“কালোজিরা” কিডনি, দাঁত ভালো রাখে। ব্রণ, মাথা ব্যথা ও জয়েন্টের ব্যথা কমায়।

বাংলায় কালোজিরা, হিন্দিতে কালোনজি, ইংরেজিতে Nigella seed (নাইজেলা সীড)। কালোজিরা একটি আকর্ষণীয় মশলা। এটি খাবারে একটি সুন্দর সুবাস এবং স্বাদ আনে যা ভোলার মতো নয়। খুবই মুগ্ধকর ও মুখরোচক এর গন্ধ। শুধুই কি সুবাস, এর স্বাস্থ্য সুবিধার কথা বলে শেষ করা যাবে না। সিঙ্গাড়া বা নিমকি কালোজিরা বাদে খাওয়ার কথা ভাবাই যাই না। সল্টেড বিস্কুট-একই কথা। কালোজিরা ছাড়া জাস্ট ভাবাই যাই না। কালোজিরা ফোড়ন দিয়ে রান্না করা ডাল, মাছ মাংস, বিভিন্ন পদের শাক খাবারের স্বাদ, গন্ধ ও পুষ্টি বাড়িয়ে দেয় কয়েকগুন।

কালোজিরা আয়ুর্বেদীয়, ইউনানী, কবিরাজী ও লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহার হয়। Renunculeceae-পরিবারের এই মসলাটির বৈজ্ঞানিক নাম Nigella sativa, এটি পাঁচ ফোড়নের একটি উপাদান। তারুণ্য ধরে রাখতে মধ্যপ্রাচ্যে কালোজিরা খাওয়াটা দীর্ঘদিনের রীতি। কাজ করার শক্তিকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে এই কালোজিরা। কালোজিরা ক্রিমি দূর করতেও ব্যবহৃত হয়।

দারুণ উপকারী মশলা কালোজিরা। তাই একে খাদ্য না বলে পথ্য বলাটাই ঠিক। জ্বর, কফ, গায়ের ব্যথা দূর করতে কালোজিরা একটা দারুণ ঘরোয়া ঔষুধ। এতে রয়েছে খিদে বাড়ানোর উপাদান। অন্ত্রের জীবাণুকে নাশ করে শরীরের জমে থাকা গ্যাসকেও দূর করে দিতে কালোজিরার বিকল্প নেই। আবার যাদের শরীরে পানি জমে হাত-পা ফুলে যাওয়ার সমস্যা রয়েছে, তাদের পানি জমতে বাধা দেয় কালোজিরা। বয়স হলে হাত-পা ফুলে যাওয়াটা একটা বড় সমস্যা। একদিকে প্রস্টেট জনিত সমস্যা সেই সঙ্গে কিডনি জনিত রোগের কম-বেশি বয়স্কদের পা ফোলা সমস্যায় ভোগেন। কালোজিরা এই সমস্যা রুখতে পারে। কাঁচা কালোজিরা পিষে খেলে মায়ের বুকের দুধ বৃদ্ধি পায়।

কালোজিরার স্বাস্থ্যসুবিধা:

ছোট কালো এই বীজ আপনি কৌটায় বা বয়ামে ভরে বাড়িতে রেখে দিন, অনেক সমস্যায় কাজে লাগবে। কালোজিরার তেলও বোতলে ভরে রেখে দিতে পারেন। এর উপকারিতা অনেক।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে :

এটি সম্ভবত কালোজিরার অন্যতম পরিচিত স্বাস্থ্যসুবিধা। আপনার যদি ইতিমধ্যে ডায়াবেটিস থাকে তবে কালোজিরার তেল এটি কমাতে সহায়তা করতে পারে। প্রতিদিন সকালে এক কাপ চায়ে আধা চা চামচ কালোজিরার তেল নিন এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পার্থক্য দেখুন। অনেকে এক চিমটি কালোজিরার বীজ পানপাতা সহযোগে খেয়ে থাকে। এতেও রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে ভালো কাজ দেয়।

মাথা ব্যাথা দূর করে :

আজকের সময়ের সবচেয়ে সাধারণ শহুরে সমস্যাগুলির মধ্যে একটি হল মাথা ব্যথা। আপনি দোকান থেকে ব্যাথার ওষুধ এনে খেয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু ব্যথানাশক এসব ওষুধের খারাপ প্রতিক্রিয়া রয়েছে। ক্যাপসুল, বড়ির পরিবর্তে আপনার কপালে কালোজিরার তেল ঘষুন এবং আপনার মাথা ব্যথা কমার জন্য অপেক্ষা করুন। প্রাকৃতিক ঘরোয়া প্রতিকারের মতো ভালো কিছুই হতে পারে না।

ব্রণ দূর করে :

মিষ্টি লেবুর রস এবং কালোজিরার তেল একসাথে ত্বকের অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারে। প্রতি কাপ লেবুর রসের জন্য আপনার প্রায় আধা চা চামচ কালোজিরার তেল লাগবে। আপনার মুখে দিনে দুবার তেল লাগান এবং আপনার দাগ এবং ব্রণ অদৃশ্য হয়ে যাবে।

ওজন কমাতে সাহায্য করে :

যারা ওজন কমাতে চান তাদের জন্য প্রায়শই গরম জল, মধু এবং লেবুর রস একত্রে মিশিয়ে খাবার পরামর্শ দেয়া হয়। এবার এই মিশ্রণে এক চিমটি কালোজিরার গুঁড়ো যুক্ত করুন এবং দেখুন এটি কীভাবে কাজ করে। অনেক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ দাবি করেছেন যে, কালোজিরার বীজ একটি অলৌকিক উপাদান যা শরীরের অতিরিক্ত ক্যালোরি বার্ন করতে পারে।

মেধাশক্তি বৃদ্ধি করে :

কিছুটা পরিমান মধু এবং কালোজিরা বীজ স্মৃতিশক্তি বাড়াতে খুবই কার্যকর। এতে শিশুদের ক্ষেত্রে মেধার বিকাশ ঘটে। যদি আপনি এটি হালকা গরম জল সহযোগে গ্রহণ করেন তবে এটি বাচ্চাদের এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট (অ্যাজমা) হ্রাস করতেও সহায়তা করে। তবে আপনাকে এটি কমপক্ষে 45 দিনের জন্য করতে হবে এবং এটা করাকালীন সময় ঠাণ্ডা পানীয় এবং খাবার এড়ানো উচিত।

জয়েন্টের ব্যাথা কমায় :

এটি একটি পুরানো স্কুল চিকিৎসা–এক মুঠো কালোজিরার বীজ নিন এবং সরিষার তেল দিয়ে ভাল করে গরম করুন। তেলটি গরম হয়ে গেলে এটি শিখা থেকে নামিয়ে কিছুক্ষণ ঠান্ডা করুন। আঙুলের ডগায় হালকা গরম তেল মাখিয়ে এই তেলটি ফোলা জয়েন্ট-এ মালিশ করুন। কালোজিরা একটি শক্তিশালী অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল এজেন্ট। এটি সহজেই শরীরের রোগ-জীবাণু ধ্বংস করে দিতে পারে। এই অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল উপাদানের জন্য দেহের ঘা, ফোঁড়া কম সময়েই সারে।

কিডনি ভালো রাখে :

কিডনিতে পাথর একটি সাধারণ শহুরে সমস্যা। বলা হয় যে কালোজিরার তেল আধা চা-চামচ, দুই চা চামচ মধু এবং গরম জল দিয়ে খেলে কিডনির ব্যথা, পাথর এবং সংক্রমণ থেকে মুক্তি পেতে সহায়তা করতে পারে। তবে কিডনি সমস্যায় একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

দাঁত শক্ত করে :

আপনি কি জানেন যে, কালোজিরা বা nigella seeds বা কলোনজী ঐতিহ্যগতভাবে দাঁতের সমস্যা যেমন মাড়ির ফোলাভাব বা রক্তক্ষরণ এবং দুর্বল দাঁতগুলির যত্ন নিতে ব্যবহার করা হয়। অবশ্যই আপনাকে দাঁতের ডাক্তার দেখাতে হবে তবে আপনার মাড়িকে শক্তিশালী করতে আপনার দাঁতে দই এবং কিছু কালোজিরার তেল দিয়ে দিনে দুবার মালিশ করতে পারেন। দাঁতে ব্যথা হলে হালকা গরম জলে কালোজিরা দিয়ে কুলকুচু করলে ব্যথা কমে। জিহ্বা, টাকরা বা মাড়িতে থাকা খাদ্যের জীবাণু সহজেই মরে যায়। ফলে মুখে আর দুর্গন্ধ হয় না।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় :

কালোজিরার তেলও আমাদের শরীরের জন্য নানাভাবে উপকারি। কালোজিরার তেলে ১০০টিরও বেশি উপযোগী উপাদান আছে। এতে আছে প্রায় ২১ শতাংশ আমিষ, ৩৮ শতাংশ শর্করা এবং ৩৫ শতাংশ ভেষজ তেল ও চর্বি। কালোজিরার অন্যতম উপাদানের মধ্যে আছে নাইজেলোন, থাইমোকিনোন ও স্থায়ী তেল। এতে আরও আছে আমিষ, শর্করা ও প্রয়োজনীয় ফ্যাটি এসিডসহ নানা উপাদান। পাশাপাশি কালোজিরার তেলে আছে লিনোলিক এসিড, অলিক এসিড, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন, জিংক, ম্যাগনেশিয়াম, সেলেনিয়াম, ভিটামিন-এ, ভিটামিন-বি, ভিটামিন-বি২, নিয়াসিন ও ভিটামিন-সি। শরীরের রোগ প্রতিরোধে কালোজিরার মতো এত সহজে এত কার্যকর আর কোনো প্রাকৃতিক উপাদান আছে বলে জানা যায়নি।

সতর্কতাঃ

তবে হ্যাঁ, সবটাই করতে হবে পরিমিত পর্যায়ে। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়। আপনার শরীরের অবস্থা বুঝে খাবেন। কেননা খুব বেশি কালোজিরা খেলে হিতের চেয়ে বিপরীত হতে পারে। প্রথমে দেখে নেবেন আপনি বা আপনার পরিজনের কালোজিরা সহজে হজম হচ্ছে কিনা। অনেকেই পারেন না। যারা  সহজে কালোজিরা হজম করতে পারেন না তারা খাবেন না। কালোজিরা তেল গর্ভাবস্থায় গ্রহণ করতে হয় না। আপনি যদি কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত হন বা নিয়মিত কোনো মেডিকেল কোর্স এর ভেতর দিয়ে যান তাহলে অবশ্যাই আপনার ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী খাবেন।

সূত্রঃ food.ndtv.com

Share