সুজি রক্ত স্বল্পতা দূর করে, শক্তি বৃদ্ধি করে ও হার্টের রোগের ঝুঁকি কমায়।

সুজি আমরা প্রায়ই খাই কিন্তু এর পুষ্টি উপাদান বা স্বাস্থ্য উপকারীতা সম্পর্কে আমরা কখনও চিন্তা করেছি কি? সুজি খুবই স্বাস্থ্যকর একটি খাবার। সুজি শব্দটি ইতালীয় সেমোলা শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ হল ‘তুষ’। সুজি হল গম থেকে তৈরি একপ্রকার প্রক্রিয়াজাত খাদ্য। গম ছাড়াও চাল এবং ভুট্টা থেকেও সুজি তৈরি করা হয়।

ধোসা ও উপমা দক্ষিণ ভারতীয়দের দুটি প্রধান প্রিয় খাবার যা সুজি দিয়ে তৈরি হয়। এছাড়া সুজির হালুয়া, সুজি কেশরী বা শিরা অত্যন্ত বিখ্যাত। সুজি বাচ্চাদের জন্যও অনেক উপকারী। যেসব বাচ্চারা ছোট বেলা থেকে মায়ের বুকের দুধ পায় না সেইসব বাচ্চাদের সুজি খাওয়ানো হয়। এছাড়া ডাক্তারও মায়ের বুকের দুধের পাশাপাশি সুজি খাওয়ানোর পরামর্শ দেন।

ইংরেজিতে সুজি Semolina নামে পরিচিত। সুজি হালকা করে ভেজে তারপর আলাদা করে আর একটি পাত্রে পরিমাণ মতো দুধ নিয়ে তারমধ্যে তেজপাতা, এলাচ, সামান্য দারুচিনি, কিসমিস পরিমান মতো চিনি দিয়ে ভালো করে জ্বাল দিয়ে। তারমধ্যে ভাজা সুজি আস্তে আস্তে অল্প অল্প করে ঢেলে দিন। একটু ফুটে উঠলেই চুলা বন্ধ করে ভালো করে ঢেকে রেখে দিন ৫ মিনিটের জন্য। ৫ মিনিট পর পরিবেশন করুন লুচির সাথে। পুরা জমে যাবে।

সুজি পুষ্টি উপাদান

এটি থায়ামিন এবং ফোলেট জাতীয় ভিটামিন “বি” রয়েছে, যা খাদ্যকে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে সহায়তা করে দেহে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুজিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। নিচে এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পুষ্টি উপাদান দেওয়া হলো –

  • ক্যালোরি: ১৯৮ ক্যালোরি
  • কার্বহাইড্রেট: ৪০ গ্রাম
  • প্রোটিন: ৭ গ্রাম
  • ফ্যাট: ১ গ্রাম
  • ফাইবার: ৭% (RDI)
  • থায়ামাইন: ৪১% (RDI)
  • ফোলেট: ৩৬% (RDI)
  • রিবোফ্লাভিন:২৯% (RDI)
  • আয়রন: ১৩% (RDI)
  • ম্যাগনেসিয়াম: ৮% (RDI)

সুজির উপকারীতা

সুজি আয়রন এবং ম্যাগনেসিয়ামের একটি ভাল উৎস। এই খনিজ উপাদান লাল রক্ত ​​কোষ উৎপাদনে, হার্টের স্বাস্থ্য এবং রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে-

রক্ত স্বল্পতা দূর করতে সাহায্য করে:

আয়রন একটি প্রয়োজনীয় খনিজ যা দেহের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আয়রন রক্তের ​​মাধ্যমে অক্সিজেন পরিবহন, ডিএনএ সংশ্লেষণ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন না থাকলে দেহ পর্যাপ্ত পরিমাণে লাল রক্তকণিকা তৈরি করতে পারে না। ফলে দেখা দেয় রক্ত স্বল্পতা। সুজিতে ১৩% আয়রন আছে তাই এটি আমাদের রক্ত সল্পতা দূর করতে সাহায্য করে।

কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময়ে:

ফাইবারের অনেক স্বাস্থ্য উপকারীতা রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো হজম শক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে। সুজিতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার রয়েছে যা আমাদের পাচনতন্ত্রের জন্য অনেক উপকারী। এটি অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি করে।

পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাইবার গ্রহণ নিয়মিত অন্ত্রের গতিবিধি ঠিক রাখতে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময়ে সহায়তা করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, দুই সপ্তাহের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যে লোকেরা প্রতিদিন ৫ গ্রাম ফাইবার সমৃদ্ধ সুজি খেয়েছে তাদের কোষ্ঠকাঠিন্যের উন্নতি ঘটে।

ওজন হ্রাস করতে পারে:

ওজন কমাতে পারে এমন বেশ কয়েকটি পুষ্টি উপাদান রয়েছে সুজিতে। গবেষণায় দেখা গেছে ফাইবার সমৃদ্ধ ডায়েট ওজন হ্রাস করতে সাহায্য করে। সুজিতে প্রচুর পরিমাণের ফাইবার আছে যা ক্ষুধার অনুভূতি হ্রাস করতে এবং ভবিষ্যতের ওজন বৃদ্ধি রোধ করতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, ২৫২ জন মহিলাদের মধ্যে একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, প্রতিদিন খাদ্য তালিকায় ১ গ্রাম করে ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার বৃদ্ধি করার ফলে ২০ মাসের মধ্যে ০.২৫ কেজি ওজন হ্রাস পায়। এছাড়া এতে থাকা প্রোটিনও ওজন হ্রাস করতে পারে।

এনার্জি বৃদ্ধি করে:

স্বাস্থ্যকর কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ হওয়ায় সুজি দেহের শক্তি ও এনার্জি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। যে কোন সময় শরীরের শক্তি যোগাতে সুজি খেতে পারেন। সুজি খাবার পরপরই আপনার কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

হার্টের জন্য ভালো:

হার্টের রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে ফাইবার সমৃদ্ধ খাবারের কোনো বিকল্প নাই। ৩১ টি সমীক্ষার পর্যালোচনাতে দেখা গেছে যে, যারা অল্প পরিমাণে ফাইবার গ্রহণ করে তাদের তুলনায় যারা পরিমাণে বেশি ফাইবার গ্রহণ করেন তাদের মধ্যে হার্টের অসুখের ঝুঁকি ২৪% পর্যন্ত কম থাকে।

ফাইবার LDL (খারাপ) কোলেস্টেরল, রক্তচাপ এবং প্রদাহ কমিয়ে হার্টের রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া সুজিতে ফোলেট এবং ম্যাগনেসিয়াম থাকে। প্রতিদিন ১০০ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ ডায়েট হার্ট ফেইলওর ঝুঁকি ২২% এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি ৭% হ্রাস করে।

রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণের উন্নতি করতে পারে:

উচ্চ মাত্রার ম্যাগনেসিয়াম এবং ডায়েটারি ফাইবারের কারণে সুজি রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণে উন্নতি করতে পারে। রক্তের শর্করার মাত্রা ঠিক থাকলে টাইপ-2 ডায়াবেটিস এবং হার্টের রোগের ঝুঁকি হ্রাস পাই।

ম্যাগনেসিয়াম আমাদের দেহে কোষের ইনসুলিনের প্রতিক্রিয়া বাড়িয়ে রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করতে সুজি আপনার রক্ত ​​প্রবাহে শর্করার শোষণকে ধীর করে দেয় এবং খাবার খাওয়ার পরে রক্তে শর্করার স্পাইক নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

সতর্কতা:

অনেকে সুজি রান্না করার আগে সুজি তেলে ভেজে নেয়। তেলে না ভেজে শুধু প্যান বা কড়াইতে ভেজে রান্না করতে পারেন। কারণ অতিরিক্ত তেল আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না। এছাড়া আপনি যদি জটিল কোনো রোগে আক্রান্ত হন বা অন্য কোনো কারণে রেগুলার কোনো মেডিকেল কোর্স-এর মধ্য দিয়ে যান তাহলে অবশ্যই খাওয়ার আগে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন।

Share