আঙ্গুর স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে, হার্টের রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায় এবং ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।

আঙ্গুর পৃথিবীর সব থেকে চিত্তাকর্ষক ফল এটা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। মন মাতানো আঙ্গুরের রং, কোনোটা সবুজ তো কোনটা বেগুনী-লাল, কোনটা আবার গাঢ় ব্লু। এটি যেমন দেখতে সুন্দর তেমনি এর স্বাদও অতুলনীয়। আঙ্গুর এত সুন্দর দেখতে যেন মনে হয় ঘরে সাজিয়ে রেখেদি।

সবার খুবই পছন্দের ফল এটি। আঙ্গুর ফল রোদে বা মাইক্রোওভেনে শুকিয়ে তৈরি করা হয় কিসমিস। দক্ষিণ ইউরোপ, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকাসহ সারা পৃথিবী জুড়ে আঙ্গুর চাষ হয়। এতে ৭০ থেকে ৮০% পানি থাকে। আয়ুর্বেদে আঙ্গুর তার আকৃতি এবং ঔষধি গুণাবলীর জন্য অসংখ্য নাম অর্জন করেছে যেমন “দ্রাক্ষা”, “মৃদউইকা” ও “গোস্তানি”।

আঙ্গুর ফল বিভিন্ন রঙের হয় যেমন বেগুনী-লাল, কালো, গাঢ় ব্লু, সোনালী, সবুজ ইত্যাদি। আমরা সবাই সবুজটার সাথে বেশি পরিচিত। এই ফলে রয়েছে ভিটামিন “কে”, “সি”, বি-১, বি-৬ এবং খনিজ উপাদান ম্যাংগানিজ ও পটাশিয়াম। এছাড়া রয়েছে প্রোটিন, ফাইবার, কার্বহাইড্রেট। আঙ্গুর খেতে পছন্দ করে না এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম। আঙ্গুরের বৈজ্ঞানিক নাম Vitis vinifera এবং ইংরেজিতে Grape বলা হয়।

আঙ্গুর ফলের পুষ্টি উপাদান

আঙ্গুর ফলে বেশ কয়েকটি পুষ্টি উপাদান রয়েছে। নিচে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি উপাদান দেওয়া হলো –

  • ক্যালোরি: ১০৪
  • কার্বহাইড্রেট: ২৭.৩ গ্রাম
  • প্রোটিন: ১.১ গ্রাম
  • ফ্যাট: ০.২ গ্রাম
  • ফাইবার: ১.৪ গ্রাম
  • ভিটামিন “সি”: ২৭% (RDI)
  • ভিটামিন “কে”: ২৮% (RDI)
  • থায়ামাইন: ৭% (RDI)
  • রিবোফ্লাভিন: ৬% (RDI)
  • ভিটামিন বি 6: ৬ % (RDI)
  • পটাশিয়াম: ৮ % (RDI)
  • কপার: ১০% (RDI)
  • ম্যাঙ্গানিজ: ৫% (RDI)

আঙ্গুর ফলের উপকারীতা

আঙ্গুর ফল রক্তের শর্করার মাত্রা হ্রাস করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। এছাড়া আঙ্গুর ফল হার্টের জন্য ভালো, চোখের জন্য ভালো, স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধি করতে এবং হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। নিচে আঙ্গুর ফলের আরো কিছু উপকারীতা দেওয়া হলো –

উচ্চ অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ:

অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট আমাদের শরীরে ফ্রি র‌্যাডিকাল দ্বারা সৃষ্ট কোষের ক্ষতি ঠিক করতে সহায়তা করে। আঙ্গুর মধ্যে ভিটামিন “সি”, বিটা ক্যারোটিন, কোরেসেটিন, লুটিন, লাইকোপিন এবং এলজিক এসিডও রয়েছে এগুলো সবই শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এছাড়া এতে ১,৬০০ টিরও বেশি উপকারী উদ্ভিদ যৌগ রয়েছে। আঙ্গুর ফলের খোসা এবং বীজের মধ্যে সব থেকে বেশি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়া যায়। আঙ্গুরে থাকা এসব উপাদান হার্টের রোগে ও রক্তে শর্করার মাত্রা কমতে এবং ক্যান্সারের বিকাশের বিরুদ্ধে কাজ করে।

হার্টের রোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি:

এক কাপ (১৫১ গ্রাম) আঙ্গুরের মধ্যে ২৮৮ মিলিগ্রাম পটাসিয়াম থাকে। পটাসিয়াম কম গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের রোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকির কারণ। ১২,২৬৭ প্রাপ্তবয়স্কদের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, সঠিক পরিমাণ পটাসিয়াম গ্রহণকারী লোকেরা কম পটাসিয়াম গ্রহণকারীদের তুলনায় হার্টের রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। আঙ্গুর ফল উচ্চ কোলেস্টেরলের মাত্রা থেকে রক্ষা করতে পারে। উচ্চ কোলেস্টেরলযুক্ত ৬৯৯ জনের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, আট সপ্তাহের জন্য প্রতিদিন তিন কাপ (৫০০ গ্রাম) লাল আঙ্গুর গ্রহণের ফলে “খারাপ” কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাস পেয়েছে।

রক্তে শর্করার মাত্রা হ্রাস করতে পারে:

প্রতি কাপ আঙ্গুরে ২৩ গ্রাম চিনি থাকলেও আঙ্গুরের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স অনেক কম। গ্লাইসেমিক ইনডেক্স হলো খাদ্য কতটা দ্রুত রক্তে সুগার বৃদ্ধি করে তা পরিমাপ করে। আঙ্গুরে কিছু উপাদান রয়েছে যা রক্তের শর্করার মাত্রা হ্রাস করতে পারে। ৩৮ জন পুরুষদের মধ্যে ১৬ সপ্তাহের এক গবেষণায়, যারা প্রতিদিন ২০ গ্রাম আঙ্গুরের রস খেয়েছিলেন তাদের রক্তে শর্করার পরিমাণ হ্রাস পেয়েছিল। আঙুরে থাকা রেসভেরাট্রোল ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতে পারে যা দেহের গ্লুকোজ ব্যবহারের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে। তাই রক্তে শর্করার মাত্রা হ্রাস পাই।

চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী:

আঙ্গুরে থাকা উপাদান চোখের সাধারণ রোগ থেকে রক্ষা করতে পারে। একটি টেস্ট-টিউব সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে, আঙ্গুরে থাকা রেসভেরাট্রোল চোখের রেটিনা কোষগুলিকে আল্ট্রাভায়োলেট আলো থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। এটি বয়সের সাথে সম্পর্কিত চোখের ছানি (ম্যাকুলার ডিজেনারেশন) হওয়ার ঝুঁকি কমিয়ে দিতে পারে।

স্মৃতিশক্তি ও কাজের প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধি:

আঙ্গুর ফল স্মৃতিশক্তি বাড়িয়ে তুলতে পারে। ১১১ জন সুস্থ্য বয়স্ক লোকদের মধ্যে ১২-সপ্তাহের গবেষণায়, প্রতিদিন ২৫০ মিলিগ্রাম আঙ্গুরের সাপ্লিমেন্ট খেতে দেওয়া হয়। এই পরীক্ষায় বয়স্ক লোকগুলোর মনোযোগ, স্মৃতি উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হওয়ার প্রমান পাওয়া যায়। অপরদিকে অল্প বয়স্কদের মধ্যে আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রায় ৮ আউন্স (২৩০ মিলি) আঙ্গুরের রস পান করানোর ফলে ২০ মিনিট পরে মেমরি-সম্পর্কিত দক্ষতা এবং মেজাজ উভয়ই উন্নত হয়েছে।

ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে পারে:

আঙ্গুর রেজভেরট্রল (Resveratrol) রয়েছে যা, ক্যান্সার থেকে আমাদের দেহকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। রেজভেরট্রল এক ধরণের অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট। এটি আমাদের দেহের প্রদাহ হ্রাস করতে এবং শরীরের মধ্যে ক্যান্সারের কোষের বৃদ্ধি এবং প্রসারণকে বাঁধা দিতে পারে। রেজভেরট্রল ছাড়াও, আঙ্গুর মধ্যে কোরেসেটিন, অ্যান্থোসায়ানিনস এবং ক্যাটচীন (catechins) রয়েছে- এগুলি সবকটিই ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে।

হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ:

আঙ্গুরের মধ্যে হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক খনিজ রয়েছে, যার মধ্যে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাঙ্গানিজ এবং ভিটামিন “কে” রয়েছে। যা হাড়ের ঘনত্বকে উন্নত করে।

ব্যাকটিরিয়া, ভাইরাস সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে:

ব্যাকটিরিয়া এবং ভাইরাস সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আঙ্গুরে অসংখ্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে। আঙ্গুর ভিটামিন “সি” এর একটি ভাল উৎস, যা দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উন্নত করতে পারে। ফ্লু ভাইরাসের বিরুদ্ধে রক্ষা করার জন্য আঙ্গুরের খোসা খাওয়া বেশি উপকারী। এছাড়া আঙ্গুর হার্প ভাইরাস (herpes virus), চিকেন পক্স এর বিরুদ্ধেও লড়াই করতে পারে।

সতর্কতা:

আপনি যদি জটিল কোনো রোগে আক্রান্ত হন বা অন্য কোনো কারণে রেগুলার কোনো মেডিকেল কোর্স-এর মধ্য দিয়ে যান তাহলে অবশ্যই খাওয়ার আগে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন।

সূত্র: হেলথলাইন, উইকিপিডিয়া

Share