নিরামিষ খাবার খান। দীর্ঘজীবন লাভ করুন।

একটি কথা প্রায়শ শোনা যাই ও এই বিষয়ে অনেক লেখালেখি হয়। বিষয়টি কি? বিষয়টি হলো- নিরামিষ খাবার খান, সুস্থ্য থাকুন। কারণ নিরামিষ খাবার খেলে রোগ ব্যাধি কম হয়। আয়ু বাড়ে অর্থাৎ দীর্ঘজীবন লাভ করা যায়। এছাড়া বয়স একটু বেড়ে গেছে। আপনি কোনো সমস্যা নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলেন। ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রিপোর্ট দেখে বললেন, রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমান অনেক বেশি, হার্ট-এর দু-এক জায়গায় ব্লক দেখা দিয়েছে, বা কারো কিডনিতে পাথর বা কোলন বা স্টমাক-এ ক্যান্সার সেল বাড়তে শুরু করেছে।

এবার ডাক্তারের পরামর্শ মাছ (গলদা, বাগদা, কাঁকড়া ইত্যাদি), মাংস (বিশেষ করে রেড মিট), এটা সেটা ইত্যাদি খাওয়া যাবে না। এরপর হার্ট, কিডনি, ক্যান্সার ইত্যাদি রোগ থেকে মুক্তি পেতে নিরামিষ খাবার খেতে শুরু করি। তাহলে নিরামিষ খাবারের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীতা অস্বীকার করার কোনো পথ নেই। স্বাস্থ্যগত দিক ছাড়াও মানুষ আরো অনেক কারণে নিরামিষ খাবার গ্রহণ করে। যেমনঃ ধর্মীয় দৃঢ়তা, পশু কল্যাণের কথা বিবেচনা করে অথবা পরিবেশগত সম্পদগুলির অত্যধিক ব্যবহার এড়াতে।

নিরামিষ খাবার দিনে দিনে অতি জরুরী হয়ে পড়েছে। ভারতের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ নিরামিষ খাবার খেতে পছন্দ করেন। শুধু ভারত নয়, সমগ্র বিশ্বে নিরামিষ খাবার অতি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। পৃথিবীর আদি গ্রন্থ বেদে নিরামিষ খাবার খাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বেশিরভাগ আমেরিকানদের উচ্চরক্তচাপ, ওবেসিটি, স্টমাক ক্যান্সার বা মহিলাদের ব্রেস্ট ক্যান্সার, ডায়াবেটিস- এর মূল কারণ অতিরিক্ত পরিমানে প্রসেসেড মিট খাওয়া। গবেষণায় প্রমাণিত, যারা নিয়মিত লাল মাংস বা এনিম্যাল ফ্লেশ খায় তাদের ক্যান্সার ও হার্ট disease-এ আক্রান্তের হার নিরামিষ ভোজীদের তুলনায় অনেক অনেক গুন্ বেশি।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক মিলিয়ন মানুষ লাল মাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। লাল মাংস ছেড়ে তারা মুরগির মাংস ও ছোট মাছ খাচ্ছে। আস্তে আস্তে ছাড়ার চেষ্টা করছে। নিজের ভালো সবাই বোঝে। প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ সম্পূর্ণ ভেজেটেরিয়ান হয়ে গেছে। তবে তারা পশু থেকে উৎপাদিত দুধ,পনির, ডিম খেয়ে থাকে।

নিরামিষ খাবারের প্রয়োজনীয়তা:

শরীরের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করে :

নিরামিষ খাবার মানে শাকসবজি, ফলমূল, ডাল-ভাত, সয়াবিন, মাশরুম ইত্যাদি। এই সমস্ত খাবারে আমাদের শরীরের জন্য জরুরি ভিটামিন ই, ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন বি১২ এছাড়া আইরন, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিঙ্ক, ক্যালসিয়াম, আয়োডিন ইত্যাদি থাকে। এছাড়া প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। ফলস্বরূপ এগুলো আমাদের শরীরের জরুরী চাহিদা পূরণ করে আমাদেরকে সুস্থ্য রাখে।

অতিরিক্ত মাত্রায় আমিষ গ্রহণ আমাদের শরীরে নানারকম রোগের সৃষ্টি করে। যেমনঃ ওজন বেড়ে যাওয়া, কোষ্টকাঠিন্য, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি পাথর বা কিডনি দুর্বল হয়ে পড়া, হার্ট disease, ডায়াবেটিস ইত্যাদি। কিন্তু শাকসবজি বা অন্যান্য নিরামিষ জাতীয় খাবার আমাদের শরীরে এই ধরণের সমস্যাগুলি হতে দেয় না বা এই ধরণের রোগগুলির সম্ভাবনাকে কম করে।

ভিটামিন :

সবুজ শাকসবজিতে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন থাকে। এই সব ভিটামিন আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। শরীরে কোলাজেন তৈরি করতে সাহায্য করে।

মস্তৃষ্কের পুষ্টি :

সবুজ শাকসবজিতে প্রচুর পরিমানে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ক্যারোটিনয়েডস থাকে। এছাড়া প্রচুর পরিমানে ভিটামিন বি থাকে যা আমাদের মস্তৃষ্কের কোষগুলিকে সতেজ ও কার্যকারী করে তোলে।

মেটাবলিজম :

কিছু খাবারে নির্দিষ্ট পুষ্টি থাকে যা শরীরের বিপাকক্রিয়া অর্থাৎ মানবদেহের রাসায়নিক রূপান্তর বৃদ্ধি করে। মানব শরীরে ক্যালোরি খরচের মাত্রা ও অন্যান্য প্রক্রিয়াগুলো বহনের হার দ্বারা মেটাবলিজমের হার নির্ধারিত হয়। মেটাবলিজমের হার বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা অতিরিক্ত ওজন কমানো ছাড়াও স্বাস্থ্য সম্পর্কিত অনেক সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারি। ফ্লাক্স সীডস, ডাল, আদা, লাল মরিচ ও কাঁচা মরিচ, গ্রীন টি, কফি, বাদাম, ব্রকলি, বাদামি, সবুজ,লাল-সকল রঙের শাকসবজি- এই খাবারগুলি ও পর্যাপ্ত ঘুম এবং বিশুদ্ধ জল শরীরের বিপাকক্রিয়া বাড়িয়ে দেয়।

নিরামিষ খাবারে ক্যালোরি কম থাকে। ফলে শরীরের ওজন বাড়ে না। নিরামিষ শাকসবজিতে বর্তমান ফাইবার, আইরন আমাদের শরীরের রক্তের লাল রক্তকণিকাগুলিকে শরীরের সব প্রান্তে পৌঁছে দেয় ফলত আমাদের মেটাবলিজমকে বাড়িয়ে তোলে।

ক্যান্সার :

সবুজ শাকসবজি আমাদের শরীরে কোলন ক্যান্সার, স্টোমাক ক্যান্সার, স্কিন ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। এগুলিতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফ্লাভোনয়েডস বিদ্যমান। এছাড়া ব্রকলি, বাঁধাকপি, হলুদে বর্তমান সালফোরাফেন, ইথিওক্যান্টে আমাদের শরীরে ক্যান্সারের জীবাণুগুলির সাথে লড়াই করতে সাহায্য করে।

স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে না :

এতে কোনোরকম স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে না। ফলে এটি কোলেস্টেরলের পরিমাণকে স্বাভাবিক রাখে। স্যাচুরেটেড ফ্যাট হলো অস্বাস্থ্যকর। এটি আমাদের কোলেস্টেরোল লেভেল বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ আমাদের জন্য স্যাচুরেটেড ফ্যাটের উপহার হলো হার্ট এটাক। সাম্প্রতিক গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে – বাস্তব পরিস্থিতি এর থেকে অনেক বেশি ভয়াবহ। স্যাচুরেটেড ফ্যাট অর্থাৎ স্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড সাধারণ তাপমাত্রায় সলিড অবস্থায় থাকে। এটি প্রধানত প্রাণী ও প্রাণী থেকে উদ্ভূত খাবার থেকে আসে যেমনঃ মিট ফ্যাট, লার্ড (চর্বি-যেমনঃ শুকরের চর্বি) বাটার ইত্যাদি।

এছাড়া নিরামিষ খাবারে ফাইবার বেশি থাকায় এটি আমাদের হজম ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করে। এটি রক্তচাপকে স্বাভাবিক রাখে এবং টাইপ-১ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সম্ভাবনাকে কম রাখে।

এছাড়া অন্যান্য পুষ্টি :

নিরামিষ খাবার যেমনঃ মাশরুম আমাদের শরীরে ভিটামিন ডি  ও ভিটামিন বি সরবরাহ করে। ভিটামিন “ডি”- এর কয়েকটি খাদ্য উৎসের একটি হলো মাশরুম। এতে বর্তমান প্রোটিন এবং নিউট্রিয়েন্টস আমাদের শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলে।মাশরুম নিরামিষাশীদের জন্য খুবই ভালো একটি খাবার। কারণ এটি প্রোটিন, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি, কপার, সেলেনিয়ামের একটি ভালো উৎস। ভিটামিন বি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তারা খাদ্যকে আমাদের দেহের জন্য জ্বালানিরূপে রূপান্তর করে, শক্তি সরবরাহ করে। ভিটামিন ডি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তারা আমাদের দেহকে ক্যালসিয়াম শোষণ ও হাড়ের বৃদ্ধিকে উন্নীত করতে সহায়তা করে।

নিরামিষ খাবার যেমনঃ পনির আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। এতে প্রোটিন, ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম ইত্যাদি বর্তমান।

নিরামিষ খাবারের উপকারিতা বলে শেষ করা যাবে না। প্রতিদিন সঠিক পরিমানে নিরামিষ খাবার আমাদের শরীরকে অনেক বেশি পরিমানে কর্মক্ষম রাখতে সাহায্য করে।

আমিষ জাতীয় খাবার সম্পর্কে জানতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন।

Share