নারিকেলের তেল হার্টের জন্য ভালো, ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্যের জন্য অতুলনীয়।

নারিকেলের তেল খুবই স্বাস্থ্যকর ও উপকারী তেলের মধ্যে একটি। সাধারণত নারিকেলের তেল আমরা চুলে ব্যবহার করি। মাঝে মাঝে ত্বকের যত্নেও ব্যবহার করি। কিন্তু এই তেল আমরা রান্নায় বা খাবারে খুবই কম ব্যবহার করি। সবথেকে মজার ব্যপার হলো শীতে অর্থাৎ ঠান্ডায় নারিকেল তেল জমে যায় এবং গরমে গলতে শুরু করে।

অনেক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নারিকেল তেল হজম শক্তি বৃদ্ধি করে, স্ট্রেস কমায়, রক্তে উচ্চ শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, ত্বক সুস্থ্য রাখে ও চুলের স্বাস্থ্যের জন্য খুব উপকারী। এই তেলে ভিটামিন “ই”, ভিটামিন “কে” এবং আয়রন রয়েছে। এছাড়া নারিকেল তেলে থাকা অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিফাংগাল এবং অ্যান্টিভাইরাল উপাদান স্বাস্থ্যের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়।

নারিকেল তেলে কোনও কোলেস্টেরল থাকে না, ফাইবার থাকে না কেবলমাত্র ভিটামিন এবং খনিজ। নারিকেলের তেল ইংরেজিতে coconut oil অথবা copra oil.

নারিকেল তেলের স্বাস্থ্য উপকারিতার দিক বিবেচনা করলে এটা আমাদের খাদ্য তালিকায় রাখা উচিত। কিন্তু এটি অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করা যাবে না। কারণ নারিকেল তেলের ৯৯% ফ্যাট। তাই পরিমাণ মতো খেতে হবে। ১০০ গ্রাম নারিকেল তেল থেকে ৮৯০ ক্যালোরি পাওয়া যায় এবং মোট ফ্যাটের ৮২% স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ৬% মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং ২% পলিস‍্যাচুরেটেড ফ্যাট, ভিটামিন “ই” ২০% এবং ভিটামিন “কে” ১%

নারিকেলের তেল কিভাবে তৈরি করে?

নারিকেল যখন গজ হয়ে যায় অর্থাৎ পুকরা হয় তখন নারিকেল ভেঙে ফালি করে কেটে তারপর ভালো করে রোদে শুকিয়ে নিতে হয়। রোদে শুকাতে শুকাতে এক সময়ে নারিকেলের ফালি গুলো লাল হয়ে যাবে। তখন এই ফালি গুলো থেকে তেল তৈরি করার জন্য প্রস্তুত। তখন এগুলো মেশিনে দিয়ে নারিকেলের তেল তৈরী করা হয়।

নারিকেল তেলের উপকারিতা

একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, ৭২% আমেরিকান নারিকেল তেলকে “স্বাস্থ্যকর” হিসাবে চিহ্নিত করেছেন, যদিও পুষ্টি বিশেষজ্ঞের মাত্র ৩৭% জন বিশেষজ্ঞ এতে সম্মত হয়েছেন। নিচে নারিকেল তেলের উপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো –

হার্টের স্বাস্থ্যর জন্য ভালো:

নারিকেল তেলে ৫০% লৌরিক অ্যাসিড রয়েছে, যা কোলেস্টেরলের মাত্রা ঠিক রাখতে সাহায্য করে এবং উচ্চ রক্তচাপ স্বাভাবিক করে। এটা খারাপ কলেস্টেরল বৃদ্ধি করে না, এবং ধমনীতে প্রদাহ হ্রাস করে। ফলে হার্টের স্বাস্থ্য ভালো থাকে।

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রভাব রয়েছে:

লরিক অ্যাসিড নারিকেল তেলে প্রায় ৫০% ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করে। যখন আমাদের দেহ লৌরিক অ্যাসিড হজম করে তখন এটি মনোলাউরিন নামক একটি উপাদান তৈরি করে। লরিক অ্যাসিড এবং মনোলাউরিন ক্ষতিকারক রোগজীবাণু যেমন ব্যাকটিরিয়া, ভাইরাস এবং ছত্রাক মারতে পারে।

স্বাস্থ্যকর ফ্যাটি অ্যাসিডযুক্ত:

নারিকেল তেলে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকে। নারিকেল তেলের ফ্যাটি অ্যাসিড (স্যাচুরেটেড ফ্যাট) আমাদের দেহকে ফ্যাট বার্ন করতে সাহায্য করে এবং শরীর ও মস্তিষ্কে দ্রুত শক্তি সরবরাহ করে। এই স্বাস্থ্যকর ফ্যাটি অ্যাসিড রক্তে HDL (ভাল) কোলেস্টেরল বৃদ্ধি করে যা হার্টের রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে সহায়তা করে।

ওজন কমায়:

নারিকেল তেলে MCT রয়েছে। এই MCT এর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এটি ক্ষুধা কমাতে পারে। একটি সমীক্ষায়, ৬ জন সুস্থ্য পুরুষ বিভিন্ন পরিমাণে MCT এবং LCT গ্রহণ করে ছিলেন। এর মধ্যে যেসব লোকেরা সবথেকে বেশি MCT গ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্য ক্যালোরি গ্রহনের প্রবণতা ও কম ছিল। যদি দীর্ঘসময় ধরে ক্যালোরি গ্রহনের প্রবণতা কম থাকে তবে তা শরীরের ওজন হ্রাস করতে সাহায্য করে।

HDL(ভালো) কোলেস্টেরল বাড়িয়ে তুলতে পারে:

নারিকেল তেলে প্রাকৃতিক স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে যা আমাদের দেহে HDL(ভালো) কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি করতে পারে। ৪০ জন মহিলার এক গবেষণায়, নারিকেল তেল LDL (খারাপ) কোলেস্টেরল হ্রাস পাই এবং HDL বৃদ্ধি পায়।

শুষ্ক ত্বকের জন্য ভালো:

নারিকেল তেলে রয়েছে লাউরিক অ্যাসিড, যা ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে৷ কারণ এই ফ্যাটি অ্যাসিড এবং আদ্রতা মিশে যা তৈরি হয়, তা মুখের শুষ্ক ত্বকের জন্য খুবই উপকারী৷ তাই এটি বলিরেখা দূর করতে সাহায্য করে৷ এ কথা জানান জার্মান ত্বক বিশেষজ্ঞ ডা. হান্স-গিয়র্গ ডাওয়ার৷

চুলের বৃদ্ধি ঘটায়:

চুলের বৃদ্ধি জন্য প্রয়োজনীয় সব পুষ্টিই রয়েছে নারিকেল তেলে। লৌরিক অ্যাসিড চুলের প্রোটিন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এছাড়াও, চুলের গোড়া মজবুত করে ভাঙ্গন রোধ করে। মাথায় খুসকি হলে বা মাথার ত্বক চুলকালে এক চা চামচ নারিকেল তেল কিছুক্ষণ ভালোভাবে ঘষে ১০ মিনিট রেখে চুল ধুয়ে ফেলুল৷ এতে চুলকানো কমবে, দূর হবে খুসকিও৷

আলঝাইমার রোগে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধি:

স্মৃতিভ্রংশতার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হল আলঝেইমার রোগ। এটি সাধারণত বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। আলঝেইমার রোগ আমাদের মস্তিষ্কের শক্তির জন্য গ্লুকোজ ব্যবহারের ক্ষমতা হ্রাস করে। গবেষকরা পরামর্শ দিয়েছেন যে, নারিকেলের তেলে থাকা কেটোন (ketones) অ্যালঝাইমার রোগের লক্ষণগুলি হ্রাস করতে পারে।

ক্ষতিকারক পেটের মেদ কমাতে :

নারিকেল তেলে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিড ক্ষুধা হ্রাস করতে এবং চর্বি কমাতে সাহায্য করে। এতে ওজন হ্রাস পাই। LCTs তুলনায় MCTs পেটের চর্বি হ্রাস করতে বিশেষভাবে কার্যকর। পেটের স্থূলতাজনিত ৪০ জন মহিলার মধ্যে ১২-সপ্তাহের গবেষণায়, যারা প্রতিদিন ২ টেবিল চামচ নারিকেল তেল খান তাদের কোমরের পরিধি উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পেয়েছিল। এছাড়া স্থূলতায় আক্রান্ত ২০ জন পুরুষ নিয়ে চার সপ্তাহের গবেষণায়, প্রতিদিন ২ টেবিল চামচ নারিকেল তেল গ্রহণের পরে কোমরের পরিধি কমেছিল।

ঠোঁটের যত্নে:

শীত হোক বা গরম, অনেকেই সারা বছর ঠোঁট ফেটে যাওয়া। তাদের জন্য নারিকেল তেল একটি সুন্দর সমাধান হতে পারে, কারণ এটি ঠোঁটকে হাইড্রেট করবে এবং সেই সাথে ময়েশ্চারাইজড করে তুলবে এক নিমেষেই। প্রতিদিন ঘুমাতে যাওয়ার আগে এক-দুই ফোঁটা নারিকেল তেল ঠোঁটে অ্যাপ্লাই করে ঘুমিয়ে পরুন।

ছোটখাটো জ্বালাপোড়া:

হঠাৎ করে হাত পুড়ে গেলে সেখানে একটু নারিকেল তেল লাগিয়ে রাখুন। কিছুক্ষণ পর পর পুড়ে যাওয়া স্থানে নারিকেল তেল ব্যবহার করুন। দেখবেন জ্বালাপোড়া অনেকটা কমে গেছে।

সতর্কতা:

আপনি যদি জটিল কোনো রোগে আক্রান্ত হন বা অন্য কোনো কারণে রেগুলার কোনো মেডিকেল কোর্স-এর মধ্য দিয়ে যান তাহলে অবশ্যই খাওয়ার আগে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন।

সূত্র:

  • https://nyaspubs.onlinelibrary.wiley.com/doi/full/10.1111/nyas.12999
  • https://www.scientificamerican.com/article/is-coconut-oil-good-for-brain-health/
  • https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%B2_%E0%A6%A4%E0%A7%87%E0%A6%B2
  • https://www.hsph.harvard.edu/nutritionsource/food-features/coconut-oil/
Share