কর্পূর ব্যথা কমাতে, ত্বক ও চুলের যত্নে এবং উকুঁন, ছারপোকা তাড়াতে দারুন কার্যকর।

ঘ্রাণ বা সুঘ্রাণ কত জিনিষেরই তো রয়েছে। কিন্তু মন ভোলানো, মনে প্রশান্তি জাগানো, ঘ্রাণ নেওয়ার সাথে সাথে মুড চেঞ্জ। এমনই ইউনিক একটি সুঘ্রাণ আপনি চোখ বন্ধ করেও বলে দিতে পারবেন যে, এটা কর্পূর। আয়ুর্বেদ এবং ইউনানী চিকিৎসায় কর্পূর সুপ্রাচীনকাল থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে, খাবারের সুগন্ধ বাড়াতে, রুম ফ্রেশনার হিসাবেও কর্পূরের ব্যবহার করা হয়।

সংস্কৃতে এজন্য হয়তো এর নাম দেওয়া হয়েছে Gandhadravya (গন্ধদ্রব্য), Chandraprabha (চন্দ্রপ্রভা). বাংলায় কর্পূর, ইংরেজিতে Camphor, হিন্দিতে Karpur(কারপুর), আয়ুর্বেদিক নাম কারপারা, চীনা ভাষায় Xiang-Zhang, জহাং-শু নামে পরিচিত।

কর্পূর একটি জৈব যৌগ যা ক্রিম, মলম এবং লোশনগুলিতে সাধারণত ব্যবহৃত হয়। এটি দুটি ধরণের – ভোজ্য কর্পূর এবং সিনথেটিকভাবে তৈরি কর্পূর। কর্পূর তেল কর্পূর গাছের কাঠ থেকে উত্তোলিত এবং বাষ্প পাতন দ্বারা প্রক্রিয়াজাত করা তেল। এটি শ্বাসযন্ত্রের কার্যকারিতা উন্নত করতে, ব্যথা কমাতে, ত্বকের জ্বালা এবং চুলকানি উপশমের জন্য, ঘুমদায়ক এবং এটি কাশি-সর্দি, বুকের কফ, পাচনতন্ত্রের উন্নতিতে ব্যবহৃত হয়।

কর্পূর কি এবং কোথা থেকে আমরা এটি পেয়ে থাকি?

এটি একটি দহনযোগ্য, স্ফটিকের ন্যায় স্বচ্ছ, সাদা ঘন যা একটি তীব্র সুন্দর গন্ধযুক্ত এবং টক স্বাদযুক্ত। বেশিরভাগ  মানুষ এর নাক সুড়সুড়ি দেওয়া সুগন্ধ পছন্দ করে। কর্পূর বৈজ্ঞানিকভাবে Cinnamomum Camphora নামে পরিচিত। Camphor tree হল Lauraceae পরিবারের একটি চিরসবুজ গাছ যা এশিয়ার বিশেষ অঞ্চলে যেমন বোর্নিও দ্বীপপুঞ্জ, সুমাত্রা এবং ইন্দোনেশিয়ায় দেখা যায়।

যে গাছগুলি ৫০ বছর বয়সী হয়ে গেছে তারা একটি মোমযুক্ত পদার্থ তৈরি করে এবং এটি কর্পূর তেল হিসাবে ব্যবহৃত হয়। কর্পূর তেল গাছের কাণ্ড থেকে বাষ্প পাতন প্রক্রিয়া দ্বারা উত্তোলন করা হয়। কর্পূর গাছটি জাপানের হিরোশিমার স্থানীয় বলে জানা যায়।

কর্পূর কি জীবাণু মারে?

কর্পূর খুব কার্যকরভাবে ব্যাকটিরিয়া, জীবাণু এবং ভাইরাসকে মারতে পারে। ঘন ঘন কাশি হলে (কর্পূর + সরিষার তেল)  আমরা বুক এবং গলাতেও মালিশ করতে পারি। D. Camphor একটি অ্যান্টিভাইরাল এজেন্ট।

কর্পূরের উপকারিতা:

অ্যান্টি-ফাঙ্গাল, অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি, অ্যান্টি-স্প্যাসমডিক এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্যগুলির কারণে কর্পূরের বিভিন্ন ধরণের ব্যবহার রয়েছে।

ত্বকের জন্য কর্পূর:

এটির একটি দৃঢ় গন্ধ এবং স্বাদ আছে এবং সহজেই ত্বকের মাধ্যমে শোষিত হয়। কর্পূরযুক্ত লোশন এবং ক্রিমগুলি ত্বকের জ্বালা এবং চুলকানি দূর করতে ব্যবহার করা যেতে পারে এবং ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করে। এটিতে অ্যান্টিব্যাকটিরিয়াল এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা এটি সংক্রমণ নিরাময়ে খুবই কার্যকরী।

২০১৫-সালের একটি প্রাণী গবেষণায় কর্পূর ক্ষত এবং রিঙ্কেলের চিকিৎসায় কার্যকর বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। ইলাস্টিন এবং কোলাজেন উৎপাদন বাড়ানোর দক্ষতার কারণে এটি এন্টি এজিং প্রসাধনীগুলিতে এটি ব্যবহার করা হয়।

পোড়া ক্ষত নিরাময় করে:

একটি প্রাণী গবেষণায় দেখা গেছে যে কর্পূর, তিলের তেল এবং মধুযুক্ত একটি মলম পোড়া জখমের নিরাময়ে বেশ কার্যকরী ছিল এবং ভ্যাসলিন ব্যবহারের চেয়ে বেশি উপকারী বলে প্রমাণিত হয়েছিল।

ব্যথার চিকিৎসা:

কর্পূর পণ্যগুলি বাতের কারণে ব্যথা, প্রদাহ এবং ফোলাভাব থেকে মুক্তি পেতে কার্যকর। কর্পূরের উত্তপ্ত বা শীতল সংবেদনগুলি আপনাকে ব্যথা থেকে মুক্তি দিতে পারে। কর্পূরের প্রচুর অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কোনও ক্ষত্রে কর্পূর তেল প্রয়োগ করা নিরাময় প্রক্রিয়াটির গতি বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং ফোলাভাব কমাতে পারে।

ঘুমোতে সহায়তা করে:

কর্পূর তেলের সুবাস মনের উপর শান্ত প্রভাব ফেলে এবং একটি রাতের ঘুম এনে দেয়।

চুল বৃদ্ধি ঠিক রাখে:

কর্পূর তেল চুলকে নরম করে তোলে এবং চুলের বৃদ্ধিকে বাড়িয়ে তোলে। নিয়মিত মাথায় যে তেল ব্যবহার করেন তার সঙ্গে কর্পূর এসেনশিয়াল অয়েল মিশিয়ে মাথায় মেখে দেখুন। দেখবেন, চুল ঝরার পরিমাণ অনেকটাই কমে যাবে। চুলে শ্যাম্পু করার আগে এই তেলের মিশ্রণ মাথার তালুতে আর চুলের গোড়ায় ভাল করে মাখলে খুশকির সমস্যা দ্রুত কমে যাবে।

পিঁপড়ে,ছারপোকা তাড়াতে ও উকুঁন মারতে:

পিঁপড়ে, ছারপোকা ও মশা তাড়াতে আমরা কীটনাশক ও বিভিন্ন কেমিক্যাল ব্যবহার করে থাকি। এগুলো আমাদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তাই ক্ষতিকর কীটনাশকের পরিবর্তে জলের সঙ্গে কর্পূর মিশিয়ে ঘরের কোনায় কোনায় ছিটিয়ে দিন। দেখবেন কর্পূরের গন্ধে পিঁপড়েরা ঘর ছেড়ে পালাবে।

একটি বড় কর্পূরের টুকরো কাপড়ে মুড়ে বিছানা ও ম্যাট্রেসের মাঝামাঝি রেখে দিন। এতে বিছানায় ছারপোকার উপদ্রব কমে যাবে। এটি আমাদের পোশাক থেকে তেলাপোকা, মথ এবং অন্যান্য পোকামাকড় দূর করতে সহায়তা করে।

নারকেল তেলে গুঁড়ো কর্পূর ট্যাবলেট মিশ্রিত করুন এবং বিছানায় যাওয়ার আগে মাথার ত্বকে এবং চুলে একইভাবে লাগান। শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন এবং উকুনকে বিদায় জানান।

ব্রণ নিরাময়ে:

এটি পায়ের নখের ছত্রাক দূর করতেও খুবই কার্যকরী। কয়েক ফোঁটা কর্পূর এসেনশিয়াল অয়েল অন্য কোনও তেলের সঙ্গে মিশিয়ে ব্রণ আক্রান্ত ত্বকে মালিশ করলে ব্রণ সেরে যাবে।

বর্তমান সময়ে কর্পূর রাসায়নিকভাবে টারপেনটাইনের তেল থেকে তৈরি করা হচ্ছে।

সতর্কতাঃ

আপনি যতক্ষণ না এটি সঠিকভাবে ব্যবহার করেন ততক্ষণ এটি ব্যবহার করা নিরাপদ। এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষত যদি আপনি এটি উচ্চ মাত্রায় ব্যবহার করেন। তবে কখনওই শরীরের কোনও ক্ষত স্থানে কর্পূর লাগাবেন না।

সূত্রঃ healthline, NDTV, planetayurveda

Share