প্রতিদিন সকালে কুসুম গরম পানিতে লেবুর খাওয়ার উপকারিতা।

প্রতিদিন সকালে খালি পেটে কুসুম গরম পানির সঙ্গে যদি ১ চামচ মধু ও লেবুর মিশিয়ে পান করা হয়, তবে এর অভাবনীয় উপকার কিছুদিনের মধ্যেই পাবেন। লেবু ভিটামিন “সি” এর একটি দুর্দান্ত উৎস। এছাড়াও এতে রয়েছে ফ্ল্যাভনয়েডস ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন “বি”, ফলিক এসিড, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম ও ফসফরাস।

লেবু আকারে ছোট ফল হলেও এর উপকারিতা প্রচুর আর পুষ্টিগুণেও ভরপুর। আমাদের দেশে যে ধরনের লেবু পাওয়া যায় তার মধ্যে পাতিলেবু, বাতাবিলেবু, কাগজিলেবু উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন দেশে সালাদ, জুস, রান্না, রুপচর্চা এবং চিকিৎসা সহ নানা কাজে লেবু ব্যবহার হয়।

লেবুর পুষ্টিগুণ অনেক। লেবু ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস সৃষ্ঠ রোগ দূর করে এবং দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এ ছাড়া লেবুতে থাকা ভিটামিন “সি” শরীরে আয়রনের শোষণ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।

আপনি যখন সকালে খালি পেটে লেবু পানি পান করেন, তখন ত্বকের জন্য ফোলেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ ডোজ হিসাবে কাজ করে। আসুন জেনে নেই, প্রতিদিন সকালে কুসুম গরম পানিতে লেবুর রস খাওয়ার উপকারিতা সম্পর্কে-

ওজন কমাতে সাহায্য করে:

আপনি যদি ডায়েট করার চিন্তা-ভাবনা করতে থাকেন, তাহলে লেবু পানিকে আপনার সেরা বন্ধু হিসেবে বেছে নিতে পারেন। লেবুতে আছে পলিফেনলস যা ক্ষুধা নিবারণে সাহায্য করে। সকালে উঠে যদি আপনার কমলার জুস পানের অভ্যাস থাকে, তাহলে অভ্যাসটি বদলে লেবু পানি পানের চেষ্টা করুন।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়:

টক জাতীয় যেকোনো ফল, যেমন- লেবুতে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন “সি” যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এছাড়াও লেবুতে আছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যার প্রভাবে শরীরে কোনো রোগ জীবাণু সহজে বাসা বাঁধতে পারে না।

ভিটামিন “সি” শ্বেত রক্ত কোষের উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করে, যা আমাদের শরীরকে সংক্রমণ এবং রোগের বিরুদ্ধে রক্ষা করতে সহায়তা করে। এক্ষত্রে প্রতিদিন সকালে এক গ্লাস লেবুর শরবত খেলে সর্দি-কাশি, মুখে ঘা হওয়া ইত্যাদির মতো নানা সমস্যা থেকে আমরা মুক্তি পেতে পারি।

দেহের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে:

ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে লেবুর শরবত খেলে দেহের ভেতরে পি এইচ (PH) লেভেলের ভারসাম্য ঠিক থাকে। সুস্থ্য কর্মচঞ্চল জীবনের জন্য আমাদের রক্তে সর্বদা পি এইচ (PH) লেভেল ৭.৩৬৫ থাকা ভালো।

লেবুর মধ্যে থাকা সাইট্রিক এসিড রক্তের পি এইচ (PH) ব্যালান্স ঠিক রাখে। ফলে ভেতর এবং বাইরে থেকে শরীর এতটাই চাঙ্গা হয়ে ওঠে যে দেহের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে সময় লাগে না।

ত্বকের সৌন্দর্য বাড়ায়:

লেবু ত্বকের সৌন্দর্য বাড়ায় এটা আমরা সবাই জানি। হাজারো বিউটি প্রডাক্ট যা করে উঠতে পারেনি, তা লেবু করে ফেলতে পারে। লেবুতে থাকা ভিটামিন “সি” ও অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ত্বকের হারিয়ে যাওয়া উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনে।

সেই সঙ্গে বয়সের ছাপ কমানোর পাশাপাশি ব্ল্যাকহেডস এবং বলিরেখা কমাতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই সকালে খালি পেটে একগ্লাস কুসুম গরম পানি দিয়ে লেবুর শরবত খাওয়ার চেষ্টা করুন।

গ্যাসের সমস্যা কমায়:

রাতের বেলা ভরপেট খাবার খাওয়ার পর প্রায়ই বেশ অস্বস্তি বোধ করেন অনেকে। শুরু হয় বুক জ্বলুনিও। সেই অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে হালকা গরম পানিতে লেবুর রস মিশিয়ে খেতে পারেন।

হালকা গরম পানি হজমে সাহায্য করবে আর লেবুর রস পাকস্থলীতে তৈরি হওয়া গ্যাসের সমস্যা থেকে রক্ষা করবে। খুব সহজেই আবার অনেকটাই সুস্থ বোধ করতে শুরু করবেন আপনি।

শরীর আর্দ্র রাখে:

শরীর আর্দ্র রাখার সবেচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে পানি পান করা। কিন্তু অনেকের পানি পানে অনীহা রয়েছে। তাদের জন্য পরামর্শ হলো- পানির সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়ে নিতে পারেন। এতে পর্যাপ্ত পানি পান করা হবে এবং শরীর আর্দ্রও থাকবে।

হজম শক্তি বাড়ায়:

লেবু পানিতে যে এসিড রয়েছে তা খাবার হজম করতে সাহায্য করে। এতে আছে সাইট্রাস ফ্লাভোনইডস যা পাকস্থলীতে খাবারকে ভেঙে সহজেই হজম করে। বয়সের সাথে সাথে হজম ক্ষমতা কমে যায়।

এছাড়াও পানির সাথে কয়েক টুকরা লেবু মিশিয়ে খেলেও আপনি পেকটিনের গুণ পাবেন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, ফাইবার হজম শক্তি বাড়াতে বেশ কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

নিশ্বাসে সজীবতা আনে:

খাওয়ার পর অনেক সময় মসলা- পেঁয়াজ, রসুন বা মাছের গন্ধ মুখে লেগে থাকে। মুখের দুর্গন্ধ বা নিশ্বাসের দুর্গন্ধ থেকে মুক্তি পেতে খাওয়ার পর এক গ্লাস লেবুর পানি পান করতে পারেন বা সকালে পান করলেও ফল পাওয়া যায়।

পটাশিয়ামের মাত্রা বাড়ায়:

সাধারণত পটাশিয়ামের কথা বললেই প্রথমে কলা এবং বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি ও ফলমূলের কথা মাথায় চলে আসে। কিন্তু লেবু থেকেও যথেষ্ট পরিমাণ পটাশিয়াম পাওয়া সম্ভব। পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে, মাংসপেশীর কর্মক্ষমতা বাড়ায় ও হার্টবিট নিয়ন্ত্রণ করে।

তাই আপনার শরীরে পটাশিয়ামের চাহিদা পূরণ হওয়া দরকার। যেহেতু লেবুতে পটাশিয়াম রয়েছে তাই দিনের শুরুতে লেবু পানি পান করে নিলে আপনার শরীরে পটাশিয়ামের চাহিদার কিছুটা পূরণ করতে পারবেন।

কিডনির পাথর প্রতিরোধ করে:

লেবুর মধ্যে থাকা সাইট্রিক এসিড কিডনি পাথর প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। অনেক সময় কিডনিতে জমে থাকা পাথর ভাঙ্গতে সাহায্য করে। এমনকি লেবুতে উপস্থিত সাইট্রিক অ্যাসিড কিডনিতে ‘ক্যালসিয়াম অক্সালেট’ নামক পাথর গঠনে বাধা দেয়।

‘ক্যালসিয়াম অক্সালেট’ সবচেয়ে সাধারণ কিডনি পাথরগুলোর মধ্যে একটি। এছাড়া লেবুতে বিদ্যমান সাইট্রিক এসিড কোলন, পিত্তথলি ও লিভার থেকে বর্জ্য পদার্থ বের করতে সাহায্য করে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে লোকেরা বেশি পরিমাণে সাইট্রাস ফল খেয়েছিল তাদের কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি কম ছিল।

লেবুর শরবতের কিছু সতর্কতা

  • কেউ যদি দীর্ঘদিন ধরে লেবুর শরবত খায় তবে লেবুর শরবত খেয়ে কিছুক্ষন (২০-৩০ মিনিট) পর পানি দিয়ে কুলকুচি করা বা ব্রাশ করা দাঁতের এনামেল (দাঁতের টিস্যু) এর জন্য ভালো।
  • লেবুর বীজটা খুব একটা উপকারী নয়, তাই লেবুর শরবত তৈরীর সময় লেবুর বীজটা ফেলে দেওয়া ভালো।
  • লেবুর শরবত তৈরীর সময় অতিরিক্ত চিনি বা মধু মিশালে লেবুর কার্যকারীতা কমে যায়।

রেফারেন্স:

Share