বসন্তরোগ বা চিকেনপক্স নিয়ে ভয় পাচ্ছেন। জেনে নিন পরিত্রাণের উপায়।

বসন্তরোগ বা জলবসন্ত বা চিকেনপক্স অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ। এটি ভাইরাস বাহিত একটি রোগ। সংক্রামক রোগের তালিকায় উপরের দিকে এর অবস্থান। ভাইরাস আক্ৰান্ত ব্যাক্তি থেকে দ্রুত অন্যজনে ছড়িয়ে পড়ে। Varicella-zoster নামক ভাইরাসের সংক্রমণে এই রোগ হয়ে থাকে। এই রোগে আক্রান্তের হার বসন্তকালে সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারী-মার্চ এই সময়টায় এই ভ্যারিসেলা ভাইরাস- এর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। সাধারণতঃ কেউ একবার এ রোগে আক্রান্ত হলে জীবনে আর আক্রান্ত হয় না- এই রকম একটা ধারণা প্রচলিত আছে। তবে বন্ধুরা এটা যে শতভাগ সত্যি তা বলা খুবই মুশকিল।

শিশুরা সহজেই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এই ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার সাথে সাথে রোগের কোনো লক্ষণ দেখা যাই না। “Varicella” ভাইরাস শরীরে প্রবেশের ১৪ থেকে ২১ দিন পর ধীরে ধীরে পক্সের উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে। তাই আক্রান্ত ব্যাক্তির শরীরে ফুসকুড়ি ওঠার ৫-৭ দিন আগে থেকে ও ফুসকুড়ি শুকিয়ে যাওয়ার পরবর্তী ৪-৫ দিন সময় পর্যন্ত হাঁচি-কাশির মাধ্যমে, রোগীর ব্যবহৃত জিনিসপত্রের মাধ্যমে বা কেউ সংস্পর্শে এলে তারও জলবসন্ত বা চিকেনপক্স হতে পারে।

শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা যাই, স্কুলে গিয়ে তাদের বেশিরভাগ এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছে। এর কারণ হলো এই ভাইরাসটা শরীরে যাবার পর ফুসকুড়ি ওঠার আগে যে হালকা সর্দি-কাশি, জ্বর ও গায়ে ব্যাথা হয় ওই সময়টায় এক বাচ্চা থেকে অন্য আর ১০টা বাচ্চা সংক্রামিত হচ্ছে। ফুসকুড়ি ওঠার আগে এটা বোঝা যাই না। আর যখন বাড়িতে থাকছে তখন দেখা যাচ্ছে বাড়ির বাকি বাচ্চারা বা অন্য সদস্যরাও আক্রান্ত হচ্ছে। তবে সুখবর হচ্ছে, জলবসন্ত বা চিকেনপক্সের টিকা আছে। টিকা দিলে চিকেনপক্স থেকে শিশুদের আক্রান্ত হবার হার কমানো সম্ভব।

চিকেনপক্সের উপসর্গ বা লক্ষণগুলো কি কি ?

শরীরে লাল বা গোলাপি ফোস্কা ওঠার আগে এটি আমাদেরকে আগাম জানান দিয়ে থাকে। সমস্ত শরীরে ব্যাথা হয়। জ্বর জ্বর অনুভূত হয়। হঠাৎ করে সর্দি কাশি শুরু হয়ে যাই। কাজ-কর্ম করছি কিন্তু তারপরও কেমন যেন অসুস্থতা অনুভব হতে লাগে। এই সময় ভাইরাসটা শরীরের ভেতরে বংশবৃদ্ধি করতে থাকে।

চিকেন পক্সের উপসর্গ গুলো হলো –

১. সমস্ত শরীরে Rash- এ ভরে যায়। Rash-গুলো জল ভর্তি ফুসকুড়ির মতো। চামড়া খুবই পাতলা থাকে। সহজেই ফেটে যায়।
২. চুলকানি অনুভূত হয়।
৩. জ্বর
৪. অবসাদ, ক্লান্তি, মানসিক শ্রান্তি, জড়তা, নির্জীবতা জেঁকে বসে।
৫. মাথা ব্যাথা দেখা যায়।
৬. খিদে কমে যায়।

জলবসন্ত বা চিকেনপক্সে করণীয়:

জলবসন্ত বা চিকেনপক্স ছয় সাতদিন পরে এমনিতেই সেরে যায়। এটা খুব বেশি সমস্যা করে না। জ্বর ও ব্যাথার জন্য অনেকে প্যারাসিটামল এবং সংক্রামণ দীর্ঘায়িত না হওয়ার জন্য এন্টিবায়োটিক জাতীয় ঔষধ খেয়ে থাকেন। গুটির জন্য Neomycin জাতীয় ক্রিম ও চুলকানি কমানোর জন্য Choloropheniramin Maleate বা এ জাতীয় ঔষধ ব্যবহার করেন। তবে এটি অবশ্যই আপনার ডাক্তার-এর সাথে পরামর্শক্রমে ব্যবহার করবেন।

বসন্তরোগে নিমপাতার ব্যবহার :

বসন্তরোগ ও নিমপাতা যেনো সমার্থক এই ভারতীয় উপমহাদেশে। হাজার বছর ধরে নিমপাতা বসন্তরোগে ব্যবহার হয়ে আসছে। নিমপাতা সংক্রমণের হার কমিয়ে দেয়ার পাশাপাশি পক্সের দাগ দূর করতেও দারুন কার্যকর।বসন্ত রোগে রোগীকে নিমপাতার বিছানায় শোয়ালে জীবাণুনাশক হিসেবে ইনফেকশন হওয়া থেকে রক্ষা করে। কাঁচা হলুদের সাথে নিম পাতা বেটে বসন্তের গুটিতে দিলে গুটি দ্রুত শুকিয়ে যায়।

নিমপাতার আরও উপকারীতা সম্পর্কে জানুন।

যেসব ভূল ধারণা বা কুসংস্কার প্রচলিত আছে চিকেনপক্স সম্পর্কে :

বসন্তরোগ মায়ের দান:

এটা সম্পূর্ণ ভুল একটা ধারণা। ভ্যারিসেলা জোস্টার নামক ভাইরাস এর জন্য দায়ী।

বসন্তরোগ বা চিকেনপক্স হলে মাছ মাংস খাওয়া বারণ :

একেবারে ভুল একটি ধারণা এটি। যেহেতু শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এই সময়ে। তাই এই সময়ে প্রোটিনের চাহিদা পূরণের জন্য পরিমাণমতো মাছ মাংস খাওয়া যেতে পারে।

কমপক্ষে সাতদিন স্নান করা যাবে না :

প্রতিদিনই পরিষ্কার পরিছন্ন হতে হবে। ফোস্কা ফেটে যাবার পরে সাবান দিয়ে পরিষ্কার হতে হবে। স্নান না করলে অনেক সময় দাগ কঠিন আকার ধারণ করে।

চিকেনপক্স শুধু বাচ্চাদের হয় ও এর টিকা নেই :

সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। চিকেনপক্স ছোট-বড় সকলের হতে পারে। চিকেনপক্সের টিকা আছে। এজন্য অল্প বয়স থেকে বাচ্চাদের টিকা দেওয়া হয়।

চিকেনপক্সের কোনো চিকিৎসা নেই:

চিকেনপক্সের কোনো চিকিৎসা নেই এটি ঠিক না। যেহেতু ভাইরাস-এর কারণে এটি হয় সেহেতু এন্টিভাইরাল চিকিৎসা দ্রুত শুরু করলে ভোগান্তিটা কম হবে।

Share