপানি মহিলাদের – পশ্চিমা মহিলাদের তুলনায় মেনোপজের লক্ষণগুলি কম দেখা যায়। ডায়েটে সয়া জাতীয় খাবার রাখা বা সয়া জাতীয় খাবার খাওয়ার অভ্যাস এর প্রমাণ বহন করে।

একটি জিনিস মনে রাখতে হবে যে সয়া জাতীয় খাবার ফাইটোইস্ট্রোজেন বা উদ্ভিদ হরমোন সমৃদ্ধ যা মেনোপজাসাল লক্ষণ যেমন হট ফ্লাশ, বেশি ঘাম ইত্যাদি কমাতে সাহায্য করে। অধ্যয়নগুলি ইঙ্গিত দেয় যে, সয়াবিনে পাওয়া ফাইটোইস্ট্রোজেনের (উদ্ভিদ হরমোন) একটি গ্রুপ আইসোফ্লাভোনস, এই লক্ষণগুলি হ্রাস করতে পারে।

ডায়াবেটিস কমায় :

সয়াবিন বড়ি আঁশ সমৃদ্ধ। এটি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়। সয়াবিনে পলিঅনস্যাচুরেটেড এবং মনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে যা ফ্যাট হ্রাস করতে সহায়তা করে।লিনোলিক অ্যাসিড সয়াবিনের মোট ফ্যাট সামগ্রীর প্রায় 50%। সয়াবিনে কম পরিমাণে কার্ব রয়েছে যা আপনাকে স্বাস্থ্যকর রাখতে সহায়তা করে, তবে কার্ব আমাদের দেহের গঠনের একটি উপাদান। সয়াবিন হ’ল ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য উপযুক্ত খাদ্য।

মস্তৃষ্কের জন্য ভালো :

সয়াবিনে থাকা লেসিথিন মস্তিষ্ক গঠনের অন্যতম উপাদান। তাই সয়াবিন খেলে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা তো বৃদ্ধি পায়ই সঙ্গে হাইপোথ্যালামাসকে সক্রিয় রাখে। সয়াবিনের প্রোটিন মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্সকে সতেজ রাখে, তার কাজ করার ক্ষমতা বাড়ায়। ফলে সহজে ক্লান্তি আসে না। সয়াবিনের অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট শরীরের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়ায়। সয়াবিন বিভিন্ন ধরনের বিপাক ক্রিয়ায় সাহায্য করে, যা অনিদ্রাজনিত অসুখ দূর করে সহজেই। সয়াবিনে অদ্রবণীয় ফ্যাট থাকায় তা শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রাকেও নিয়ন্ত্রণে রাখে। যাদের শরীরে রক্ত কম, তারাও ডায়েট চার্টে রাখুন সয়াবিন।

সতর্কতা :

তবে নিয়মিতভাবে প্রচুর পরিমাণে সয়া গ্রহণের সময় একই সাথে মনে রাখা উচিত অতিরিক্ত কোনো কিছুই শরীরের জন্য ভালো নয়। পরিমাণমতো খাবেন। সয়াবিন কাঁচা অবস্থায় খাবেন না। সয়াবিন ভালো করে সেদ্ধ করে খান। কারণ হজমে সাহায্যকারী এনজাইম ট্রিপসিনের কার্যকলাপ কিছুটা ব্যাহত করে সয়াবিন।

উদ্ভিদ-ভিত্তিক প্রোটিন এবং ফ্যাটগুলির অন্যতম প্রধান উৎস হল সয়াবিন, আপনি যদি নিরামিষভোজী হন, আপনার প্রোটিনের ঘাটতি দূর করতে আপনি এটি আপনার খাদ্য তালিকায় রাখতে পারেন। সয়াবিন বড়ি বা সয়া মিল্ক বা টোফু যেটাই খান না কেনো উদ্ভিদ থেকে পাওয়া এই প্রোটিন এক কথায় অনন্য। প্রাণীজ প্রোটিনের আসনটি দখল করতে পারে অনায়াসে। দিন দিন যেভাবে ওবেসিটির পরিমান বাড়ছে সেক্ষেত্রে এটি চর্বি হ্রাস করতে ব্যাপকভাবে সহায়তা করে যা কোনও চর্বিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে সহায়ক হতে পারে।

Share