পান পাতা ডায়াবেটিস কমায়, কোলেস্টেরল কমায় ও মুখের দুর্গন্ধ দূর করে।

হার্ট আকৃতির পাতা উপকারী গুন সম্পন্ন। বলুনতো কি তার নাম? হ্যা বন্ধুরা, আপনারা অনেকেই পেরেছেন। “পান” বা পানপাতা। বাংলাদেশ এবং ভারতে, Betel leaves-সাধারণত “পান পাতা” নামে পরিচিত। পান যুগ যুগ ধরে চলে আসা একটি প্রধানতম মুখশুদ্ধি। পান পাতা চিবিয়ে খাওয়া হতাশাকে উপসাগরে রাখার একটি সহজ উপায়।

পান পাতার জনপ্রিয়তা:

বাংলাদেশ, ভারতসহ আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশের এমন কোন জায়গা নেই যেখানে আপনি পান পাবেন না। পাড়ার মোড়ে, হাটে-বাজারে, শহরের অলিতে-গলিতে, বাস বা ট্রেন স্টপেজে অন্য কিছুর দোকান থাকুক না থাকুক, একটি পানের দোকান থাকবেই। এর থেকেই পান খাওয়ার বহুল ব্যবহার এবং পানের জনপ্রিয়তা আমরা বুঝতে পারি।

পান বেশির ভাগ মানুষই খায় নেশার কারণে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পানে নেশকারক কোন উপাদান নেই। কিন্তু, লোকে পান খায় মশলা ও তামাক সহযোগে। খারাপ গুন তামাকের ও সহযোগী মশলার, আর নাম খারাপ হয় পানের।

পানপাতা কী?

পান পাতা একটি হৃদয় আকৃতির, সবুজ রঙের পাতা যা Piperaceae পরিবারের অন্তর্গত। পানপাতার বৈজ্ঞানিক নাম Piper betle. ভারতে প্রাচীন কাল থেকেই পান পাতাকে ধর্মীয় আচারে ব্যবহার করা হয় কারণ এটি শুভ হিসাবে বিবেচিত হয়।

পান পাতাতে ভিটামিন সি, থায়ামিন, নায়াসিন, রিবোফ্লাভিন এবং ক্যারোটিনের মতো ভিটামিন রয়েছে এবং এটি ক্যালসিয়ামের একটি দুর্দান্ত উৎস। পান বিভিন্ন রকমের হয় যেমন: মিঠা পাতি, মালবী, মাদ্রাসি, বেনারসী, কর্পুরী প্রভৃতি৷

পান পাতার ব্যবহার:

ভারতবর্ষের প্রাচীন ভেষজ গ্রন্থ “আয়ুর্বেদে” নিঃশ্বাস দুর্গন্ধমুক্ত রাখার জন্য পান সেবনের উল্লেখ আছে। বহুবর্ষজীবী, চিরসবুজ, ভেষজ গুণসম্পন্ন পানপাতা আয়ুর্বেদ চিকিৎসক ও জ্যোতির্বিদ দ্বারা বহুল ব্যবহৃত। এটি এ উপমহাদেশের এক প্রাচীন ধারণা ও লোক অভ্যাস।

পান-সুপারি দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন আমাদের দেশের তথা উপমহাদেশের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধা ও শুভ সূচনার প্রতীক হিসাবে পান ব্যবহৃত হয়। এই উপমহাদেশে পান খাওয়ার রীতি বেশ পুরোনো। খাওয়ার পরে পান না হলে অনেকের চলেই না।

পান খেলে কি মুখে ক্যান্সার হয়?

পান খেলে মুখে ক্যান্সার হয় না। পান পাতা তামাক, সুপারি, পাথুরে চুন ইত্যাদি সহযোগে দীর্ঘদিন ধরে খেলে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আপনি জানলে অবাক হবেন যে, পানপাতার রস মুখের ক্যান্সার অর্থাৎ ওরাল ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।

পানপাতার রস ক্যান্সার সৃষ্টিকারী কার্সিনোজেনগুলি প্রতিরোধ করে। মুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে পানপাতা মুখে নিয়ে চিবান কারণ এটি আমাদের লালাতে অ্যাসকরবিক অ্যাসিডের মাত্রা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

পান পাতার স্বাস্থ্য উপকারিতা:

পান পাতার স্বাস্থ্য উপকারিতা নিচে আলোচনা করা হলো-

অ্যান্টি-ডায়াবেটিক এজেন্ট:

আপনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অ্যান্টি-ডায়াবেটিক ওষুধ সেবন করছেন। মনে করছেন ভালোই তো আছি, চিন্তা কি? না আপনি ভালো নেই। এটি চিন্তার বিষয়। কারণ দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন অ্যান্টি-ডায়াবেটিক ওষুধ সেবন লিভার এবং কিডনির ক্ষতি করে থাকে।

গবেষণায় উঠে এসেছে যে, শুকনো পান পাতার গুঁড়াতে সদ্য নির্ণয় করা টাইপ-2 ডায়াবেটিস মেলিটাসযুক্ত ব্যক্তিদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হ্রাস করার ক্ষমতা রয়েছে এবং এই ভেষজ প্রতিকারটি কোনও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ছাড়াই কাজ করে।

উচ্চ কোলেস্টেরলের স্তর হ্রাস করে:

উচ্চ কোলেস্টেরল স্তর হল হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে যে, পান পাতাগুলি মোট কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইডস, খারাপ কোলেস্টেরল হ্রাস করতে সহায়তা করে। তদুপরি, ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে সহায়তা করে। কিভাবে এটি সম্ভব?কারণ পানপাতায় রয়েছে একটি প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টে যার নাম ইউজেনল।

অ্যান্টি-ক্যান্সার এজেন্ট:

তামাক এবং সুপারি সহযোগে পান খেলে মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। পান ফিনোলিক যৌগের ভান্ডার যা অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট, অ্যান্টি-মিউটেজেনিক, অ্যান্টি-প্রলাইভেটিভ এবং অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্যযুক্ত। গবেষণায় বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে পান পাতার কেমো-প্রতিরোধক সম্ভাবনা প্রকাশ করা হয়েছে।

অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল এজেন্ট:

পান পাতায় অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তদতিরিক্ত, পান পাতায় ফেনোলিকস এবং ফাইটোকেমিক্যালগুলির উপস্থিতি গ্রাম-পজিটিভ এবং গ্রাম-নেতিবাচক উভয় ব্যাকটেরিয়া থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে।

ক্ষত নিরাময়ে সহায়তা করে:

গবেষণায় দেখা গেছে যে, পান পাতা ক্ষত নিরাময় প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। আরও পাওয়া গেছে যে, পোড়া ক্ষতের ক্ষেত্রে পান পাতার নির্যাস ক্ষত নিরাময়ে খুব শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। পান অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলির একটি দুর্দান্ত উৎস। এই অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টগুলি অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হ্রাস করে এবং দ্রুত ক্ষত নিরাময়ে আরও সহায়তা করে।

মাথাব্যথার প্রতিকার করে:

আপনি যদি গুরুতর মাথাব্যথায় ভুগে থাকেন তবে পান পাতা আপনার উপকারে আসতে পারে। পাতায় শীতল বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা বাহ্যিকভাবে প্রয়োগ করলে ব্যথা থেকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিকারে সাহায্য করে।

অ্যান্টি-অ্যাজমাটিক এজেন্ট:

পান পাতা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্যযুক্ত সুতরাং এটি হাঁপানির চিকিৎসায় সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, পান পাতার অ্যান্টি-হিস্টামিনিক ক্রিয়াকলাপ শ্বাসনালীর হাঁপানির সমস্যা হ্রাস করার ক্ষেত্রে কার্যকারী এজেন্ট হতে পারে।

তদুপরি, পান পাতায় থাকা  অয়েল এবং পলিফেনলগুলি অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্য রাখে যা হাঁপানির সমস্যাগুলি হ্রাস করতে সহায়তা করে।

মৌখিক স্বাস্থ্য উন্নত করে:

মুখে উপস্থিত প্যাথোজেনগুলি দাঁতের সংক্রমণ এবং ডেন্টাল কেরিজের জন্য দায়ী। গবেষণায় দেখা গেছে যে, পান পাতা চিবানো ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি এবং ক্রিয়াকলাপকে বাধা দিতে পারে।

পান পাতা মুখ সতেজ হিসাবে খুব জনপ্রিয় এবং এটি ভেষজ ওষুধ হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। পান পাতা লালা ব্যাকটিরিয়া দ্বারা উৎপাদিত অ্যাসিড প্রতিরোধ করে ডেন্টাল ক্যারিগুলি থেকে রক্ষা করে।

গ্যাস্ট্রিক আলসার চিকিৎসার:

গবেষণায় দেখা গেছে যে, পান পাতা চিবানো গ্যাস্ট্রিক আলসার চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী প্রতিকার। যে এজেন্টগুলি আলসার সৃষ্টি করে তারা অন্ত্রের অভ্যন্তরের আস্তরণের ক্ষতি করে, পাতাগুলি গ্যাস্ট্রিক ক্ষত তৈরিতে বাধা দেয়। গ্যাস্ট্রিক অ্যাসিড নিঃসরণের পরিমাণকে হ্রাস করে।

গলার সমস্যায় পান খুব উপকারী৷ আওয়াজ পরিস্কার করতে পান সাহায্য করে৷ এ ছাড়া পান পাতা কাম ও স্নায়ু উদ্দীপক, কোষ্ঠকাঠিন্য, বদহজম, বাতব্যথা দূর করতে অত্যন্ত কার্যকর।মুখের দুর্গন্ধে পান পাতা মুখের দুর্গন্ধ দূর করে।খুশকি দূর করতে পান পাতা বেটে মাথায় মাখলে খুশকি দূর হয়।

পানের সঙ্গে গোলমরিচ, লবঙ্গ মিশিয়ে খেলে কাশি কমে যায়৷সর্দি কাশি হলে পানের রসের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলে উপকার পাওয়া যায়৷

সতর্কতাঃ

যা কিছু খাবেন পরিমাণমতো খাবেন। আপনার শরীরের অবস্থা বুঝে খাবেন। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়। শুধু পানের বা পানের রসের উপকারিতা অনেক তাই আপনি মাঝে মাঝে পান খেলে কোনো ক্ষতি নেই। তামাক ও অনেক রকমের মসলা বাদ দিন।

আপনি যদি কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত হন বা নিয়মিত কোনো মেডিকেল কোর্স-এর ভেতর দিয়ে যান তাহলে খাবার আগে অবশ্যাই আপনার ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী খাবেন।

সূত্র: indiatoday.in, medindia.net, wiki

Share