মানসিক চাপ আমাদের শরীরের উপর যেসব প্রভাব ফেলে।

স্ট্রেস বা মানসিক চাপ জীবনের একটি প্রাকৃতিক শারীরিক এবং মানসিক প্রতিক্রিয়া। কাজ এবং পরিবারের মতো দৈনন্দিন দায়িত্ব থেকে শুরু করে জীবনের ঘটনা যেমন কোনও নতুন রোগ নির্ণয়, প্রিয়জনের মৃত্যুর কারণে মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে।

মানুষ দিনরাত যেমন পরিশ্রম করে চলেছে তেমনি বেড়েছে কাজের ব্যাস্ততা। সামাজিক, পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বেড়েছে দুশ্চিন্তা। এই দুশ্চিন্তা ও হতাশা একজন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর খারাপ প্রভাব ফেলছে। মানসিক চাপ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে অনেকে খারাপ পথে পা বাড়াচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের ফলে বিরক্তি, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, মাথাব্যথা, অনিদ্রা ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে।

মানসিক চাপ আমাদের শরীরের উপর যেসব প্রভাব ফেলে তা নিচে আলোচনা করা হলো –

স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের হয়ে থাকে:

স্ট্রেস হরমোনগুলি আপনার শ্বাসযন্ত্র এবং কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমকে প্রভাবিত করে। অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফলে হাঁপানি থাকলে শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যা হয়।

মানসিক চাপের ফলে হার্ট দ্রুত পাম্প করে। স্ট্রেস হরমোনগুলির কারণে রক্তনালীগুলি আপনার পেশীগুলিতে আরও বেশি অক্সিজেন সরবারহ করে। এটি আপনার রক্তচাপকে বৃদ্ধি করে। রক্তচাপ বৃদ্ধি পেলে, তখন স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের হয়ে থাকে।

রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়:

আমরা কম বেশি সবাই মানসিক চাপের মধ্যে থাকি। অতিরিক্ত মানসিক চাপ উচ্চ রক্তচাপ বাড়ানোর অন্যতম প্রধান কারণ। তাই মানসিক চাপ বা স্ট্রেস হ্রাস করতে শ্বাস প্ৰশ্বাসের ব্যায়ম করুন, হাঁটুন, বই পড়ুন।

প্রতিদিন গান শুনলে সিস্টোলিক রক্তচাপ হ্রাস পেতে দেখা গেছে। এছাড়া যোগ ব্যয়াম এবং ধ্যানও চাপ হ্রাস করার ভাল উপায়।

আয়ু কমিয়ে দেয়:

উদ্বেগ এবং মানসিক চাপ আমাদের আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পারে। যারা একটু রিলাক্স জীবন যাপন করে তাদের তুলনায় মানসিক চাপযুক্ত মানুষের অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি তিনগুণ বেশি থাকে। গবেষণায় দেখা যায় যে জীবন নিয়ে হতাশ ও উদ্বিগ্ন ব্যক্তিদের মধ্যে জীবন সম্পর্কে আশাবাদী ব্যক্তিদের তুলনায় ৪২% বেশি অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। তবে, হাসি এবং জীবনে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি উভয়ই মানসিক চাপ হ্রাস করতে পারে এবং আমাদের জীবনকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।

চুল পড়ে:

মানসিক চাপ প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের স্বল্পতার সৃষ্টি করে চুল দুর্বল করে ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেকদিন ধরে মানসিক চাপে ভুগলে চুল পড়ার সমস্যা দেখা দেয়। মানসিক চাপে থাকলে ঠিকমতো খাবার খাওয়া হয় না, যার ফলে দেখা দেয় চুল পড়ার সমস্যা।

পেটের চর্বি বাড়াতে সহায়তা করে:

মানসিক চাপ স্ট্রেস কর্টিসল তৈরি করতে, অ্যাড্রিনাল গ্রন্থিগুলি ট্রিগার করে পেটের চর্বি বাড়াতে সহায়তা করতে পারে যা স্ট্রেস হরমোন নামেও পরিচিত। গবেষণায় দেখা যায় যে উচ্চ কর্টিসলের মাত্রা ক্ষুধা বাড়ায় এবং পেটে ফ্যাট জমা করে।

তাই পেটের চর্বি কমাতে আনন্দদায়ক কাজের সাথে নিজেকে জড়িত রাখুন। যোগ ব্যায়াম বা ধ্যান করুন এতে মানসিক চাপ অনেকটা কমে যাবে।

পাচনতন্ত্রকে প্রভাবিত করে:

মানসিক চাপ লিভারকে অতিরিক্ত রক্তে শর্করার (গ্লুকোজ) উৎপাদন করতে সাহায্য করে। যদি আপনি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন তবে আপনার শরীর এই অতিরিক্ত গ্লুকোজকে ধরে রাখতে সক্ষম হবে না। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস টাইপ-2 ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।

এছাড়া স্ট্রেস হরমোন পাচনতন্ত্রকে প্রভাবিত করতে পারে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ পেটের অম্বল এবং অ্যাসিড হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে আলসার হয় না তবে এটি আলসার হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

শরীরে ব্যথা সৃষ্টি করে:

মানসিক চাপ কাটিয়ে আবার হাশিখুশি থাকবেন এটা স্বাভাবিক। তবে আপনি যদি ক্রমাগত মানসিক চাপে থাকেন তবে আপনার পেশীগুলি শিথিল হওয়ার সুযোগ পাবে না। শক্ত পেশী মাথাব্যথা, পিঠে এবং কাঁধে ব্যথা এবং শরীরে ব্যথা সৃষ্টি করে।

যৌনতা এবং প্রজনন ব্যবস্থা:

শরীর এবং মন উভয়ের জন্য মানসিক চাপ ক্ষতিকর। আপনি যখন অবিচ্ছিন্ন চাপের মধ্যে থাকেন তখন আপনার আকাঙ্ক্ষা হারানো অস্বাভাবিক কিছু নয়।

দীর্ঘদিন ধরে যদি চাপ অব্যাহত থাকে তবে একজন মানুষের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমতে শুরু করতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী চাপ প্রস্টেট এবং টেস্টের মতো পুরুষ প্রজনন অঙ্গগুলির সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থাপনা:

মানসিক চাপ আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আমাদের শরীরকে বিভিন্ন সংক্রমণ এড়াতে এবং ক্ষত নিরাময়ে সহায়তা করে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অতিরিক্ত মানসিক চাপ আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের ফলে জ্বর এবং সাধারণ সর্দি, পাশাপাশি অন্যান্য সংক্রমণের মতো ভাইরাল অসুস্থতা হতে পারে।