বিবাহিত পুরুষের কাছে মা আগে না বউ আগে?

প্রতিটি পুরুষ মানুষের জীবনে মা এবং স্ত্রী উভয়েই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। মা একদিকে যেমনঃ সন্তানকে জীবন দান করেন এবং সমস্ত প্রতিকূলতার মাঝে শত কষ্ট সহ্য করেও সন্তানকে বড় করে তোলেন। অন্যদিকে স্ত্রী হয়ে ওঠে তাঁর যমজ আত্মা। স্বামীর প্রতি যত্নশীল এবং স্বামীকে সংশোধন করেন এবং সারা জীবন তাঁর পাশে থাকেন।

It is said that “A Husband finds a second mother in his wife, while a wife finds her first baby in the husband”.

বলা হয়ে থাকে যে “স্বামী তার স্ত্রীর মধ্যে দ্বিতীয় মাকে খুঁজে পান, আর একজন স্ত্রী তার প্রথম সন্তান স্বামীর মধ্যে খুঁজে পান”। একজন মানুষের জীবনে একজন মা এবং স্ত্রীর ভূমিকা অপরিসীম।

মা সন্তানকে এই বিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, যখন শিশু তার পৃথিবীতে একেবারে নতুন। একটি শিশু মায়ের ভালবাসা, যত্নে বড় হয়। মা সন্তানের জন্ম থেকে শুরু করে, তার ভালো-মন্দ সুবিধা-অসুবিধা সবকিছুর দেখভাল করেন এবং তার সুরক্ষা দেন। এভাবে শিশুটি যখন বড় হয়ে স্বাবলম্বী হয় তখন মা জীবনের অন্য প্রান্তে থাকে। জীবনের অন্য প্রান্তে মায়ের একই যত্নও মনোযোগ এর প্রয়োজন হয় যা স্বাভাবিকভাবেই মা তার ছেলের কাছ থেকে আশা করে।

স্ত্রী একটি রংধনুর মতো এসে ছেলের জীবনের অংশ হয়ে যায় এবং মায়ের ভূমিকা গ্রহণ করেন। যদিও সে মাকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না, তবুও সে একজন বন্ধু, গাইড, নার্স, রাঁধুনি ইত্যাদি হয়ে যায় যা শেষ বয়সে মা হতে পারে না। একজন স্ত্রীই সেই ব্যক্তি যিনি স্বামীর সুরক্ষা সম্পর্কে মায়ের মতো ভাবতে পারেন। একজন পুরুষ তার মায়ের উপর নির্ভর করতে পারেন। কিন্তু মা ভিন্ন যদি অন্য কারোর উপর নির্ভর করতে হয় তাহলে দ্বিতীয় নারী হিসাবে স্ত্রীর ভূমিকা অসামান্য।

একটা প্রমাণিত সত্য কথা প্রায় শোনা যায় “প্রত্যেক সফল পুরুষের পিছনেই একজন মহিলা থাকে” যিনি তার মা, স্ত্রী, বোন বা বন্ধু হতে পারেন। একজন পুরুষ তার জীবনে উভয় নারীর যত্ন নেওয়ার সময় একজন ভাল স্বামীর পাশাপাশি একটি ভাল ছেলেও হতে পারে। তার উচিত দুজনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এবং তাঁর উচিৎ জীবনে উভয় নারীর যত্ন নেওয়া। দুজনকেই গুরুত্ব সহকারে মূল্যায়ন করা।

কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

মা গুরুত্বপূর্ণ না বউ গুরুত্বপূর্ণ – এই প্রশ্নটি খুবই জটিল। এটি তখনই উদ্ভূত হয় যখন মা বা স্ত্রী বা উভয়ই পুত্র / স্বামীর উপর তাদের আধিপত্য প্রদর্শন করার চেষ্টা করে। এবং তারপরেই বিরোধ দেখা দেয়। গর্ভধারিনী মা সেও গুরুত্বপূর্ণ। সহধর্মিণী বৌ সেও গুরুত্বপূর্ণ। বেশি কমের দিকে যাবো না। আমরা সমান গুরুত্ব দিয়ে দুজনকেই বোঝাবো।

মা এবং বৌ দুজনকেই আলাদাভাবে বোঝান। সমতা রাখার চেষ্টা করুন। সমতা না রাখতে পারলে মা মনে করবে ছেলে বুঝি আমার পর হয়ে গেলো। স্ত্রী মনে করবে আমাকে মোটেই পাত্তা দেয় না।

বৌয়ের সামনে মাকে অপমান করবেন না ও মায়ের সামনে বৌকে অপমান করবেন না। একটা ছেলের কাছে মাও আপন আবার বউও আপন। মাকে রাখি না বৌকে রাখি। শ্যাম রাখি না কুল রাখি। মারাত্মক সমস্যা। একটি ছেলেকেই এর জন্য বেশি সাফার করা লাগে।

মা কি মনে করে বা বোঝে:

ছেলের বিয়ে হয়ে যাবার পরে বেশিরভাগ মা মনে করেন যে, ছেলে আমাকে আর আগের মতো গুরুত্ব দিচ্ছে না। ছেলে বুঝি পর হয়ে গেলো। আপনি যখন একটা মেয়েকে বিয়ে করে বাড়ীতে নিয়ে আসেন তখন মায়ের মনে অজান্তেই একটা ভয় ঢুকে যায়-ছেলে বুঝি আমার পর হয়ে গেলো।

এতদিন মা জানতেন তার একমাত্র অবলম্বন তার ছেলে। তার ছেলে তার পৃথিবী। ছেলের কাছে তিনিই সব। কিন্তু যখন আর একটি মেয়ে বাড়িতে আসলো – তার অধিকার বিস্তার করছে। তার কাছে সব কথা বলছে। সেটা চট করে মেনে নেওয়া একটু কঠিন। অবলম্বন হারিয়ে যাওয়ার টেনশন এসে যায়। একাকীত্ব বোধ করেন।

স্বামী-স্ত্রী নতুন যারা বিয়ে করেছেন। হয়তো হঠাৎ করে মা কে ভুল করে কিছু একটা বলে ফেললেন। রাগের মাথায় মা কে যেটা বলা উচিত নয় সেটা বলে ফেললেন। এতে মায়েরা এতটা সংবেদনশীল হয়ে ওঠে যে, আপনাকে কত কষ্ট করে মানুষ করেছে, সেই প্রসব যন্ত্রনা থেকে শুরু করে সব কথা মনে করতে থাকে তখন মা ভেতর ভেতর এতটা যন্ত্রনা অনুভব করেন যে, সে সেটা নিতে পারে না। ফলে সব রাগ গিয়ে পড়ে ঐ বৌয়ের উপর।

এবার বৌয়ের দিকে আসি :

পরিবার বাবা মা সকলকে ছেড়ে আপনার বাড়িতে এসেছে। আপনার মা কে মা বলছে। আপনার হাত ধরে নতুন একটা পরিবারে এসেছে। তার ছোটবেলা থেকে বেড়ে ওঠা যে বাড়ীতে-তার পরিবার পরিজন, তার বাবা-মা সকলকে ছেড়ে সে কিন্তু আপনাকে আপন ভেবে আপনার হাত ধরে একটা নতুন পরিবেশে চলে এসেছে। ঠিক আমরা যেমনঃ একটা চারাগাছ পুঁতি। তারপর তাকে যদি কোথাও শিফট করতে হয়। নতুন কোনো জায়গায় গিয়ে রোপন করি। তাহলে তাকে পরিচর্যা করতে হবে। তাকে জল দিতে হবে অর্থাৎ তাকে ভালোবাসুন। তাকেও সুন্দরভাবে শিখিয়ে পড়িয়ে নিন। তাকে আপন করুন। তাহলে একটা সময় দেখবেন সে নিজে থেকেই ফল দেবে অর্থাৎ আপনাকেও ভালোবাসবে। আপনার সংসারের উন্নতি হচ্ছে।

ছেলে হয়ে আপনি আপনার গর্ভধারিনী মাকে গুরুত্ব দিন এবং তাকে সুন্দরভাবে বোঝান। মাকে অনেককিছু বোঝাতে পারলে দেখবেন সে স্বাভাবিকভাবে সবকিছু মেনে নিচ্ছে। মাকে এটা বলা যেতে পারে, যে মেয়েটি এখানে আসার পর থেকেই তোমাকে মা বলে ডাকছে এবং এই মা ডাক শোনার জন্য তোমার কোনো কষ্ট করতে হয়নি। যে প্রতিমুহূর্তে মা মা বলে ডাকছে তাকে আপন ভাববো না তো কাকে আপন ভাববো। তখন দেখবেন আপনার মাও স্বাভাবিকভাবে ব্যাপারটা ভেবে দেখবে, বুঝবে ঠিকইতো।

আমরা স্বামী-স্ত্রী প্রায়ইতো ঘুরতে বেরোয়। স্ত্রীর পছন্দসই জায়গায় যায়। মা দেখছে প্রায় উইকেন্ডে ছেলে বৌ বেড়াতে যাচ্ছে। মাকে পুরোপুরি বাদ দিবেন না। এটা একটা বড় ভুল যেটা ছেলেরা করে থাকে। মাঝে-মধ্যে মাকেও নিয়ে গেলেন বা মায়ের পছন্দসই কোথাও গেলেন। মাকেও গুরুত্ব দিলেন, বউকেও গুরুত্ব দিলেন। মাকে বৌয়ের সামনে ছোট করবেন না এবং বউকেও মায়ের সামনে ছোট করবেন না।

আমাদের সমাজে বাজে একটা ধারণা প্রচলিত আছে। বাসর রাতে বেড়াল মারতে হয়। অর্থাৎ স্ত্রী হচ্ছে বেড়ালসম। তাকে বাসররাতে মেরে দিতে হবে ,তার মানে স্ত্রী যেনো মাথায় চড়ে না বসে। বর্তমান শিক্ষীত সমাজে এটা খুবই ঘৃণ্য একটা বিষয়। প্রথম দিন থেকেই যদি এরকম চিন্তা ভাবনা থাকে। প্রথম দিন থেকেইতো আমরা তাকে সন্মান দিতে পারছি না। যে সব ছেড়ে আমাদের কাছে এলো। আমাদের আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইছে। সেই পরিবারের যদি এই মেন্টালিটি থাকে তাহলে সেই পরিবারে কিভাবে সুখ আসবে।

বৌকে বুঝাবেন তিনি যদি একজন ভাল স্ত্রী না হন তবে তিনি একজন ভাল মা হতে পারবেন না। মা কে শান্ত করার জন্য বৌকে দোষারোপ করবেন না অন্যদিকে বৌকে শান্ত করার জন্য মাকে দোষারোপ করবেন না। দুজনকে দরকার হয় আলাদা করে বুঝাবেন। মায়ের সামনে দেখবেন না বৌ খারাপ আর বৌয়ের সামনে দেখাবেন না মা খারাপ।

Share