লাল চা হার্টের স্বাস্থ্যকে ভালো করে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায় ও ইনসুলিনের কার্যকারীতা বৃদ্ধি করে।

সকাল বেলা গরম গরম চায়ের ঘ্রাণে ঘুম ভাঙতে না ভাঙতে শরীর যেন চাঙ্গা হয়ে ওঠে। আবার যাদের বেড টি খাওয়ার অভ্যাস আছে তারাতো চা না খাওয়া পর্যন্ত বিছানা থেকে উঠতে পারে না। এছাড়া মর্নিং ওয়াকের পর কিংবা সকালের নাস্তার টেবিলে কিংবা অফিসের কাজের ফাঁকে অথবা জমজমাট আড্ডায় চা ছাড়া কি হয়। বাড়িতে কেউ বেড়াতে আসলে অর্থাৎ অতিথি আপ্যায়নে চায়ের কাপ গুলোতে গরম গরম চায়ের ছোঁয়া লাগবেনা তা কি হয়। এছাড়া পড়ন্ত বিকালে সব কাজের শেষে ক্লান্তি দূর করতে চা তো লাগবেই। সেটা হোক গ্রীন টি বা লাল চা। তবে লাল চাতে আমরা একটু বেশি অভ্যস্ত।

ব্ল্যাক টি, লাল চা, লিকার চা কিংবা পাড়ার দোকানের রং চা, নামে ভিন্নতা থাকলেও বিষয়টা একই। তবে পাড়ার দোকানের গরম গরম চায়ের মজাটাই আলাদা। যাই হোক লাল চাতে ফ্লেভোনয়েডস নামে একটি গ্রুপ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। গবেষণায় দেখা গেছে যে, নিয়মিত লাল চা পান করলে হার্টের রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে সহায়তা করে। এছাড়া লাল চাতে পলিফেনল রয়েছে, যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করে। হার্টের রোগের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে, অন্ত্রের সমস্যা ঠিক করতে, কাজের ফোকাস উন্নত করতে এর জুড়ি নাই।

পানির পরেই চা বিশ্বের সর্বাধিক উপভোগ্য পানীয়। চীনে যেখানে লাল চা আবিষ্কার হয়েছিল, সেখানে প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় অক্সিডযুক্ত পাতার রঙের কারণে এই পানীয়টিকে “রেড চা” বলা হয়েছিল। চায়ের উৎপত্তিস্থল চীন। চীন দেশে চা বা টি কে ‘চি’ বলে উচ্চারন করে। ‘চি’ থেকে হয় ‘চা’।

আমরা কি প্রতিদিন লাল চা পান করতে পারি?

হ্যাঁ, আমরা প্রতিদিন লাল চা পান করতে পারি। তবে অবশ্যই পরিমাণ মত পান করতে হবে। প্রতিদিন চার বা পাঁচ কাপের বেশি পান করলে অতিরিক্ত ক্যাফিনের কারণে উদ্বিগ্নতা ও ঘুমের সমস্যা হতে পারে।

গ্রীন টি না ব্ল্যাক টি?

গ্রীন টি এবং ব্ল্যাক টি বা লাল চা দুটোর একই রকম স্বাস্থ্য সুবিধা রয়েছে। উভয়ই ক্যামেলিয়া সিনেনেসিস গাছের পাতা থেকে তৈরি করা হয়। অর্থাৎ একই গাছের পাতা শুধু প্রক্রিয়া জাত করা হয় দুইরকম ভাবে। লাল চা পুরোপুরি গাঁজন করে তৈরি করা হয়। আর গ্রীন টি চা-গাছের সবুজ পাতা রোদে শুকিয়ে বা ওভেনে শুকিয়ে প্রস্তুত করা হয়। এটি একেবারেই গাঁজন করা হয় না। বেশিরভাগ গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, গ্রীন টিতে লাল চা এর চেয়ে পরিমাণে বেশি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যদিও উভয় চাতে ক্যাফিন রয়েছে তবে লাল চায়ে সাধারণত ক্যাফিন পরিমাণে বেশি থাকে। গ্রীন টি এবং লাল চা উভয়ই পলিফেনলস নামে একধরণের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। গ্রিন টিতে অনেক বেশি পরিমাণে এপিগালোকটেকিন-3-গ্যালেট (EGCG) রয়েছে, অন্যদিকে লাল চা থাফ্লাভিন এর (theaflavins) একটি সমৃদ্ধ উৎস।

লাল চা খাওয়ার উপকারীতা

প্রত্যেকের প্রতিদিনের নিত্য সঙ্গী লাল চা একটি সৌখিন পানীয় হয়ে উঠেছে। তাই সবাই ভিন্ন ভিন্ন স্বাদে চা খেতে পছন্দ করেন। কেউ কেউ দুধ চা খেতে পছন্দ করেন কেউ বা আদা চা। আবার কেউ কেউ আছে লবঙ্গ বা তেজপাতা দিয়ে খেতে পছন্দ করে। নিচে চা খাওয়ার উপকারীতা দেওয়া হলো –

হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখে:

লাল চাতে ফ্লেভোনয়েডস নামে একটি গ্রুপ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। চায়ের পাশাপাশি ফ্ল্যাভোনয়েডগুলি শাকসবজি, ফলমূল, রেড ওয়াইন এবং ডার্ক চকোলেটগুলিতে পাওয়া যায়। ফ্লেভোনয়েডস জাতীয় খাবার নিয়মিত খেলে উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, উন্নত ট্রাইগ্লিসারাইড স্তর এবং স্থূলত্ব সহ হার্টের রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে। একটি এলোমেলোভাবে নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় দেখা গেছে যে, ১২ সপ্তাহ ধরে ব্ল্যাক টি বা লাল চা পান করলে ট্রাইগ্লিসারাইড, রক্তে শর্করার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। অন্য একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন তিন কাপ লাল চা পান করেন তাদের হার্টের রোগের ঝুঁকি ১১% হ্রাস পেয়েছিল।

“খারাপ” কোলেস্টেরল কমিয়ে দিতে পারে:

দেহে দুটি লাইপোপ্রোটিন রয়েছে যা সারা শরীর জুড়ে কোলেস্টেরল পরিবহন করে। একটি হল লো-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (LDL) এবং অন্যটি হল হাই-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (HDL)। LDL “খারাপ” লাইপোপ্রোটিন হিসাবে বিবেচনা করা হয় কারণ এটি কোলেস্টেরলকে সারা শরীরের কোষে স্থানান্তর করে। শরীরে যখন খুব বেশি LDL থাকে তখন এটি ধমনীতে প্লেক তৈরি করে। যা হার্ট এটাক বা স্ট্রোকের মতো সমস্যার কারণ। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, লাল চা LDL কোলেস্টেরলের পরিমাণ হ্রাস করতে সহায়তা করে।

হজম প্রক্রিয়া ভালো রাখে:

গবেষণায় দেখা গেছে যে, পরিপাকতন্ত্রে যে ধরণের ব্যাকটিরিয়া থাকে তা আমাদের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিছু পরীক্ষায় দেখা গেছে যে পরিপাকতন্ত্রে যে ধরণের ব্যাকটিরিয়া রয়েছে তা প্রদাহজনক অন্ত্রের রোগ, টাইপ-2 ডায়াবেটিস, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ, স্থূলত্ব এবং এমনকি ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। লাল চায়ে পাওয়া পলিফেনলগুলি পরিপাকতন্ত্রে ভাল ব্যাকটিরিয়ার বিকাশ ঘটাতে এবং খারাপ ব্যাকটেরিয়াগুলির বৃদ্ধিকে বাধা দিয়ে স্বাস্থ্যকর পরিপাকতন্ত্র বজায় রাখতে সহায়তা করে। এছাড়াও, ব্ল্যাক টিতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা ক্ষতিকারক পদার্থগুলিকে মেরে ফেলে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত করে।

স্ট্রোকের ঝুঁকি হ্রাস করতে সহায়তা করতে পারে:

মস্তিষ্কের কোনও রক্তনালী অবরুদ্ধ বা ফেটে গেলে স্ট্রোক হতে পারে। এটি বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ। ভাগ্যক্রমে, ৮০% স্ট্রোকই প্রতিরোধযোগ্য। শুধু মাত্র ডায়েট পরিচালনা, শারীরিক ক্রিয়াকলাপ, রক্তচাপ এবং ধূমপান না করা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, লাল চা পান স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ৭৪,৯৬১ জনের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, যারা লাল চা পান করেন না তাদের তুলনায় যারা প্রতিদিন চার কাপ বা তারও বেশি লাল চা পান করেন তাদের ৩২% কম স্ট্রোকের ঝুঁকি থাকে।

রক্তে শর্করার মাত্রা কমিয়ে দিতে পারে:

রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি স্বাস্থ্যগত জটিলতার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে, যেমন টাইপ-2 ডায়াবেটিস, স্থূলত্ব, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ, কিডনি সমস্যা এবং হতাশা। বিশেষত মিষ্টিযুক্ত পানীয় থেকে প্রচুর পরিমাণে চিনি গ্রহণ, রক্তে শর্করার মান এবং টাইপ-2 ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। আমরা যদি আমাদের শরীরের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চিনি গ্রহণ করি তবে অতিরিক্ত চিনি ফ্যাট হিসাবে সঞ্চিত হয়। ব্ল্যাক টি হল একটি দুর্দান্ত অ-মিষ্টিযুক্ত পানীয় যা শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়িয়ে তুলতে সহায়তা করে। একটি টেস্ট-টিউব স্টাডিতে লাল চা এবং এর উপাদানগুলি ইনসুলিনের ক্রিয়াকলাপ ১৫-গুণ বেশি বাড়িয়েছে।

ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস করতে সাহায্য করতে পারে:

লাল চায়ে পাওয়া পলিফেনল বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের কোষ বেঁচে যাওয়া রোধ করতে সহায়তা করতে পারে। একটি টেস্ট-টিউব সমীক্ষায় দেখা গেছে যে লাল চা এবং গ্রীন টি ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে এবং নতুন কোষের বিকাশ হ্রাস করতে ভূমিকা রাখতে পারে। আরেকটি গবেষণায় স্তন ক্যান্সারে লাল চায়ের পলিফেনলসের প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এটি দেখিয়েছিল যে লাল চা হরমোন নির্ভর স্তন টিউমারগুলির সংক্রমণ কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করতে পারে।

কাজে মনোযোগ বৃদ্ধি করতে পারে:

লাল চাতে রয়েছে ক্যাফিন এবং এল-থানাইন (L-theanine) নামে একটি অ্যামিনো অ্যাসিড যা সতর্কতা এবং কাজে মনোযোগ বৃদ্ধি করতে পারে। এল-থানাইন মস্তিষ্কে আলফা ক্রিয়াকলাপ বৃদ্ধি করে, শিথিলকরণ এবং আরও ভালো মনোযোগ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এল-থানাইন এবং ক্যাফিনযুক্ত পানীয় মস্তিষ্কে মনোযোগের ক্ষেত্রে বেশি প্রভাব ফেলে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উৎস:

অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট বেশ কয়েকটি স্বাস্থ্য সুবিধা প্রদান করে। এটি ফ্রি র‌্যাডিক্যাল অপসারণ এবং শরীরে কোষের ক্ষতি হ্রাস করতে সহায়তা করতে পারে। এছাড়া অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে সহায়তা করতে পারে। পলিফেনলগুলি এক ধরণের অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট। ক্যালিচিনস, থাফ্লাভিনস এবং থেরুবিগিনস সহ পলিফেনলগুলির প্রধান উৎস লাল চা।

সতর্কতা

লাল চা অক্সালেটে সমৃদ্ধ। অক্সালেট অত্যধিক পরিমাণে গ্রহণ করলে কিডনিতে পাথর হতে পারে। অনেকে দুধ দিয়ে চা খেতে পছন্দ করেন এতে অ্যাসিডিটির সমস্যা হতে পারে। যাদের ডায়াবেটিস আছে তারা অবশ্যই চিনি ছাড়া খাবেন। এছাড়া আপনি যদি জটিল কোনো রোগে আক্রান্ত হন বা অন্য কোনো কারণে রেগুলার কোনো মেডিকেল কোর্স-এর মধ্য দিয়ে যান তাহলে অবশ্যই খাওয়ার আগে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন।

সূত্র:হেলথ লাইন

Share