“হলুদ” ক্যান্সার প্রতিরোধ করে, ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি এবং বাতের ব্যথা কমাতে সহায়তা করে।

হলুদকে প্রাকৃতিক ঔষুধের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঔষুধ বিবেচিত করা যায় তার গুনের জন্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, হলুদে রয়েছে প্রচুর মাত্রায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্ট-ভাইরাল এবং অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান। সেই সঙ্গে মজুত রয়েছে অ্যান্টি ফাঙ্গাল এবং অ্যান্টি-কার্সিনোজেনিক প্রপাটিজ। যা আমাদের আর্থারাইটিস, ক্যান্সার, আলঝাইমার ডিজিজ, ডায়াবেটিস, একাধিক স্ক্লেরোসিস, অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস, এইচআইভি/এইডস, যৌন সংক্রমণজনিত রোগগুলি (হেপাটাইটিস-সি, যৌনাঙ্গে হার্পিস), জ্বালাময়ী অন্ত্র সিন্ড্রোম, বদহজম, ব্যথা, ব্রণ, মূত্রনালীর সংক্রমণ, কিডনি সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে এবং বহিরাগত আলসার চিকিৎসার জন্য হলুদ ব্যবহৃত হয়।

হলুদ বা হলদি এর বৈজ্ঞানিক নামঃ Curcuma longa এবং ইংরেজিতে বলা হয় Turmeric। এটি আদা পরিবারের অন্তর্গত একটি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। হলুদকে অনেক শুভ বলে মনে করা হয় কারণ বিয়ের শুরুটা গায়ে হলুদ দিয়ে হয়। শুধুমাত্র বিভিন্ন ধরণের সামাজিক সংস্কারে হলুদ ব্যবহারের জন্যই নয়, পাশাপাশি তার শক্তিশালী এবং আধ্যাত্মিক গুণাবলীর জন্যও হলুদকে অত্যন্ত মূল্যবান বলে মনে করা হয়। আয়ুর্বেদে, প্রাচীন প্রাকৃতিক নিরাময় হিসাবে বহু শতাব্দী ধরে হলুদ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এছাড়া এটি আয়ুর্বেদিক ঔষুধ, ক্রিম, লোশন, পেস্ট এবং মলমেও ব্যবহার করা হচ্ছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, হলুদ আমাদের দেহ এবং মস্তিষ্কের জন্য অনেক বেশি উপকারী।

বাঙালীর রান্নায় স্বাদের পাশাপাশি রান্নার রং ভালো তো হওয়া চায়। রান্নায় স্বাদ, ঘ্রান এবং চেহারার একটা নুতুন মাত্রা যোগ করে হলুদ। হলুদ বাঙালি রান্না ঘরের অপরিহার্য একটি মসলা। যেটা ছাড়া রান্না সম্পূর্ণ মনে হয় না। সাধারণত কাঁচা হলুদ রোদে শুকিয়ে গুড়ি করে আমরা রান্নায় ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু হলুদ কাঁচা অবস্থায় পেস্ট করে আমরা রান্নায় ব্যবহার করতে পারি।

হলুদের রস ক্ষত এবং জোঁকের কামড় নিরাময়ে সহায়তা করে। হলুদ, চুন এবং নুন দিয়ে তৈরি পেস্ট ফোলা ও ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। নিম পাতা, হলুদ দিয়ে তৈরি পেস্ট দাদ, চুলকানি, একজিমা এবং অন্য কোনও পরজীবী সংক্ৰমনের থেকে রক্ষা করতে পারে।

হলুদের উপকারীতা

অনেক ঔষধি গুণাবলী থাকা সত্বেও হলুদের উপকারীতা সম্পর্কে আমাদের খুব বেশি ধারণা নেয়। নিচে হলুদের স্বাস্থ্য উপকারীতা আলোচনা করা হলো-

ক্যান্সার প্রতিরোধ করে:

হলুদ ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সহায়তা করতে পারে। হলুদে আছে কারকুমিন (Curcumin) যা ক্যান্সার চিকিৎসায় একটি উপকারী ঔষুধ। এটি ক্যান্সারের বৃদ্ধি, বিকাশ এবং ছড়িয়ে পড়া হ্রাস করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এটি ক্যান্সারজনিত কোষগুলির মৃত্যুতে অবদান রাখে এবং টিউমারগুলিতে নতুন রক্তনালীর বৃদ্ধি এবং ক্যান্সারের বিস্তার হ্রাস করতে পারে। একাধিক গবেষণায় ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে কারকুমিন পরীক্ষাগারে ক্যান্সারজনিত কোষগুলির বৃদ্ধি হ্রাস করতে পারে এবং টিউমারগুলির বৃদ্ধিতে বাধা দিতে পারে।

আলঝেইমার (স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া) চিকিৎসায়:

আলঝেইমার একটি নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ যা মানুষের স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। দুর্ভাগ্যবসত আলঝেইমার এর কোনও ভাল চিকিৎসা নেয়। তাই এটি প্রথম থেকেই এটিকে প্রতিরোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হলুদে থাকা কারকুমিন আলঝাইমার রোগ প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কুকারমিন আলঝাইমার রোগ কতটা প্রতিরোধ করে তা নিয়ে এখন গবেষণা চলছে।

আর্থ্রাইটিস (জয়েন্টে ব্যথা) চিকিৎসায়:

আর্থ্রাইটিস (জয়েন্টে ব্যথা) পশ্চিমা দেশগুলিতে একটি সাধারণ সমস্যা। হলুদে থাকা কারকুমিন একটি শক্তিশালী অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি যৌগ। গবেষণায় প্রমাণিত কারকুমিন বাতের (জয়েন্টে ব্যথা) ব্যথা কমাতে সহায়তা করে। রিউমাটয়েড (rheumatoid) আর্থ্রাইটিসযুক্ত ব্যক্তিদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, কার্কিউমিন একটি অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি (ব্যথা নাশক) ঔষুধ এর থেকে বেশি কার্যকর ছিল।

হার্টের জন্য ভালো:

বিশ্বে মৃত্যুর এক নম্বর কারণ হল হার্টের রোগ। হার্টের রোগ অবিশ্বাস্যরকম জটিল এবং বিভিন্ন কারণে এটি হতে পারে। হলুদে থাকা কুকারমিন হৃদরোগের অন্যতম কারণ এন্ডোথেলিয়াল ডিসফাংশন প্রক্রিয়াটি ভালো করে হার্টের রোগ নিরাময়ে ভূমিকা রাখে। একটি গবেষণায় এলোমেলোভাবে ১২১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যারা করোনারি আর্টারি বাইপাস সার্জারি করছিলেন, তাদের সার্জারির কয়েকদিন আগে এবং পরে প্রতিদিন ৪ গ্রাম কারকুমিন দেওয়া হয়। হাসপাতালে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ঝুঁকি ক্যারকুমিন গ্রুপের ৬৫% হ্রাস পেয়েছিল।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে:

হলুদে থাকা সক্রিয় উপাদান কারকুমিন, রক্তে শর্করার মাত্রা কমিয়ে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। পাশাপাশি কিডনি ভালো রাখতে সহায়তা করে।

হলুদে অ্যান্টিসেপ্টিক গুণাবলি রয়েছে:

হলুদে প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপ্টিক ও অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যে কারণে হলুদ যেকোনো সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে। শরীরের কোনো কাটা বা পোড়া ক্ষত স্থানে হলুদ লাগিয়ে দিলে দ্রুত ক্ষত ও ক্ষতের ব্যথা কমে যায়।

হলুদ শরীরের অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট এর ক্ষমতা বাড়ায়:

হলুদ শরীরের অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট এর ক্ষমতা বৃদ্ধি করে ফ্রি র‌্যাডিক্যালস এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে। কারকুমিন একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট যা এর রাসায়নিক কাঠামোর কারণে ফ্রি র‌্যাডিকেলগুলিকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে। এছাড়াও, কারকুমিন আমাদের দেহের নিজস্ব অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট, এনজাইমগুলির ক্রিয়াকলাপ বৃদ্ধি করে।

সর্দি-কাশির ক্ষেত্রে:

হলুদের লাইপোপলিস্যাকারাইড দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। এর অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল, অ্যান্টিভাইরাল ও অ্যান্টিফাঙ্গাল ঠান্ডা, সর্দি, কাশি হওয়ার প্রবণতাকে কমায়। সর্দি-কাশি কমাতে হলুদের রস বা এক টুকরো কাঁচা হলুদের সাথে মধু মাখিয়ে তা মুখের মধ্যে রেখে আস্তে আস্তে খেতে পারেন। সেটা করতে না পারলে এক গ্লাস গরম দুধের মধ্যে হলুদের গুড়ি, সামান্য মাখন এবং গোলমরিচ গুঁড়ি মিশিয়ে খান। কাশি ও গলা ব্যথা দূর করবে।

হলুদ ত্বক উজ্জ্বল ও ব্রণ দূর করতে:

এটির মধ্যে এন্টিসেপ্টিক এবং এন্টিব্যাক্টেরিয়াল উপাদান থাকে যেটি ব্রণ দূর করতে সাহায্য করে। এটি শুধু ব্রণই দূর করে না, তার সাথে ব্রণের দাগ কমিয়ে দিয়ে মুখের উজ্বলতা বাড়িয়ে তোলে। কাঁচা হলুদ বাটা, চন্দন গুঁড়া, লেবুর রস এক সাথে মিশিয়ে ১৫ মিনিট মুখে লাগিয়ে রাখুন। শুকিয়ে গেলে উষ্ণ গরম পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এছাড়া ব্রণের উপর কাঁচা হলুদ বেটে ১৫ মিনিট লাগিয়ে রাখুন। ব্রণ তাড়াতাড়ি দূর হবে।

বলিরেখা দূর করতে:

হলুদ ত্বকের বলিরেখা দূর করতে সাহায্য করে। ২/৩ চিমটি হলুদ গুঁড়া, চালের গুঁড়া, টমেটো রস, কাঁচা দুধের সাথে মিশিয়ে ১৫ মিনিট মুখে লাগিয়ে রাখুন। তারপর উষ্ণ গরম পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। ত্বকের বয়েসের ছাপ দূর করে ত্বক ফর্সা করে তুলবে। এছাড়া চোখের নীচে কালো দাগ দূর করতে হলুদ গুঁড়ার সাথে মাখন মিশিয়ে চোখের নীচে ২০ মিনিট লাগিয়ে রাখুন। পরে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে চোখ ধুয়ে ফেলুন। এটি চোখের নীচে বলিরেখা সহ কালো দাগও দূর করবে।

লিভারের জন্য ভালো:

লিভারকে চাঙ্গা এবং কর্মক্ষম রাখতে হলুদের কোনো বিকল্প নেই। কারণ এর মধ্যে থাকা কার্কিউমিন নামক উপাদানটি লিভারের কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। জন্ডিসে গায়ের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে আসছে বুঝতে পারলে হলুদের রসের সাথে চিনি বা মধু মিশিয়ে খেতে পারেন। লিভারের যেকোনো সমস্যায় দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষুধ খান।

হাঁপানি:

হলুদ গুঁড়ো, আখের গুড় ও খাঁটি সরিষার তেল এক সাথে মিশিয়ে খেলে হাঁপানি কাজ করবে। এ ছাড়া এক চা-চামচ হলুদের গুঁড়ি এক গ্লাস দুধে মিশিয়ে দিনে দুই-তিনবার খেলে ভালো উপকার মেলে। এটি খালি পেটে খাওয়া ভালো।

হলুদ চা

তিন থেকে চার কাপ পানি ১ চা চামচ হলুদ দিয়ে ভালো করে ফুটিয়ে নিয়ে মধু, লেবুর রস এবং স্বাদ মতো দুধ দিয়ে খেতে পারেন। তাছাড়া ১ গ্লাস দুধে হাফ চামচ হলুদ ও ১ চামচ মধু মিশিয়ে শরবত করে খেতে পারেন।

অবশেষে, হলুদের অনেকগুলি ইতিবাচক স্বাস্থ্যে উপকারীতা (যেমন- হার্টের রোগ প্রতিরোধের সম্ভাবনা, আলঝেইমার এবং ক্যান্সারের চিকিৎসায়) থাকার কারণে হলুদ আমাদের দীর্ঘায়ু লাভে সহায়তা করতে পারে।

Share