বাঙ্গি শরীর ঠান্ডা রাখে, হার্টের রোগের ঝুঁকি কমায় ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

গ্রীষ্মের দাবদাহে প্রকৃতি যখন রুক্ষ হয়ে ওঠে তখন শীতলতার পরশ বুলিয়ে দিতে প্রকৃতিতে আবির্ভাব হয় তরমুজ, বাঙ্গির। তরমুজের মত বাঙ্গিতেও রয়েছে অনেক পুষ্টিগুণ যা আমাদের শরীরকে শীতল করার পাশাপাশি পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে। অনেকের কাছে বাঙ্গি অতটা আকর্ষনীয় না হলেও এর পুষ্টিগুণ এর কারণে গ্রীষ্ম মৌসুমে খুবই উপকারী ফল বাঙ্গি।

বাঙ্গির ইংরেজি নাম Muskmelon এবং বৈজ্ঞানিক নাম Cucumis melo। বাঙ্গি কাঁচা অবস্থায় সবুজ থাকে এবং পাকলে হলুদ রঙের হয়। একটু বেশি পেকে গেলে বাঙ্গি সহজে ফেটে যায়। এটি আমাদের দেহকে সতেজ রাখার পাশাপাশি পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে, ত্বকের সমস্যা দূর করতে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। বাঙ্গির আরও কয়েকটি নাম রয়েছে। যেমন: খরমুজ, কাঁকুড়, ফুটি বা বানি।

বাঙ্গি স্বাস্থ্যের পক্ষে কতটা ভালো?

বাঙ্গি স্বাস্থ্যের পক্ষে কতটা ভালো এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এতে বিটা ক্যারোটিন, পটাশিয়াম, ভিটামিন “সি” এবং ভিটামিন “এ” রয়েছে। এগুলি আমাদের কেবল সুস্থ্য রাখতেই সহায়তা করে না, এটি হার্টের রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে। ত্বকের জন্যও দুর্দান্ত।

বাঙ্গি গরম নাকি ঠান্ডা?

বাঙ্গির শীতলকারক এবং মূত্রবর্ধক বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে এটি গ্রীষ্মের একটি উপকারী ফল যা দেহকে হাইড্রেটেড রাখার অর্থাৎ পানিশূন্যতা দূর করার পাশাপাশি শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ দূর করতে সহায়তা করে। এজন্য পরিমিত পরিমাণ বাঙ্গি গ্রহণ আমাদের শরীরকে ঠান্ডা রাখে।

বাঙ্গির পুষ্টি উপাদান

নিচে বাঙ্গির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিউপাদান দেওয়া হলো –

  • ক্যালোরি: ৬৪
  • কার্বস: ১৬ গ্রাম
  • ফাইবার: ১.৪ গ্রাম
  • ভিটামিন “সি”: ৫৩% (RDI)
  • ভিটামিন বি-6: ৮% (RDI)
  • ফোলেট: ৮% (RDI)
  • ভিটামিন “কে”: ৬% (RDI)
  • পটাশিয়াম: ১২% (RDI)
  • ম্যাগনেসিয়াম: ৪% (RDI)

বাঙ্গির উপকারীতা

বাঙ্গি, ফুটি বা কাকুড় এক রকমের শশা জাতীয় ফল। আমরা অনেকেই এই ফলটিকে পছন্দ করিনা। কিন্তু এর রয়েছে অনেক উপকারীতা। নিচে সেগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো –

রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে:

যেকোনো ফলমূল এবং শাকসবজি উচ্চ রক্তচাপ এবং হার্টের রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে। কম-সোডিয়াম ডায়েট এবং পর্যাপ্ত পটাসিয়াম গ্রহণ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ কার্যকরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। যেহেতু বাঙ্গি কম-সোডিয়াম এবং পটাসিয়াম সমৃদ্ধ ফল, এটি আপনাকে স্বাস্থ্যকর রক্তচাপের মাত্রা বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। যদি আপনি আপনার পটাশিয়াম গ্রহণের পরিমাণ বাড়িয়ে তুলতে চান তবে আপনার ডায়েটে বাঙ্গি রাখার চেষ্টা করুন।

রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখে:

কিছু গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে বাঙ্গি জাতীয় ফল খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রাখতে সাহায্য করে। অর্ধ মিলিয়ন লোকের সাম্প্রতিক সাত বছরের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, যারা প্রতিদিন টাটকা ফল গ্রহণ করেন তাদের ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা কম ছিল যারা তুলনামূলকভাবে ফল খেয়েছিলেন তাদের তুলনায়। গবেষণার শুরুতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ডায়াবেটিস ছিল, তাদের প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে তিনবার ফল খাওয়ার ফলে অকাল মৃত্যুর হার ১৭% কম ছিল। যদিও বাঙ্গিতে কার্বস রয়েছে যা রক্তে সুগারকে অস্থায়ীভাবে বাড়িয়ে তুলতে পারে। তবে এটি ফাইবার এবং অন্যান্য পুষ্টি সরবরাহ করে যা সময়ের সাথে রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করতে পারে।

পানিশূন্যতা দূর করে এবং পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে:

ডিহাইড্রেশনের কথা ভাবলেই, প্রথমে যে বিষয়টি মনে আসে তা হল পানি। কার্যকরভাবে এবং সঠিকভাবে পানিশূন্যতা দূর করার জন্য ইলেক্ট্রোলাইটের প্রয়োজন হয়। পানির মধ্যে যদি খনিজ উপাদান থাকে তখন তাকে ইলেক্ট্রোলাইট বলা হয়। বাঙ্গিতে প্রায় ৯০% পানি এবং এতে রয়েছে পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়াম এবং ক্যালসিয়াম তাই এটি একটি ইলেক্ট্রোলাইট পানীয়। পানি এবং পুষ্টির সংমিশ্রণের এই ফলটি ব্যায়ামের পরে, অসুস্থ্যতার সময় বা পানিশূন্যতা দূর করার জন্য বাঙ্গি দুর্দান্ত।

ত্বকের সমস্যা দূর করে:

বাঙ্গিতে থাকা উচ্চ ভিটামিন “সি” সামগ্রীর কারণে এটি স্বাস্থ্যকর ত্বকের জন্য উপকারী। আমাদের শরীরে কোলাজেনের পরিমান ঠিক রাখতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন “সি” গ্রহণ করা খুবই জরুরি। কোলাজেন একটি প্রোটিন যা ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা ঠিক করে এবং স্বাস্থ্যকর ত্বক বজায় রাখতে সাহায্য করে। ভিটামিন “সি” একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, কিছু গবেষণা নির্দেশ করে যে এটি ত্বককে সূর্যের আলোর ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।

হজম স্বাস্থ্যের জন্য ভালো:

বাঙ্গিতে ফাইবার রয়েছে, এটি এমন একটি পুষ্টি যা হজম স্বাস্থ্যের উন্নতি করে। পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাইবার গ্রহণের ফলে রক্তে শর্করা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে না এবং পরিপাক তন্ত্র স্বাস্থ্যকর থাকে। কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগছেন এমন লোকেদের জন্য বাঙ্গি উপকারী।

দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে:

বাঙ্গিতে দুটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে: লুটিন এবং জেক্সানথিন। এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট দুটি চোখের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো এবং বয়সের সাথে সম্পর্কিত দৃষ্টি হ্রাস করতে পারে।

রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে:

যেহেতু এটি ভিটামিন-“সি” তে ভরপুর তাই এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়াও শ্বেতরক্ত কনিকার পরিমান বাড়ায় যা ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে।

হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো

বাঙ্গিতে বেশ কয়েকটি পুষ্টি রয়েছে যেমন ফোলেট, ভিটামিন “কে” এবং ম্যাগনেসিয়াম। যা হাড় শক্তিশালী করতে ও ঘনত্ব বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাঙ্গি ফোলেটের একটি ভাল উৎস। এছাড়া বাঙ্গিতে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস এবং জিঙ্ক রয়েছে। এই সব পুষ্টি উপাদান হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।

সতর্কতা:

বাঙ্গি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে না খাওয়াই ভাল। কারণ হজমে সমস্যা হতে পারে। আবার অতিরিক্ত বাঙ্গি খেলেও হজমের সমস্যা হতে পারে।

সূত্র: হেলথলাইন

Share