মসলা চা কাশি ও মাথাব্যথা কমায়, হার্টের জন্য ভালো এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

সারাদিনের ব্যস্ততার মাঝে একটু ক্লান্তি দূর করতে চা তো চাই চাই। আর সেটা হয় যদি মসলা চা তাহলে তো ক্লান্তি দূর করার পাশাপাশি অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতাও পাওয়া যাবে। চায়ে মশলা দেওয়া মানে তাতে সম্পূর্ন ভিন্ন এক স্বাদ পাওয়া।

পশ্চিমা বিশ্বে সুগন্ধ মসলাযুক্ত চা খুবই জনপ্রিয়। এই পানীয় হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে, হজমের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে উপকারী। ইংরেজিতে এই চা Chai Tea, Masala chai বা spices tea নাম পরিচিত।

মশলা চায়ে এলাচ, দারুচিনি,লবঙ্গ ইত্যাদি মশলা থাকে যা ভেষজ গুনাবলী সমৃদ্ধ। এসব মশলায় রয়েছে ভিটামিন, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, কেরোটিন ও জরুরী মিনারেল যা স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী। আয়ুর্বেদ অনুসারে, মশলা চায়ে ব্যবহৃত উপাদান সমূহ শরীরকে সতেজ ও প্রানবন্ত করে এবং মনকে রাখে প্রফুল্ল।

অনেকে আছে চাতে একটু চিনি বেশি পছন্দ করেন এতে চা খাওয়ার উপকারিতার থেকে ক্ষতি বেশি হয়। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন সুপারিশ করে যে মহিলারা প্রতিদিন ২৫ গ্রামের চেয়ে কম পরিমাণে চিনি খেতে পারেন এবং পুরুষরা প্রতিদিন ৩৮ গ্রামের চেয়ে কম পরিমাণে চিনি খেতে পারেন।

মসলা চা তৈরী করতে পানিতে গোল মরিচ, লবঙ্গ, এলাচ, দারুচিনি, স্টার অ্যানিস, আদা ইত্যাদি দিয়ে ভালো করে ফুটিয়ে নিন। তারপর চা পাতি, পরিমান মতো চিনি দিয়ে আবার একটু জ্বাল দিয়ে নামিয়ে কাপে ঢেলে পরিবেশন করুন মসলা চা। এতে দুধও ব্যবহার করতে পারেন।

মসলা চা খাওয়ার স্বাস্থ্য উপকারিতা

নিচে মসলা চায়ের উপকারিতা নিচে আলোচনা করা হলো –

হার্টের জন্য ভালো:

এমন প্রমাণ রয়েছে যে মসলা চা হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। গবেষণায় দেখা গেছে যে, মসলা চায়ে অন্যতম প্রধান উপাদান হলো দারুচিনি। দারুচিনি রক্তচাপ হ্রাস করতে পারে। কিছু ব্যক্তিদের মধ্যে দারুচিনি “খারাপ” LDL কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা ৩০% পর্যন্ত হ্রাস করতে সহায়তা করে।

বেশ কয়েকটি গবেষণায় আরও বলা হয়েছে যে, লাল চা রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রাকে হ্রাস করতে পারে। বেশিরভাগ গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রতিদিন চার কাপ লাল চা পান করা উচ্চ রক্তচাপের স্তরকে কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে। প্রতিদিন তিন বা ততোধিক কাপ লাল চা পান করলে হার্টের রোগের ঝুঁকি ১১% কমাতে পারে।

কাজে মনোযোগ বৃদ্ধি করতে পারে:

মসলা চাতে রয়েছে ক্যাফিন এবং এল-থানাইন (L-theanine) নামে একটি অ্যামিনো অ্যাসিড যা কাজে মনোযোগ বৃদ্ধি করতে পারে। এল-থানাইন মস্তিষ্কে আলফা ক্রিয়াকলাপ বৃদ্ধি করে এবং আরও ভালো মনোযোগ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এল-থানাইন এবং ক্যাফিনযুক্ত পানীয় মস্তিষ্কে মনোযোগের ক্ষেত্রে বেশি প্রভাব ফেলে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উৎস:

মসলা চাতে থাকা আদা, চা, লবঙ্গ, দারুচিনি অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট এর উৎস। অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ফ্রি র‌্যাডিক্যাল অপসারণ এবং শরীরে কোষের ক্ষতি হ্রাস করতে সহায়তা করতে পারে। এছাড়া অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি চাতে পলিফেনল থাকে যা এক ধরণের অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট। ক্যালিচিনস, থাফ্লাভিনস এবং থেরুবিগিনস সহ এই পলিফেনলগুলির প্রধান উৎস হলো চা।

রক্তে শর্করার মাত্রা হ্রাস করতে পারে:

মসলা চা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এর কারণ এতে আদা এবং দারুচিনি রয়েছে, উভয়েরই রক্তে শর্করার মাত্রায় উপকারী প্রভাব ফেলে। অধ্যয়নে দেখা দেখা গেছে যে, দারুচিনি ইনসুলিন প্রতিরোধে এবং রক্তের শর্করার মাত্রাকে ১৯-২৯% কমাতে পারে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায়, টাইপ-2 ডায়াবেটিসযুক্ত ব্যক্তিদের প্রতিদিন দুই গ্রাম আদা খেতে দেওয়া হয়েছিল এবং এটি তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা ১২% কমাতে সহায়তা করেছিল।

বমিভাব হ্রাস:

এই চাতে আদা রয়েছে, যা বমি বমি ভাব দূর করার জন্য সুপরিচিত। আদা গর্ভাবস্থায় বমি বমি ভাব কমাতে বিশেষভাবে কার্যকর। প্রকৃতপক্ষে, মোট ১,২৭৮ গর্ভবতী মহিলাদের উপর পরিচালিত সমীক্ষা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, আদা উল্লেখযোগ্যভাবে বমি বমি ভাব হ্রাস করতে পারে।

হজম উন্নতি করতে পারে:

মসলা চাতে দারুচিনি, গোল মরিচ, লবঙ্গ এবং এলাচ রয়েছে যার মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিব্যাকটিরিয়াল বৈশিষ্ট্য যা ব্যাকটিরিয়া সংক্রমণের কারণে হজমজনিত সমস্যাগুলি প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে। অধ্যয়নগুলি জানিয়েছে যে, গোল মরিচ খাবার সঠিকভাবে ভেঙে দিতে এবং হজম করার জন্য প্রয়োজনীয় হজম এনজাইমগুলির মাত্রা বাড়িয়ে তুলতে পারে।

কাশি ও মাথাব্যথা কমায়:

মসলা চাতে থাকা আদা ঠাণ্ডায় ও মাথাব্যথায় ভীষণ উপকারী। এছাড়া আদা জ্বর জ্বর ভাব, গলাব্যথা, সর্দি দূর করতে সাহায্য করে। আর সর্দি কাশিতে লবঙ্গ খেলে আরাম পাওয়া যায়। তাই বলা যায় মসলা চা কাশি ও মাথাব্যথা কমাতে সহায়তা করে।

ওজন কমাতে সহায়তা করতে পারে:

মসলা চা ওজন বৃদ্ধি রোধ করতে এবং বিভিন্ন উপায়ে চর্বি হ্রাস করতে সহায়তা করে। প্রথমত, এই চা গরুর দুধ দিয়ে প্রস্তুত হয়, যা প্রোটিনের উৎস। প্রোটিন হল পুষ্টিকর উপাদান যা ক্ষুধা কমাতে এবং পেট ভরিয়ে রাখতে সহায়তা করে।

একটি সমীক্ষা জানিয়েছে যে, প্রতিদিন তিন কাপ লাল চা পান করলে ওজন বা পেটের চর্বি বৃদ্ধি পাই না। এছাড়া এতে থাকা গোল মরিচ শরীরের মেদ জমতে বাধা দেয়।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে:

মসলা চাতে থাকা দারুচিনি ব্যাকটিরিয়া এবং ছত্রাকের সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। দারুচিনির অন্যতম সক্রিয় উপাদান সিনামালডিহাইড বিভিন্ন ধরণের সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করতে পারে। এছাড়া আদাও বিভিন্ন ধরণের সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে।

চাতে ক্যাফিন থাকে অতিরিক্ত পরিমাণে ক্যাফিন গ্রহণ করলে ঘুম কমে যেতে পারে। এছাড়া বিভিন্ন ধরণের স্বাস্থ্য সমস্যা হতে পারে। খুব বেশি ক্যাফিন গ্রহণ গর্ভপাত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। প্রতিদিন আমাদের ৪০০ মিলিগ্রামের বেশি ক্যাফিন গ্রহণ করা উচিত নয় এবং গর্ভাবস্থায় ২০০ মিলিগ্রাম। প্রতি কাপ চায়ে প্রায় ২৫ মিলিগ্রাম ক্যাফিন থাকে।

সতর্কতা:

আপনি যদি জটিল কোনো রোগে আক্রান্ত হন বা অন্য কোনো কারণে রেগুলার কোনো মেডিকেল কোর্স-এর মধ্য দিয়ে যান তাহলে অবশ্যই খাওয়ার আগে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন।

রেফারেন্স:

Share