মিষ্টি কুমড়ার বীজ হার্ট ভালো রাখে, ক্যান্সার প্রতিরোধী ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী।

চিয়া বীজ, সূর্যমুখী বীজ আরো অনেক ধরণের বীজ রয়েছে যেগুলো আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খুব ভালো। কিন্তু এগুলো আমরা সবসময় হাতের নাগালে পাই না।

একটি বীজ রয়েছে যেটা সহজলভ্য ও উপকারীতার দিক থেকেও কোন অংশে কম নয়। সেটা হলো মিষ্টি কুমড়োর বীজ। দুঃখের বিষয় হলো আমরা মিষ্টি কুমড়োর বীজের কদর করি না। কুমড়া খেয়ে আগে কুমড়ার বীজটাই ফেলে দিই।

তবে হ্যাঁ যারা ওজন কমাতে চান তারা আর এই ভুলটি করবেন না। উচ্চ ফাইবার সমৃদ্ধ কুমড়োর বীজ (pumpkin seeds) আমাদের বার বার খাওয়ার প্রবণতা কমিয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে। এছাড়া রক্তের শর্করার মাত্রা কমাতে, রক্তসল্পতা দূর করতে, ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে, ঘুমের পরিমান বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।

পুষ্টি উপাদানের ‘পাওয়ার হাউস’ মিষ্টি কুমড়ার বীজে আছে ভিটামিন “বি”, ম্যাগনেশিয়াম, প্রোটিন ও আয়রনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সব খাদ্য উপাদান। কুমড়োর বীজ “পেপিটা” নামেও পরিচিত – এটি একটি মেক্সিকান স্প্যানিশ শব্দ।

কুমড়োর বীজে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং রয়েছে পরিমাণে পলিঅনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড, পটাসিয়াম এবং ফোলেট। এছাড়াও এতে ক্যারোটিনয়েড এবং ভিটামিন “ই” এর মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট প্রদাহ হ্রাস করতে এবং কোষকে ক্ষতিকারক ফ্রি র‌্যাডিক্যাল থেকে রক্ষা করতে পারে।

মিষ্টি কুমড়োর পুষ্টি উপাদান

পুষ্টি উপাদানে ভরপুর মিষ্টি কুমড়োর বীজ খেতে বাদামের মতো। এর বেশ কয়েকটি পুষ্টি উপাদান রয়েছে তবে এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান নিচে দেওয়া হলো-

  • ক্যালোরি: ১৫১
  • ফাইবার: ১.৭ গ্রাম
  • প্রোটিন: ৭ গ্রাম
  • ফ্যাট: ১৩ গ্রাম (এর মধ্যে ৬ টি ওমেগা)
  • ভিটামিন “কে”: ১৮% (RDI)
  • ফসফরাস: ৩৩% (RDI)
  • ম্যাঙ্গানিজ: ৪২% (RDI)
  • ম্যাগনেসিয়াম: ৩৭% (RDI)
  • আয়রন: ২৩% (RDI)
  • জিঙ্ক: ১৪% (RDI)
  • কপার: ১৯% (RDI)

কুমড়া বীজের উপকারিতা:

একটু ভেজে বাদামের বিকল্প হিসাবে আমরা কুমড়া বীজ খেতে পারি। পুষ্টি উপাদান বাদামের থেকে কয়েক গুণ এগিয়ে। নিচে আর উপকারীতা সম্পর্কে বলা হলো –

হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে:

কুমড়োর বীজ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ম্যাগনেসিয়াম, জিঙ্ক এবং ফ্যাটি অ্যাসিডগুলির একটি ভাল উৎস। আর এই সবগুলো উপাদানই হার্টকে সুস্থ্য রাখতে সহায়তা করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, কুমড়োর বীজের তেল উচ্চ রক্তচাপ এবং উচ্চ কোলেস্টেরলের মাত্রাকে হ্রাস করতে পারে। যা হার্টের রোগের জন্য দায়ী।

৩৫ জন পোস্টম্যানোপসাল (postmenopausal) মহিলাদের মধ্যে ১২-সপ্তাহের গবেষণায় দেখা গেছে যে, কুমড়োর বীজ ডায়াস্টলিক রক্তচাপ ৭% হ্রাস করেছে এবং “ভাল” HDL কোলেস্টেরলের মাত্রা ১৬% বৃদ্ধি করেছে।

উচ্চ ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ:

কুমড়োর বীজ ম্যাগনেসিয়ামের অন্যতম সেরা প্রাকৃতিক উৎস। আমাদের শরীরে ৬০০ টিরও বেশি রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য ম্যাগনেসিয়ামের প্রয়োজন হয়। উদাহরণস্বরূপ, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে, হার্টের রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে, সুস্থ্য হাড় গঠন, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইত্যাদি। তাই ম্যাগনেসিয়ামের চাহিদা পূরণ করতে আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় কুমড়োর বীজ রাখা উচিত।

রক্তে শর্করার মাত্রা হ্রাস করতে:

গবেষণায় দেখা গেছে যে কুমড়ো, কুমড়োর বীজ, কুমড়োর বীজের গুঁড়ো কিংবা কুমড়োর রস রক্তে শর্করাকে হ্রাস করতে পারে। এটি বিশেষত ডায়াবেটিসযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যারা তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে চান। বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, কুমড়ো রস বা বীজ, টাইপ-2 ডায়াবেটিসযুক্ত ব্যক্তিদের রক্তের শর্করার পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারে।

উচ্চ ফাইবার সমৃদ্ধ:

কুমড়োর বীজ ডায়েটরি ফাইবারের একটি দুর্দান্ত উৎস। ফাইবার উচ্চতর পরিমাণে গ্রহণ হজম স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে পারে। এছাড়াও, উচ্চ ফাইবারযুক্ত ডায়েট হার্টের রোগ, টাইপ-2 ডায়াবেটিস, কোষ্ঠকাঠিন্যতা এবং স্থূলত্বের ঝুঁকি কমায়।

দীর্ঘ চুলের নিশ্চয়তা:

এতে আছে কিউকুরবিটিন, এটি এমন এক অ্যামিনো অ্যাসিড যা চুলের বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। এছাড়া রয়েছে ভিটামিন “সি” যা চুলের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

শুক্রাণুর গুণমান উন্নত করতে পারে:

জিংক এর পরিমাণ হ্রাস পাওয়া পুরুষদের শুক্রাণুর গুণমান এবং বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত। কুমড়োর বীজ যেহেতু জিংকের একটি সমৃদ্ধ উৎস তাই তারা শুক্রাণুর গুণমান উন্নত করতে পারে।

কুমড়োর বীজের মধ্যে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস এবং অন্যান্য পুষ্টিগুণও বেশি থাকে যা স্বাস্থ্যকর টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বজায় রাখে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে পারে।

ঘুম বৃদ্ধি করে:

কুমড়োর বীজ ট্রিপটোফেনের (tryptophan) একটি প্রাকৃতিক উৎস। ট্রিপটোফেন একটি অ্যামিনো অ্যাসিড যা ঘুম বৃদ্ধি করতে সহায়তা করতে পারে। আমাদের প্রতিদিন প্রায় ১ গ্রাম ট্রিপটোফান গ্রহণ করা উচিত। এজন্য আমাদের প্রতিদিন প্রায় ২০০ গ্রাম কুমড়োর বীজ খেতে হবে।

এছাড়া কুমড়োর বীজ ম্যাগনেসিয়ামের একটি দুর্দান্ত উৎস। পর্যাপ্ত পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম ভাল ঘুমের জন্য সাহায্য করতে পারে।

প্রোস্টেট এবং মূত্রাশয়ের সমস্যা দূর করে:

কুমড়োর বীজ প্রোস্ট্যাটিক হাইপারপ্লাজিয়া (BPH) বা প্রোস্টেট বৃদ্ধি এর লক্ষণগুলি থেকে মুক্তি দিতে পারে। প্রোস্টেট বৃদ্ধি এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে প্রস্টেট গ্রন্থি প্রসারিত হয় এবং মূত্রত্যাগের সমস্যা তৈরি করে।

বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই বীজগুলি খাওয়ার ফলে বিপিএইচ (BPH) এর সাথে সম্পর্কিত লক্ষণগুলি হ্রাস পেয়েছে। বিপিএইচ (BPH) আক্রান্ত ১,৪০০ এরও বেশি পুরুষের এক বছরের গবেষণায় কুমড়োর বীজ সেবনে উপসর্গ হ্রাস পেয়েছে।

নির্দিষ্ট কিছু ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস করে:

কুমড়োর বীজ পাকস্থলী ক্যান্সার, স্তন ক্যান্সার, ফুসফুস ক্যান্সার, প্রোস্টেট ক্যান্সার এবং কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে পারে। একটি বড় পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় দেখা গেছে যে, কুমড়োর বীজ খেলে পোস্টম্যানোপজাল মহিলাদের স্তনে ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস পায়।

অন্য গবেষণায় পরামর্শ দেওয়া হয় যে, কুমড়োর বীজে থাকা লিগনানগুলি (lignans) স্তনের ক্যান্সার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আরও একটি টেস্ট-টিউব সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, কুমড়োর বীজ প্রোস্টেট ক্যান্সারের কোষগুলির বৃদ্ধি কমিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

কিভাবে এই মিষ্টি কুমড়োর বীজ খাবেন?

পাকা মিষ্টি কুমড়োর বীজ খাওয়ার জন্য উৎকৃষ্ট। মিষ্টি কুমড়ার বীজ সংগ্রহ করে ভালভাবে ধুয়ে শুকনো করে তাওয়া বা ফ্রাই প্যানে টেলে মচমচে করে ভেজে (অবশ্যই তেল ছাড়া) কাচের বোয়ামে সংরক্ষণ করা যায়।

সতর্কতা

কুমড়োর বীজে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকে, তাই প্রচুর পরিমাণে খেলে গ্যাস বা পেটে সমস্যা হতে পারে। কুমড়োর বীজে ক্যালোরি এবং ফ্যাট বেশি। তাই এটা নিয়মিত অনেক বেশি খেলে ওজন বাড়তে পারে।

এছাড়া আপনি যদি জটিল কোনো রোগে আক্রান্ত হন বা অন্য কোনো কারণে রেগুলার কোনো মেডিকেল কোর্স-এর মধ্য দিয়ে যান তাহলে অবশ্যই খাওয়ার আগে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন।

সূত্র:হেলথ লাইন

Share