নিয়মিত রসুন খেলে হার্ট এটাক ও ব্লাড প্রেসার যাবে চলে।

সালফার ! সালফার ! সালফার ? হ্যা বন্ধুরা, আনারসে যেমন আছে দুর্লভ ব্রোমেলিন এনজাইম, টমেটোতে লাইকোপেন তেমনি রসুনে রয়েছে বিরল ও দামী-সালফার। এই “সালফার” রসুনকে ঔষধি ক্ষমতা প্রদান করেছে। এই রসুনে যে কয়টি যৌগ পাওয়া যায় তাদের মধ্যে এলিসিন অন্যতম। অধিক সালফার সমৃদ্ধ এই এলিসিন রসুনের প্রধান অস্ত্র।

প্রায় সকল রান্নাঘরেই পাওয়া যাবে “রসুন” নামক মসলাটি বা হার্ব (herb) টি। গোটা পৃথিবীজুড়ে রাঁধুনিদের পছন্দের এই মসলাটি রান্নাঘরের একটি সাধারণ উপাদান। রসুন একটি অলৌকিক হার্ব (herb) যেটি প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার জন্য ঔষধ হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। রসুনে বিভিন্ন ধরণের সালফারযুক্ত মিশ্রণ রয়েছে যা এর তীব্র বৈশিষ্ট্যযুক্ত গন্ধের কারণ। তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যৌগ হল অ্যালিসিন যেটি দুর্দান্ত অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টি-ভাইরাল, অ্যান্টি-ফাঙ্গাল এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসাবে পরিচিত।

অ্যালিসিনের সুবিধাগুলি সর্বোত্তমভাবে পেতে হলে আপনাকে রসুন কুঁচি কুঁচি বা পিষে ভর্তা করে খেতে হবে। রসুন সেলেনিয়ামেরও একটি নির্ভরযোগ্য উৎস। অ্যালিসিন এবং অন্যান্য যৌগগুলি যেমন এজোয়েন এবং অ্যালিন আমাদের দেহের রক্তচলাচল, হজম এবং ইমিউনোলজিক সিস্টেমগুলিতে প্রভাব ফেলে এবং রক্তচাপ হ্রাস করে।

রসুন হলো একটি হার্ব (herb) অর্থাৎ ঔষধি বনজ লতা যেটা বর্তমানে সমগ্র বিশ্বজুড়ে চাষ করা হয়। পেঁয়াজ, লিকস এর সাথে রসুনের মিল রয়েছে অর্থাৎ আপন ভাই বোনের মতো। এর বৈজ্ঞানিক নাম – Allium Sativum এবং ইংরেজি নাম Garlic। মাছ, মাংসের হাজারো মজাদার আইটেম থেকে শুরু করে মজাদার বিরিয়ানি,পোলাও, সূপ- রসুন ছাড়া ভাবাই যায় না।এছাড়া মজাদার রসুনের আঁচার আমরা ভর্তা ভাজির সাথে খেয়ে থাকি।

এছাড়া রসুন ভিটামিন ও নিউট্রিয়েন্ট-এ ভরপুর যেমন- B১,B২, B৩, B৬, folate এন্ড ভিটামিন “সি”, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম, কপার, সেলেনিয়াম ইত্যাদি।

কাঁচা অথবা অল্প একটু ভেঁজে রসুন খাওয়া ভালো। রসুন বেটে মিহি করে, তেলে কষিয়ে, এরপর অধিক তাপে কড়াইতে বা প্রেসার কুকারে রান্না করে খেলে এর উপকারিতা অনেকটাই কমে যায়- অথচ আমরা এটাতেই অভ্যস্থ। রসুনের কোঁয়ার খোসা ছাড়িয়ে একটু থেঁতো করে বা আস্ত কোঁয়া লেবুর রসে এক ঘন্টা ডুবিয়ে রাখলে ঝাঁঝালো গন্ধ একেবারেই থাকে না। এতে করে আপনি দিব্যি অনায়াসেই কাঁচা রসুন খেতে পারবেন।

রসুন কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি হ্রাস করে। সেজন্য কার্ডিওভাসকুলার রোগের বিভিন্ন দিকের যেমনঃ হার্ট অ্যাটাক (মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্ট), করোনারি আর্টারি ডিজিজ (সিএডি), উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন), এবং এথেরোস্ক্লেরোসিস -উপর গবেষণা করা হয়। এতে দেখা যাই, রসুন গ্রহণের সাথে আমাদের রক্তনালীগুলির দৈহিক নমনীয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দীর্ঘস্থায়ী অতিরিক্ত প্রদাহজনিত কারণে রক্তনালীগুলির ক্ষতির সম্ভাবনা হ্রাস পেয়েছে যখন এই রসুন নিয়মিত খাওয়া হয়।

ঝাঝাঁলো গন্ধযুক্ত এই হার্বটি প্রায় ৫ হাজার বছর ধরে উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, ফুসফুস ক্যান্সার কোলন, রেক্টাল, স্টোমাক, ব্রেস্ট ও প্রস্টেট ক্যান্সার, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে ব্যবহার হয়ে আসছে।

রসুনের উপকারীতা:

রক্ত বিশুদ্ধকারক :

শরীরের বর্জ্য সবসময় কি আর পুরোপুরি পরিষ্কার হয়। আপনি হয়তো সকালে বাথরুম সেরে বেরিয়ে পড়ছেন। ভাবছেন সব ঠিক আছে। কিন্তু এদিকে ব্রণের জ্বালায় আপনি অতিষ্ট। প্রতিদিন দুই কোয়া রসুন কিছুটা গরম জলের সাথে খান এবং সারাদিন প্রচুর পানি পান করুন। ব্রণের সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন। প্রতিদিন সকালে হালকা গরম জলের সাথে লেবুর রস ও দুই কোয়া রসুন সহযোগে খাওয়ার অভ্যাস করুন। রসুন আপনার সিস্টেম পরিষ্কার করতে এবং বিষাক্ত পদার্থগুলি বের করে দিতে সহায়তা করবে। বাইরে থেকে স্বাস্থ্যকর ত্বক পেতে এবং আপনার রক্তকে ভিতরে থেকে শুদ্ধ করে ব্রণগুলির মূল কারণগুলি মোকাবেলা করার সর্বোত্তম উপায় এটি।

 কোল্ড এন্ড ফ্লু প্রতিরোধক :

ঠান্ডা এবং ফ্লু প্রায় সময় যেনো পরিবারের কারো না কারো লেগেই থাকে।এ যেনো ছাড়তে চাই না।ত্রাণকর্তা হিসাবে আপনাকে রক্ষা করতে হাজির- রসুন।আপনি রসুনকে ভালোবাসুন। তাহলে রসুনও আপনাকে ভালোবাসবে, আপনাকে ছেড়ে যাবে না। অর্থাৎ আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং ঠান্ডা ও ফ্লু সহজে আপনাকে কাবু করতে পারবে না। অনেকে রসুন চা খেয়ে থাকেন। মধু, আদা সহযোগে রসুন খেলে বন্ধ নাক খুলে যাই। ঠান্ডাজনিত সমস্যা নিরাময়ের পাশাপাশি প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

নিম্ন রক্তচাপ :

অ্যাঞ্জিওটেনসিন হল একটি প্রোটিন যা আমাদের রক্তনালীগুলিকে সংকুচিত করতে সহায়তা করে, যার ফলে রক্তচাপ বাড়িয়ে তোলে। রসুনের অ্যালিসিন এঞ্জিওটেনসিন এর ক্রিয়াকলাপকে ব্লক করে এবং রক্তচাপ হ্রাস করতে সহায়তা করে। রসুনে উপস্থিত পলিসালফাইডগুলি লোহিত রক্তকণিকা দ্বারা হাইড্রোজেন সালফাইড নামে একটি গ্যাসে রূপান্তরিত হয়। হাইড্রোজেন সালফাইড আমাদের রক্তনালীগুলি dilates করে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

 হৃদরোগ প্রতিরোধে :

রসুনের উপকারিতার কথা বলতে গেলে প্রথমে যে উপাদানটির কথা বলতে হয় সেটা হলো এলিসিন। এই “allicin”- এন্টিব্যাকটেরিয়াল, এন্টিভাইরাস, এন্টিফাংগাল এবং এন্টিঅক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করে ও শরীরকে সুস্থ্য রাখে। রসুনে বিদ্যমান সালফার একে এন্টিবায়োটিক প্রোপারটিস সরবরাহ করে থাকে।

অ্যালিসিনের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রতিদিন দৈনিক ভিত্তিতে  রসুন গ্রহণ কলেস্টেরলের মাত্রা কমতে সহায়তা করে। এটি রক্তচাপ এবং রক্ত ​​শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত উপকারী।

কোলেস্টেরল হ্রাস করুন :

রসুন আমাদের রক্তে ​​ট্রাইগ্লিসারাইড এবং মোট কোলেস্টেরলকে মাঝারিভাবে কমিয়ে ধমনী ফলকের গঠন হ্রাস করার ক্ষমতা রাখে।

 স্কিন ও চুলের জন্য :

রসুনের উদ্দীপক বৈশিষ্ট্যগুলি ত্বককে ফ্রি র‌্যাডিকালের প্রভাব থেকে রক্ষা করে এবং কোলাজেনের হ্রাসকে ধীর করে দেয় যা ত্বকে বৃদ্ধ বয়সে স্থিতিস্থাপকতা হ্রাস পায়। রসুন ছত্রাকের সংক্রমণে আক্রান্ত ত্বকে আশ্চর্যজনক ভাবে কাজ করে এবং একজিমার মতো ত্বকের অসুস্থতা থেকে মুক্তি দেয়। এটি অ্যাথলিটের পা এবং দাদরোগের মতো ছত্রাকের সংক্রমণেরও কার্যকর প্রতিকার। আমরা সবাই চুলের জন্য পেঁয়াজের বিস্ময়কর উপকারিতা সম্পর্কে জানি। কিন্তু পেঁয়াজের ভাই রসুনের বীরত্ব আমরা অনেকেই জানিনা। ত্বক ও চুলের দারুন উপকার করে থাকে রসুন।

 ক্যান্সার প্রতিরোধক :

অ্যালিয়াম শাকসবজি, বিশেষত রসুন এবং পেঁয়াজ এবং তাদের জৈব কার্যকরী সালফার যৌগগুলি ক্যান্সার গঠনের প্রতিটি পর্যায়ে প্রভাব ফেলে এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি সংশোধনকারী অনেক জৈবিক প্রক্রিয়াগুলিকে প্রভাবিত করে বলে বিশ্বাস করা হয়।

এনআইএইচ জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের ভাষায়, “বেশ কয়েকটি জনসংখ্যার গবেষণায় পেট, কোলন, খাদ্যনালী, অগ্ন্যাশয় এবং স্তনের ক্যান্সার বৃদ্ধি এবং নির্দিষ্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাসের মধ্যে একটি সংযোগ দেখা যায়।” জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট ব্যাখ্যা করেছে যে “রসুনের প্রতিরক্ষামূলক প্রভাবগুলি এর অ্যান্টিব্যাকটিরিয়াল বৈশিষ্ট্য থেকে বা ক্যান্সারজনিত পদার্থের গঠনে বাধা দেওয়ার, ক্যান্সার সৃষ্টিকারী পদার্থের সক্রিয়করণ বন্ধ করতে, ডিএনএ মেরামতকে বাড়িয়ে তুলতে, কোষের বিস্তারকে হ্রাস করতে বা প্ররোচিত করতে পারে।”

345 স্তন ক্যান্সার রোগীদের একটি ফরাসী সমীক্ষায় দেখা গেছে যে বর্ধিত রসুন, পেঁয়াজ এবং ফাইবার গ্রহণ স্তনের ক্যান্সারের ঝুঁকির পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য হ্রাসের সাথে জড়িত।রসুনকে বিশেষভাবে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করার জন্য দেখা গেছে যে অন্য ক্যান্সার হ’ল অগ্ন্যাশয় ক্যান্সার, সবচেয়ে মারাত্মক রূপগুলির একটি ক্যান্সার। সুসংবাদটি হ’ল বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এখন দেখা গেছে যে রসুন প্যানক্রিয়াটিক ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে।

সান ফ্রান্সিসকো বে এলাকায় পরিচালিত একটি জনসংখ্যা ভিত্তিক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে অল্প পরিমাণে খেয়েছে তাদের তুলনায় যে পরিমাণে রসুন এবং পেঁয়াজ বেশি পরিমাণে খেয়েছে তাদের মধ্যে অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারের ঝুঁকি 54 শতাংশ কম ছিল।

সামগ্রিকভাবে, এই মশলাটি ক্যান্সারে লড়াইকারী খাবার হিসাবে স্পষ্টভাবে কিছু বাস্তব সম্ভাবনা দেখায় যা এড়ানো বা ছাড় করা উচিত নয়।

শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার প্রতিকার :

রসুনের দৈনিক ব্যবহার শীতজনিত সমস্যা এবং ঠান্ডার তীব্রতা হ্রাস করতে পারে। এর অ্যান্টিব্যাকটিরিয়াল বৈশিষ্ট্য গলার জ্বালা নিরাময়ে সহায়তা করে।

উত্তেজনা বাড়ায় :

রসুনের এফ্রোডিসিয়াক উপাদানগুলো রক্ত ​​সঞ্চালন বাড়ায়। রক্তসঞ্চালন বাড়ানোর সাথে সাথে কামোদ্দীপনা জাগায়।

দাঁত ব্যথা কমায় :

রসুনের ২-৩টা কোয়া নিন। রসুন চূর্ণ করে আক্রান্ত দাঁতে লাগান। এটির অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যানালজেসিক বৈশিষ্ট্যের কারণে দাঁত ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে পারেন। তবে সচেতন থাকুন এটি মাড়িতে জ্বালাময় হতে পারে।

ওজন হ্রাস করুন :

অনেক গবেষক বিশ্বাস করেন যে স্থূলত্ব দীর্ঘমেয়াদী, নিম্ন-গ্রেডের প্রদাহের একটি ধরণ।সাম্প্রতিক গবেষণা অনুসারে, রসুন আমাদের দেহে ফ্যাট কোষগুলির গঠন নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করতে পারে। প্রাক-অ্যাডিপোসাইটগুলি প্রদাহজনক সিস্টেমের ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে ফ্যাট কোষগুলিতে (অ্যাডিপোকাইটস) রূপান্তরিত হয়। রসুনে পাওয়া 1, 2-টিটি (1, 2-ভিন্যালডিথিন) এর অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদানগুলো এই রূপান্তরকে বাধা দিতে সহায়তা করতে পারে। এটি ওজন বৃদ্ধি রোধ করতে সহায়তা করতে পারে।

ফাংগাল ইনফেকশনে রসুন তেল :

ফাংগাল ইনফেকশনে রসুন তেল ভালো কাজ দেয়।

 খাদ্য ও পানীয়তে সুন্দর রুচিকর গন্ধ আনায়নে :

চিপস, চানাচুরসহ রান্না করা বিভিন্ন খাবারে সুন্দর ও রুচিকর গন্ধ আনায়নে রসুনের জুড়ি মেলা ভার।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে :

রসুন ইনসুলিন নিঃসরণ বাড়ায় এবং ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে।

সতর্কতা :

১. Asthma রোগীরা রসুনের ব্যাপারে অনেক সতর্ক থাকবেন। তাদের রসুন গ্রহণ না করাই ভালো।

২. অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়। তাই ২-৩ কোয়ার বেশি দিনে গ্রহণ না  করা ভালো।

৩. সার্জারি বা অপেরেশনের আগে ব্যবহার না করাই ভালো।

৪. রসুন খেয়ে মুখে গন্ধ হলে দাঁত ব্রাশ করে বাইরে যাবেন।

 

 

Share