কম খাওয়ার অভ্যাস আয়ু বৃদ্ধি করে।

জীবন ধারণের তাগিদে আমাদের সকলেরই খাবার খেতে হয়। স্বাস্থ্যকর পরিমিত খাবার যেমন আমাদের জন্য প্রয়োজনীয়, তেমনি অস্বাস্থ্যকর এবং অনিয়ন্ত্রিত খাবার আমাদের জন্য ক্ষতিকর। ফাস্টফুড নামক মুখরোচক খাবার গুলি প্রায় সবার জীবনে প্রভাব ফেলছে। ফাস্টফুড মানুষের খাওয়ার প্রবণতা হাজারগুন বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা জেনে বুঝে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্যালরি সমৃদ্ধ খাবার খাচ্ছি যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। অথচ আমরা যদি আমাদের খাদ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে কম ক্যালরিযুক্ত খাবারগুলি রাখি তাহলে তা আমাদের আয়ু বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

কম ক্যালরিযুক্ত ডায়েট এর উপর গবেষণা:

মানুষের উপর সাম্প্রতিক গবেষণা দেখা গেছে যে, কম ক্যালোরি(কার্বহাইড্রেট) যুক্ত ডায়েট বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি ধীর করে এবং আয়ু বাড়িয়ে দেয়।

দীর্ঘজীবন বাঁচতে চান? তাহলে আমাদের যে চোখের ক্ষুধা আছে সেটা কমাতে হবে এবং কম খেতে হবে – এটি বেশ কয়েকটি বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়ার গবেষণার সারকথা। কম ক্যালরি যুক্ত ডায়েট মন ভালো রাখবে এবং বয়স সম্পর্কিত রোগগুলি হওয়ার সম্ভাবনা কমাবে যা, আমাদের দেহকে সুস্থ্য সবল রাখবে।

সেল মেটাবলিজম জার্নালে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, দুই বছর ধরে যদি ১৫% শতাংশ কম ক্যালরি খাওয়া হয় তাহলে বয়স বৃদ্ধি, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস এবং আলঝাইমা জাতীয় রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। লো-ক্যালরি ডায়েট মেটাবলিক রেট কমায় এবং ফ্রি-র‌্যাডিকেল এর পরিমান কমায়।

লুয়েসিয়ায় পেনিংটন বায়োমেডিকাল রিসার্চ সেন্টারের ক্লিনিকাল সায়েন্সের সহযোগী অধ্যাপক বলেছেন, খাদ্য পরিপাক প্রক্রিয়া(মেটাবলিজম) যদি কম হয় তাহলে আমাদের আয়ু দীর্ঘ হতে পারে।

অপরিমিত খাবার গ্রহণ সুস্বাস্থ্যের অন্তরায়:

অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো না। ঠিক তেমনি আমাদের শরীরে যদি অতিরিক্ত খাবার দেওয়া হয় খারাপ সেগুলো আমাদের উপর খারাপ প্রভাব ফেলবে। সুন্দর স্বাস্থ্যকর ডায়েটের মধ্যে দিয়ে আমরা অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাস বদলাতে পারি। গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই জানেন যে, কম ক্যালোরি যুক্ত ডায়েট বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিকার হতে পারে। সাম্প্রতি এক গবেষণায় ২১ থেকে ৫০ বছর বয়সের ৫৩ জন ফিট এবং স্বাস্থ্যবান মানুষের উপর গবেষণা করে দেখা গেছে যে, যদি কম ক্যালরি যুক্ত খাবার খাই তাহলে তারাও উপকৃত হবে।

কম ক্যালরি যুক্ত খাবার

কম ক্যালরিযুক্ত কয়েকটি খাবার নিচে দেওয়া হল:

  • গ্রীক দই
  • সুপ
  • পপকর্ন
  • ডিম
  • শাক সবজি
  • সব ধরনের জাম
  • মাছ
  • চীজ
  • আলু
  • তরমুজ
  • আপেল ইত্যাদি।

উইসকনসিন স্কুল অফ মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথের সহযোগী অধ্যাপক রোজালিন অ্যান্ডারসন বলেছেন যে, “একটি বিষয় নিশ্চিত, আপনি যদি কম খান এবং ওজন কমান, তবে আপনি দীর্ঘ জীবন লাভ করবেন।” গত মাসে সায়েন্স ট্রান্সলেশনাল মেডিসিনে প্রকাশিত কম ক্যালোরি ডায়েট স্টাডিতে দেখা গেছে যে, প্রতি মাসে পাঁচ দিন এভাবে তিন মাস পর্যন্ত উপবাসে যে ধরনের খাবার খাওয়া হয় সেরকম একটি ডায়েট অনুসরণ করলে দ্রুত বৃদ্ধ হওয়ার গতি হ্রাস পাবে।

জোন ডায়েট সিরিজের বইয়ের লেখক এবং ইনফ্ল্যামেশন রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সভাপতি ব্যারি সিয়ার্স ব্যাখ্যা করেছেন, ক্যালোরি-নিয়ন্ত্রিত ডায়েটগুলি শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত চর্বি কমায়। তিনি বলেছেন, “আপনি যত বেশি ক্যালোরি খাবেন, ততই ফ্রি-রেডিক্যাল উৎপন্ন হবে।” ফ্রি-রেডিক্যাল আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর।

ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সর্তকতা:

ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ এর জন্য আমাদেরকে একটু সতর্ক হতে হবে। ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে আমরা যদি আমাদের শরীরের প্রয়োজনীয় ক্যালরি গ্রহণ না করি, সে ক্ষেত্রে শরীরে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

  • উইনকোনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর রোজালিন অ্যান্ডার্সন মতে:

    ইঞ্জিনগুলির মতো, দেহেরও জ্বালানী দরকার। তাই কিছু বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, কিছু মানুষ এত বেশি ক্যালরি কমিয়ে ফেলে যে, তাদের পেশী ভর বা হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়। অ্যান্ডারসন ব্যাখ্যা করেছিলেন, “বেঁচে থাকার জন্য আপনার জ্বালানি দরকার। সব ধরনের ডায়েট সব ধরনের লোকের সাথে ফিট করে না। তাই ডায়েটগুলি শুরু করার আগে একজন ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করার জন্য বলেন বিশেষজ্ঞরা।

  • কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন চিকিৎসক প্রিয়া খোরানার মতে:

    যদি আমরা ক্যালরি গ্রহণ ১৫% কমায় তাহলে সেটা আমাদের জন্য সহনীয় কিন্তু যদি ২৫% কমায় তাহলে সেটা আমাদের জন্য স্বাস্থ্যকর না এবং দীর্ঘমেয়াদে, এই ডায়েটগুলি পরিমিত ডায়েটের মতো কার্যকর নয় — খোরানা বলেছেন। সুষম পুষ্টি সমৃদ্ধ ডায়েট অনুসরণ করা সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। তিনি বলেছেন ডায়েটের পাশাপাশি ব্যায়ামটাও গুরুত্বপূর্ণ। সারকথা হল স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার পাশাপাশি শক্তিকে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করতে হবে দীর্ঘায়ু হওয়ার জন্য।

বাংঙ্গালী জাতির মধ্যে বেশি খাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। আমরা মানতে নারাজ যে এই বেশি খাওয়ার অভ্যাস আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এটা আমাদের আয়ু কমিয়ে দিতে পারে। আমরা যদি বেশি দিন ধরে এই সুন্দর পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকতে চাই তাহলে অবশ্যই আমাদের কম খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।

Share