জন্ডিস কি? জন্ডিস নিরাময়ে কি কি খাবার খাবেন।

জন্ডিস কি বা শরীরের হলুদভাব বলতে কি বোঝায়?

কারো জন্ডিস হয়েছে তার মানে কি? তার মানে হলো তার শরীরে অর্থাৎ রক্তে বিলিরুবিনের পরিমান বেড়ে গেছে। এই বিলিরুবিনের কারণে চোখের সাদা অংশ, ত্বক হলুদ হয়ে যায়। বইয়ের ভাষায়- একটি উচ্চ স্তরের বিলিরুবিন, একটি হলুদ-কমলা পিত্ত রঞ্জকের পরিমান বেড়ে যায় শরীরে। জন্ডিস এমন একটি অবস্থা যেখানে ত্বক, চোখের সাদা অংশ এবং শ্লেষ্মা ঝিল্লি হলুদ হয়ে যায়। জন্ডিস সাধারণত হেপাটাইটিস, পিত্তথলির পাথর এবং টিউমার সহ অনেকগুলি কারণে হয়ে থাকে।

পানিবাহিত রোগের মধ্যে জন্ডিস অন্যতম। পানিবাহিত সাধারণ জন্ডিস বিশ্রাম নিলে ও বুঝে-শুনে খাওয়া-দাওয়া করলে আস্তে আস্তে এমনিতেই সেরে যায়। বি ও সি -ভাইরাস জনিত জন্ডিস খুবই মারাত্মক। এর কারণে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এর টিকা এখন খুবই সহজলভ্য। টিকা দেয়া না থাকলে শরীরে রক্ত নেয়া, অন্যের ব্যবহৃত ব্লেড, ক্ষুর দিয়ে শেভ করা-এসব কাজে খুবই সাবধান থাকবেন। পুষ্টিকর খাবারের মধ্যে জন্ডিসের প্রধান চিকিৎসা লুকিয়ে রয়েছে।

জন্ডিস আসলে কোনো রোগ নয়। এটা রোগের বহিঃপ্রকাশ বা লক্ষণ মাত্র। এখানে সেখানে খাবার পানি খাবেন না। রাস্তার পাশে খোলা দোকানদারদের কাছ থেকে কেটে রাখা ফল খাবেন না।

জন্ডিস হলে হলুদ খাওয়া যাবে না। এটা কি ঠিক?

এটা মোটেও ঠিক নয়। এটা একটা ভুল ধারণা। হলুদ রঞ্জক বিলিরুবিনের কারণে শরীরে হলুদভাব দেখা দেয়। জন্ডিস হলে তেল, মশলা কম খাওয়া ভালো। আপনি অতিরিক্ত তেল, মশলা দিয়ে মাছ ভুনা করে খেলেন। এমন কাজ মোটেও করবেন না। এর পরিবর্তে আপনি পেঁপে, লাউ বা অন্যান্য সবজি দিয়ে অল্প তেল মসলায় জ্যান্ত মাছের পাতলা ঝোল খান।

জন্ডিস কেন হয়?

আমাদের রক্তের লোহিত রক্তকণিকাগুলি স্বাভাবিক নিয়মে ভেঙে যায়। ভেঙ্গে গিয়ে বিলুরুবিন তৈরি করে। এই বিলুরুবিন লিভারে প্রক্রিয়াজাত হয়ে পিত্তরসের সাথে পিত্তনালীর মাধ্যমে পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করে। অন্ত্র থেকে বিলুরুবিন পায়খানার মাধ্যমে শরীর থেকে বের হয়ে যায়। বিলুরুবিনের এই দীর্ঘপথ পরিক্রমায় যেকোনো সমস্যা দেখা দিলে রক্তে বিলুরুবিনের মাত্রা বেড়ে যায়। একেই জন্ডিস বলে বা এই কারণে জন্ডিস হয়।

বিভিন্ন কারণে জন্ডিস হতে পারে। মূলত যে বিষয়টা বেশি সমস্যা করে বা যে বিষয়টা বেশি মারাত্মক সেটা হলো লিভার হেপাটাইটিস।

অবস্ট্রাকটিভ (Obstructive) জন্ডিস: যদি পিত্তনালী দিয়ে পিত্তরস ঠিকমত প্রবাহিত হতে না পারে তাহলে এটি রক্তে জমা হতে থাকে এবং সে কারণেও জন্ডিস হতে পারে।এছাড়া মদ্যপান, ঔষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, থ্যালাসেমিয়া, লিভার ক্যান্সার ইত্যাদি কারণে জন্ডিস হতে পারে। লিভার থেকে নিঃসৃত তরল পিত্তথলিতে পিত্তরস হিসাবে জমা হয়। বিলিরুবিন হল লাল রক্ত কোষের স্বাভাবিক ভাঙ্গনের সময় তৈরি একটি লালচে হলুদ রঙ্গক।

জন্ডিস-এর লক্ষণসমূহ:

১. পেটে মৃদু ব্যাথা।
২. চোঁখের হলুদ ভাব।
৩. মুখে অরুচি, বমি হতে পারে।
৪. ফ্যাকাসে পায়খানা।
৫.কম মাত্রার জ্বর।

জন্ডিস-এর মাত্রা অর্থাৎ রক্তে বিলুরুবিনের মাত্রা:

জন্ডিস-এর সাধারণ মাত্রা- 0.2 – 1.2 মিলিগ্রাম / ডিএল থেকে শুরু করে।
কিউবিক/মোল- এ যদি হিসাব করা হয় তাহলে ৩ cu/mol- ২৫ cu/mol এ থাকে।

হেপাটাইটিস ভাইরাস কয়েক ধরণের হয়ে থাকে:

A ও E – খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়। stool বা মলের মাধমেও ছড়াতে পারে।
B ও C – Blood (রক্তের)- মাধ্যমে ছড়ায়।

জন্ডিস হলে কোন কোন খাবার খাওয়া ভালো আর কি কি খাওয়া যাবে না :

জন্ডিস হলে যেহেতু মুখে অরুচি লাগে। পেটে হয়তো একটু ব্যাথা করছে। অনেকে খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেয়। ভয় পাবেন না। কেউ বলবে এটা খাও, কেউ বলবে ওটা খাও। গ্লুকোজ খাও শক্তি পাবে। আরে ভাই আপনি রসোগোল্লাই খান। এতেও শক্তি পাবেন। টক দই খান। ডিম খান। মুরগির মাংস খান পাতলা ঝোল করে। ভিটামিন ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের পাতা কিনে ঘর ভরবেন না। এর পরিবর্তে প্রচুর সবুজ-শাকসবজি ও ফলমূল খান। তাহলে ভিটামিন ও ফাইবার (আঁশ) দুটোর চাহিদাই পূরণ হবে। দুর্বল হলে চলবে না। বার বার পানি খেতে ইচ্ছা না করলে একটু লেবুর রস বা তুলসী পাতা মিশিয়ে নিন। তাহলে খেতে ভালো লাগবে। সহজপাচ্য অর্থাৎ যেসব খাবার সহজে হজম হয় সেইসব খাবার খেতে হবে। যেসব খাবার হজম করতে কষ্ট হয় সেইসব খাবার খাওয়া যাবে না। জন্ডিস হলে সেইসব খাবার খেতে হবে যেসব খাবার লিভারের কার্যক্ষমতা বাড়ায়। যেমনঃ

১. আখের রস
২. টমেটো, গাঁজর
৩. আমলকি
৪. বেদানা
৫. টক দই
৬. বাদাম
৭. লেবু
৮. পেঁপে

জন্ডিস হলে যা খাওয়া ক্ষতিকর:

১. মদ্যপান, নেশাজাতীয় অন্য কোনো দ্রব্য।
২. চা, কফি।
৩. যে কোনো প্রকারের কোমল পানীয়।
৪. বাইরের খোলা খাবার, বেকারী, রেস্টুরেন্টের খাবার।
৫. ক্যান, প্লাষ্টিক ও অন্যান্য বোতলজাত খাবার।
৬. Refined লবণ, চিনিসহ অন্যান্য খাবার।
৭. Processed ফুড।

জন্ডিসের চিকিৎসা:

জন্ডিসের একমাত্র চিকিৎসা হলো রেস্ট। তরল খেতে হবে তার মানে এই নয় যে, প্রচুর পরিমানে পানি খেতে হবে। নির্দিষ্ট পরিমানে (একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে দৈনিক ৩-৪ লিটার) খেতে হবে। জন্ডিস কোনো রোগ নয়। তাই এর কোনো ঔষুধ নাই। তবে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন।

Share