নাশপাতি ওজন কমায়, হার্ট ভালো রাখে, ডায়াবেটিস ও ক্যান্সার প্রতিরোধে কার্যকরী।

নাশপাতি, দূর থেকে দেখলে মনে হবে আপেল। যখনই খেতে যাবেন তখনই বুঝতে পারবেন আপেল আর নাশপাতির মধ্যে পার্থক্য কোথায়। স্বাদে হালকা মিষ্টি, পানি দিয়ে পরিপূর্ন আর দানা দানা। খুবই হালকা সুমিষ্ট একটি স্বাদ, খেতেই মনে একটা প্রশান্তির ছোঁয়া লাগে। নাশপাতি দেখতে প্রাকৃতিকভাবে ডিম্বাকৃতির। ঠিক যেন লাউয়ের মতো। প্রকারভেদ বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০০ ধরণের নাশপাতি রয়েছে।

সংস্কৃত ভাষায় নাশপাতি অমৃতত্বের ফল বা অমৃত ফল হিসাবে পরিচিত। ইংরেজিতে Pear বৈজ্ঞানিক ভাষায় Pyrus. শক্ত ভূমিতে নাশপাতি গাছ ভাল জন্মে। ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়া মহাদেশ থেকে গাছটির উৎপত্তি ঘটেছে বলে ধারণা করা হয়। নাশপাতির ইংরেজি প্রতিশব্দ পিয়ার সম্ভবত পাশ্চাত্য জার্মান শব্দ পেরা থেকে এসেছে। প্রাচীন গ্রীসে নাশপাতি বমি দূরীভূতজনিত চিকিৎসাকর্মে ব্যবহার করা হতো।

নাশপাতির ৮৩ শতাংশই পানিতে পরিপূর্ণ। নাশপাতিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন “এ”, “বি”, বি-২, “ই”, ফলিক অ্যাসিড ও নিয়াসিন নামের পুষ্টিকর উপাদান। ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রনসহ অন্যান্য মিনারেলেরও উৎকৃষ্ট উৎস। এছাড়া এটি প্রয়োজনীয় অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস এবং ডায়েটরি ফাইবার সমৃদ্ধ।

নাশপাতির পুষ্টি উপাদান

একটি মাঝারি আকারের নাশপাতি নিম্নলিখিত পুষ্টি উপাদান থাকে –

  • ক্যালোরি:১০১
  • প্রোটিন: ১ গ্রাম
  • কার্বস: ২৭ গ্রাম
  • ফাইবার: ৬ গ্রাম
  • ভিটামিন “সি”: ১২% (DV)
  • ভিটামিন “কে”: ৬% (DV)
  • পটাসিয়াম: ৪% (DV)
  • কপার: ১৬% (DV)

নাশপাতির উপকারীতা

নাশপাতি পলিফেনল অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এর একটি দুর্দান্ত উৎস। খোসাসহ নাশপাতি খেতে ভুলবেন না, কারণ খোসার ভিতরের অংশের থেকে খোসাতে ছয়গুণ বেশি পলিফেনল রয়েছে। নাশপাতি ওজন কমাতে, ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে, ডায়াবেটিস এবং হার্টের রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। নিচে এসব উপকারীতা আলোচনা করা হলো –

অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো:

নাশপাতি দ্রবণীয় এবং অদ্রবণীয় ফাইবারের একটি দুর্দান্ত উৎস, যা হজম স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফাইবার মলকে নরম করে অন্ত্রের গতিবিধি ঠিক রাখতে সহায়তা করে। একটি মাঝারি আকারের নাশপাতিতে ৬ গ্রাম ফাইবার থাকে। ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্যতা দূর করতে সহায়তা করে।

ব্যথা কমায়:

প্রদাহ বা ব্যথা একটি সাধারণ বিষয়, তবে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হার্টের রোগ এবং টাইপ-2 ডায়াবেটিস সহ কিছু অসুস্থ্যতার সাথে সম্পর্কিত। নাশপাতিতে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েড অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট প্রদাহের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে এবং রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে। বেশ কয়েকটি বড় পর্যালোচনা অনুসারে, উচ্চ ফ্ল্যাভোনয়েড গ্রহণের ফলে হার্টের রোগ এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি হ্রাস পাই। এছাড়া নাশপাতিতে বিভিন্ন ভিটামিন এবং খনিজ যেমন কপার এবং ভিটামিন “সি” এবং “কে” রয়েছে যা, ব্যথা নিরাময়ে সাহায্য করে।

ক্যান্সার প্রতিরোধে:

নাশপাতিতে বিভিন্ন যৌগ থাকে যা এন্টিকান্সার বৈশিষ্ট্যগুলি প্রদর্শন করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, নাশপাতিতে বিদ্যমান অ্যান্থোসায়ানিন এবং সিনামিক অ্যাসিড ক্যান্সারের সাথে লড়াই করতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। কয়েকটি গবেষণায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে নাশপাতি, ফুসফুস, পেট এবং মূত্রাশয় সহ বেশ কিছু ক্যান্সারের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিছু সমীক্ষায় দেখা যায় যে নাশপাতি মতো ফ্ল্যাভোনয়েড সমৃদ্ধ ফল স্তন এবং জরায়ু ক্যান্সারের বিরুদ্ধেও সুরক্ষা দিতে পারে।

ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়:

নাশপাতি বিশেষত লাল জাতগুলি – ডায়াবেটিসের ঝুঁকি হ্রাস করতে সহায়তা করে। ২০০,০০০ জনেরও বেশি লোকের একটি বড় সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, লাল নাশপাতি জাতীয় অ্যান্থোকায়ানিন সমৃদ্ধ ফলগুলি টাইপ-2 ডায়াবেটিসের ২৩% কম ঝুঁকির সাথে সম্পর্কিত ছিল।

হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে:

নাশপাতি হৃদরোগের ঝুঁকি কমিয়ে দিতে পারে। প্রোকায়ানডিন অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টগুলি হৃদযন্ত্রের টিস্যু ভালো রাখতে সহায়তা করে। এটি খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) হ্রাস করতে পারে এবং ভাল কোলেস্টেরল (HDL) বৃদ্ধি করতে পারে। নাশপাতির খোসার মধ্যে কোয়ার্সেটিন নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট রয়েছে, যা উচ্চ রক্তচাপ এবং কোলেস্টেরলের মাত্রার মতো হৃদরোগের ঝুঁকির কারণগুলি হ্রাস করে।

ওজন কমাতে সহায়তা করে:

নাশপাতিতে ক্যালোরি কম থাকে, প্রচুর পরিমাণ পানি থাকে এবং ফাইবার দ্বারা পূর্ণ থাকে। নাশপাতির এই উপাদান গুলি আমাদের ওজন কমাতে খুব কার্যকরী, কারণ ফাইবার এবং পানি পেট ভরিয়ে রাখতে সহায়তা করে। একটি ১২-সপ্তাহের সমীক্ষায়, ৪০ জন প্রাপ্তবয়স্ক যারা প্রতিদিন ২টা নাশপাতি খেয়েছিলেন তাদের কোমর পরিধি ১.১ ইঞ্চি পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছিল। আরও একটি ১০-সপ্তাহের সমীক্ষায় দেখা গছে যে মহিলারা তাদের ডায়েটে প্রতিদিন ৩ টি নাশপাতি যুক্ত করেছিলেন তাদের গড়ে ১.৯ পাউন্ড (০.৮৪ কেজি) ওজন হ্রাস পেয়েছিল।

সতর্কতা:

আপনি যদি জটিল কোনো রোগে আক্রান্ত হন বা অন্য কোনো কারণে রেগুলার কোনো মেডিকেল কোর্স-এর মধ্য দিয়ে যান তাহলে অবশ্যই খাওয়ার আগে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন।

সূত্র: হেলথলাইন

Share