যৌবন ধরে রাখতে কোন খাবার গুলো খাবেন।

শত ব্যস্থতা আমরা আমাদের সময় গুলো পার করি। কেউবা একাধারে সংসারের কাজ করার পাশাপাশি অফিসে ছুটছেন। অফিসের কাজের চাপ। এরপর বাড়ি ফিরে ছেলে মেয়েকে পড়াশোনা করানো, তাদেরকে তৈরী করাসহ সবকিছু মিলিয়ে পাহাড়সম চাপ এর ছড়াছড়ি। এ সব কিছুর মধ্যে নিজের প্রতি একটু যত্নশীল হয়ে ওঠে হয় না।

একটা অনীহা বাসা বাঁধছে আমাদের নিজেদের প্রতি। আয়নার সামনে একটু দাঁড়ানোর সময় যেন নেই বা থাকলেও ইচ্ছা করে দাঁড়াচ্ছি না। এরকম করতে করতে হঠাৎ করে একটা সময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে আবিষ্কার করলেন- এ এক অন্য, সম্পূর্ণ নতুন আপনি। আপনি নিজেকে চিনতে পারছেন না।

অনেকক্ষণ দেখলেন আপনাকে। খুঁজে পেলেন এক অচেনা আপনাকে যাকে এর মধ্যে বয়সের থেকে বেশী বয়স্ক লাগছে। এই জায়গা থেকে যদি আপনি নিজেকে রক্ষা করতে চান, আপনার ত্বককে, আপনার লাবন্যকে, আপনার যৌবনকে ধরে রাখতে চান তাহলে নিচের বিষয়গুলি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।

সংসারের সকল দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজের প্রতিও খেয়াল রাখুন। বয়স চল্লিশ পেরোলেই শরীরে একটা বার্ধক্যের ছাপ পড়তে শুরু করে। চোখে-মুখে বলিরেখা, ত্বকে ভাঁজ, ত্বক কুঁচকে যাওয়া, ত্বক ঝুলে পড়া, ডার্ক স্পট ইত্যাদী।

যাইহোক, প্রাকৃতিকভাবে আমরা কিভাবে আমাদের ত্বকের যৌবন ধরে রাখবো সেই সম্পকে জানবো। কোন কোন খাবারগুলি আমাদের ত্বকের লাবণ্য ধরে রাখে। তার আগে আমরা জানবো আমাদের চামড়ার নিচে থাকা একটি প্রোটিন “কোলাজেন” ও কোলাজেন ধংসকারী ফ্রি-রেডিক্যালস সম্পর্কে।

কোলাজেন কি?

কোলাজেন হল আমাদের শরীরে উৎপন্ন একটি প্রোটিন যা ত্বকের বর্ণকে উজ্জ্বল, দৃঢ়, সতেজ এবং তারুণ্যদীপ্ত করে। এছাড়াও আমাদের হাড়, ত্বক, মাংস পেশী এবং লিগামেন্ট ইত্যাদির অন্যতম প্রধান উপাদান।

কোলাজেন রক্তনালী, কর্নিয়া এবং দাঁত সহ শরীরের অন্যান্য অনেক অংশেও পাওয়া যায়। আমরা কোলাজেন দেখতে পারিনা। এটি স্বাস্থ্যকর ত্বকের সারাংশ।

ফ্রি-রেডিক্যালস কি?

ফ্রি র‌্যাডিকালগুলি হল তীরের মতো যা কোলাজেন ফাইবারগুলিকে ছিদ্র করে এবং ভেঙে দেয়, ত্বককে পাতলা করে তোলে। ফ্রি-রেডিক্যালস-এর কাজ হলো আমাদের ত্বকের উপর যে কোলাজেন থাকে তাকে নষ্ট করে দেওয়া।

তবে অতিবেগুনি রশ্মি, ধূমপান, দূষণ, স্ট্রেস এবং অন্যান্য কারণে ত্বকে ফ্রি র‌্যাডিক্যাল তৈরি করে সর্বনাশ ডেকে আনে। সূর্যকে বেশি ভয় পাবার দরকার নেই। অতিরিক্ত সূর্যের তাপে ত্বকের কিছুটা ক্ষতি হয় তবে ত্বকের সবথেকে বড়ো শত্রু হলো দূষণ।

আমাদের ত্বক টান টান করে রাখে কোলাজেন নামের প্রোটিন। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে দেহে কোলাজেনের উৎপাদন কমে যায়। ফলে ত্বক কুঁচকে যেতে থাকে, বলিরেখা পড়তে শুরু করে। খাদ্যতালিকায় কোলাজেনসমৃদ্ধ খাবার থাকলে তা যৌবন ধরে রাখতে সাহায্য করে। নিচে এমন কিছু খাবার দেওয়া হলো। যেগুলো আমাদের ত্বকে কোলাজেন তৈরি করে আমাদের যৌবন ধরে রাখতে সাহায্য করে।

বেদানা:

বেদানা বা ডালিম কোলাজেন বান্ধব। ডালিম কোলাজেনকে রক্ষা করে। ফ্রি-রাডিক্যালস উৎপন্ন হলেও কোলাজেনকে নষ্ট করতে দেবে না। গবেষকরা পরামর্শ দিয়েছেন যে, ডালিম ক্ষতিগ্রস্থ ত্বক মেরামত করতে এবং কোলাজেনের উৎপাদন করতে পারে।

আমলকি:

আমলকি প্রচুর এন্টি-অক্সিডেন্ট ও ভিটামিন “সি” সমৃদ্ধ। যা আপনার বাইরের যৌবনকে, ত্বকের যৌবনকে, ত্বকের লাবন্যকে ধরে রাখতে সাহায্য করে। অর্থাৎ ভিটামিন “সি” সমৃদ্ধ ফল আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় রাখা উচিত।

মসলা:

মশলা খাবারে স্বাদ যোগ করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। গবেষণা পরামর্শ দেয় কিছু কিছু মশলা গ্রহণ আমাদের ত্বককে আরও কম বয়সী দেখাতে সহায়তা করে। যেমন – দারুচিনি কোলাজেন উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারে, যা ত্বকের দৃঢ়তা বাড়িয়ে তুলতে এবং ত্বকের ক্ষতিও হ্রাস করতে সাহায্য করে। আদাতে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি প্রভাব রয়েছে যা সূর্যের এক্সপোজারের কারণে বর্ধিত বয়সের স্পটগুলি রোধ করতে সহায়তা করতে পারে।

টমেটো:

টমেটো উচ্চ লাইকোপিন সমৃদ্ধ। লাইকোপিন হল এক ধরণের ক্যারোটিনয়েড যা হার্টের রোগ, স্ট্রোক এবং প্রস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস করে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, যেসব মহিলারা উচ্চ লাইকোপিন এবং উচ্চ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার খেয়েছিলেন ১৫ সপ্তাহ পরে চামড়ার কুঁচকানো ভাব অনেকটাই হ্রাস পেয়েছিল। জলপাইয়ের তেলে টমেটো রান্না করে খেলে আমাদের শরীরে লাইকোপিন শোষণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

শাকসবজি:

শাকসবজি অত্যন্ত পুষ্টিকর ঘন এবং ক্যালোরি খুব কম। বিটা ক্যারোটিনের মতো ক্যারোটিনয়েড গুলো শাকসবজিতে বেশি থাকে। এগুলি সূর্যের বিকিরণ এবং ফ্রি র‌্যাডিকালের বিরুদ্ধে রক্ষা করতে পারে, যার ফলে উভয়ই ত্বকের বার্ধক্যের দিকে পরিচালিত করতে পারে। বিটা ক্যারোটিনের সেরা উৎস হল গাজর, মিষ্টি কুমড়া এবং মিষ্টি আলু। এছাড়া শাকসবজি ভিটামিন “সি” সমৃদ্ধ, যা কোলাজেন উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং এর শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রভাব রয়েছে।

ডার্ক চকোলেট:

ডার্ক চকোলেটে ফ্ল্যাভানলস নামক অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট রয়েছে যা, ত্বককে রোদের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে। তবে বিভিন্ন ধরণের চকোলেট এর মধ্যে ফ্ল্যাভনোলসের পরিমাণ বিভিন্ন রকম হয়। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, উচ্চ-ফ্ল্যাভানলস ডার্ক চকোলেট রোদে থাকতে পারার সময় দ্বিগুণ করে। যারা কম ফ্ল্যাভানল চকোলেট খেয়েছিলেন তাদের ক্ষেত্রে এটি ঘটেনি।

গ্রিন টি:

গ্রিন টিতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ বেশি, যা আমাদের ফ্রি র‌্যাডিক্যাল থেকে রক্ষা করতে পারে। পলিফেনল ত্বকের প্রধান উপাদান কোলাজেন রক্ষা করতে সহায়তা করে। এটি বার্ধক্যজনিত কিছু লক্ষণ হ্রাস করতে পারে।

অলিভয়েল:

অলিভয়েল আপনার ত্বককে আরও কম বয়সী দেখতে সহায়তা করতে পারে। গবেষণাগার অধ্যয়নের পরামর্শ দেয় অলিভয়েলের একটি শক্তিশালী অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি প্রভাব রয়েছে এবং এটি সূর্যের ক্ষয়ক্ষতি থেকে আমাদের ত্বককে রক্ষা করতে পারে।

প্রকৃতপক্ষে, চল্লিশ (৪০) এবং পঞ্চাশ (৫০) বছর বয়সের নারী-পুরুষদের এক নম্বর হত্যাকারী হল ক্যান্সার এবং হৃদরোগ দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। ডায়াবেটিস এবং স্ট্রোকও আপনার ৫০ এবং ৬০ বছর বয়সে যাওয়ার সাথে সাথে সঙ্গী হতে পারে।

তাই বয়স চল্লিশ (৪০)-পার হওয়ার পর থেকে তেলে ভাজা, চর্বিযুক্ত লাল মাংস, ফার্স্ট ফুড, স্পোর্টস ড্রিঙ্কস, কার্বোনেটেড বেভারেজ, হট সস, গ্লুটেন ফ্রি ফুড, আইস-ক্রিম ইত্যাদি খাবার খেতে নিষেধ করা হয়। এর পরিবর্তে ফলমূল, শাকসবজি, ডাল, বাদাম, টমেটো, অলিভ অয়েল, কুমড়া, সামুদ্রিক মাছ ইত্যাদি খেতে পরামর্শ দেয়া হয়।

উৎস: healthline

Share