ছোলা ক্ষুধা কমায়, ওজন হ্রাস করে, হজমের জন্য ভালো ও রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রাখে।

রাতে ভিজিয়ে রেখে সকালে ওঠে কাঁচা ছোলা খাওয়ার অভ্যাস অনেকেরই আছে। স্বাস্থ্যকর ও উপকারী খাবার হিসাবে ছোলার বেশ পরিচিতি রয়েছে। এটা মুখরোচকও বটে। ছোলা শক্তি যোগায় এবং অনেক সময় ধরে পেটে ভরিয়ে রাখে। তবে অঙ্কুরিত ছোলা আরও বেশি উপকারী। সাধারণত দুই প্রকারের ছোলা পাওয়া যায়: দেশী ছোলা ও কাবুলী ছোলা। দেশী ছোলা আকারে ছোট এবং অপেক্ষাকৃত শক্ত। কাবুলী ছোলা আকারে একটু বড়, রং উজ্জ্বল এবং দেশী ছোলার চেয়ে নরম।

ছোলা অত্যন্ত পুষ্টিকর ও আমিষের উৎস। ছোলায় আমিষের পরিমাণ মাংস বা মাছের আমিষের পরিমাণের প্রায় সমান। ছোলার খোসা ছাড়িয়ে ছোলার ডাল তৈরি করা হয়। বিভিন্ন ভাবে ছোলা খাওয়া যায় যেমন তরকারিতে ছোলা, ছোলা ভাজি, খিচুড়িতে ছোলা, ছোলার বেসন, ছোলা রান্না ইত্যাদি। যে কোনো মেলার জনপ্রিয় খাবার হিসাবে দেখা যায় ছোলা। ছোলার শর্করা বা কার্বোহাইডেটের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স অনেক কম। খাওয়ার পর খুব তাড়াতাড়িই হজম হয়ে গ্লুকোজ হয়ে রক্তে চলে যায় না। এটি হজম হতে বেশ সময় নেয়। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ছোলা ভালো। হজম উন্নতি, ওজন ঠিক রাখতে এবং বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে সহায়তা করে ছোলা। ছোলাতে প্রোটিন বা আমিষ বেশি তাই এটি নিরামিষ ভোজীদের খাবারে মাংসের চাহিদা পূরণ করতে পারে।

ইংরেজীতে Bengal gram, Chickpea। ছোলায় বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন, খনিজ, ম্যাগনেশিয়াম ও ফসফরাস রয়েছে। কাঁচা ছোলা ভিজিয়ে খোসা ছাড়িয়ে, কাঁচা আদার সঙ্গে খেলে শরীরে একই সঙ্গে আমিষ ও অ্যান্টিবায়োটিকের কাজ করবে। এছাড়া আয়ুর্বেদেও ছোলার উপকারীতা সম্পর্কে বলা আছে।

ছোলার পুষ্টি উপাদান

এটিতে আকর্ষণীয় পুষ্টি প্রোফাইল রয়েছে। ২৮-গ্রাম ছোলাতে ৪৬ ক্যালরি থাকে। এই ক্যালোরির প্রায় ৬৭% কার্বহাইড্রেট থেকে আসে, বাকিটুকু প্রোটিন এবং অল্প পরিমাণ ফ্যাট থেকে আসে। ছোলাতে বিভিন্ন ধরণের পুষ্টি উপাদান রয়েছে। নিচে সেগুলো দেওয়া হলো –

  • ক্যালোরি: ৪৬
  • কার্বস: ৮ গ্রাম
  • ফাইবার: ২ গ্রাম
  • প্রোটিন: ৩ গ্রাম
  • ফোলেট: ১২% (RDI)
  • আয়রন: ৪% (RDI)
  • ফসফরাস: ৫% (RDI)
  • জিঙ্ক: ৫% (RDI)
  • ম্যাঙ্গানিজ: ১৪% (RDI)

ছোলার উপকারীতা

প্রতিদিন সকালে খালি পেটে ছোলা খাওয়ার অভ্যাস স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ভালো। নিচে ছোলার উপকারীতা দেওয়া হলো –

ওজন ঠিক রাখতে সহায়তা করে:

ছোলাতে বেশ কয়েকটি উপাদান রয়েছে যা ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। প্রথমত, এতে ক্যালোরি কম। এর অর্থ ছোলাতে যে পরিমাণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে তার তুলনায় কম ক্যালোরি সরবরাহ করে। যারা প্রচুর পরিমাণে উচ্চ-ক্যালোরিযুক্ত খাবার খাই তাদের তুলনায় যারা কম ক্যালোরিযুক্ত খাবার খাই তাদের ওজন হ্রাস পাই। ছোলাতে থাকা প্রোটিন এবং ফাইবার খাবারের ক্যালোরি গ্রহণ কমাতে সহায়তা করে, ফলে ওজন ঠিক থাকে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ছোলা খেয়েছেন তাদের স্থূলত্ব হওয়ার সম্ভাবনা ৫৩% কম ছিল।

ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে:

প্রোটিন এবং ফাইবারের উৎস ছোলা ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। প্রোটিন এবং ফাইবার একত্রে হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়, যা পেট ভরিয়ে রাখতে সহায়তা করে। এছাড়া প্রোটিন শরীরে ক্ষুধা হ্রাস করার হরমোনগুলির মাত্রা বাড়িয়ে তুলতে পারে। একটি সমীক্ষায় ১২ জন মহিলার মধ্যে ক্ষুধা এবং ক্যালোরি গ্রহণের তুলনা করা হয়েছে। সমীক্ষাটিতে দেখা গেছে, একজন খাবারের আগে এক কাপ (২০০গ্রাম) ছোলা খেয়েছিল এবং অন্যজন দুই টুকরো সাদা রুটি খেয়েছিল। যে সাদা রুটি খেয়েছিল তার তুলনায় যে ছোলা খেয়েছিল তার ক্ষুধা কম ছিল ও ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণও কম ছিল।

রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রাখে:

প্রথমত, ছোলাতে গ্লাইসেমিক সূচক কম রয়েছে। গ্লাইসেমিক ইনডেক্স হলো খাবার খাওয়ার পরে রক্তের শর্করার পরিমাণ কত দ্রুত বেড়ে যায় তা নির্ণয়কারী। অনেক নিম্ন-গ্লাইসেমিক ইনডিক্সযুক্ত খাবার রক্তের শর্করার পরিমাণ ঠিক রাখতে পারে। দ্বিতীয়ত, ছোলাতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার এবং প্রোটিন রয়েছে। রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণে উভয়ই ভূমিকা রাখে। কারণ ফাইবার কার্ব (শর্করা) শোষণকে ধীর করে দেয় যা রক্তের শর্করার মাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করে। প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া টাইপ-2 ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রাখতে সহায়তা করে। ১৯ জনের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা ২০০ গ্রাম ছোলা খেয়েছে তাদের মধ্যে রক্তে শর্করার মাত্রা ২১% হ্রাস পেয়ে ছিল।

হজমের জন্য ভালো:

বেশ কয়েকটি প্রমাণ রয়েছে যে, ছোলা হজম স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। ছোলাতে থাকা ফাইবার বেশিরভাগ দ্রবণীয়, যার অর্থ এটি পানিতে মিশ্রিত হয় এবং হজমের সময় জেল জাতীয় পদার্থ তৈরি করে। দ্রবণীয় ফাইবার অন্ত্রে স্বাস্থ্যকর ব্যাকটিরিয়া সংখ্যা বাড়াতে এবং অস্বাস্থ্যকর ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি রোধ করতে পারে। এটি হজম সমস্যার ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে, যেমন অন্ত্র সিন্ড্রোম এবং কোলন ক্যান্সার। ৪২ জন ব্যক্তির একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, যাঁরা ১২ সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ১০৪ গ্রাম ছোলা খেয়েছিলেন তাদের হজম প্রক্রিয়ার উল্লেখযোগ্য ভাবে ভালো হয়েছিল।

হার্টের জন্য ভালো:

ছোলা ম্যাগনেসিয়াম এবং পটাসিয়ামের একটি দুর্দান্ত উৎস। এটি উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে। ছোলাতে যে দ্রবণীয় ফাইবার আছে তা ট্রাইগ্লিসারাইড এবং “খারাপ” কোলেস্টেরলের (LDL) এর মাত্রা হ্রাস করতে সহায়তা করে। ৪৫ জন লোকের ১২ সপ্তাহের সমীক্ষায়, যারা প্রতি সপ্তাহে ৭২৮ গ্রাম ছোলা খেয়েছেন তাদের মোট কোলেস্টেরলের মাত্রা প্রায় ১৬ mg/dL হ্রাস পেয়েছে।

খুবই স্বাস্থ্যকর একটি খাবার ছোলা। এতে ভিটামিন, খনিজ, ফাইবার এবং প্রোটিন বেশি থাকে। ওজন হ্রাস থেকে শুরু করে রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ছোলা খুবই কার্যকরী। নিয়মিত ডায়েটে ছোলা অন্তর্ভুক্ত করা আমাদের সু-স্বাস্থ্যের জন্য সহায়তা করে এবং হার্টের রোগ এবং ক্যান্সারের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে।

সতর্কতা:

আপনি যদি জটিল কোনো রোগে আক্রান্ত হন বা অন্য কোনো কারণে রেগুলার কোনো মেডিকেল কোর্স-এর মধ্য দিয়ে যান তাহলে অবশ্যই খাওয়ার আগে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন।

সূত্রঃ হেলথলাইন

Share