লুচি দেখলেই জিভে জল আসা খাবারটি এখনও বাঙালির রসনার স্বাদ বাড়িয়ে চলেছে।

রাস্তায় ছোলা মাখা, ফুচকা, ন্যুডলস বা চাউমিন নিয়ে বাঙালি যতই নাচানাচি করুক না কেন, লুচি এখনও বাঙালির পারিবারিক জীবনের অঙ্গ। ছুটির দিনে জলখাবারে বা উৎসবের রাতে লুচি দেখলে বাঙালির রসনা-সুখ বৃদ্ধি পায়।

শীতের দিনে লুচি আর আলু ফুলকপির তরকারি বা অন্য দিনে মাখোমাখো আলুর দমের সঙ্গে লুচি। আহা প্রাণটা  একেবারে জুড়িয়ে যায়।

ঈশ্বর গুপ্ত থেকে ভারতচন্দ্র, হেমচন্দ্র থেকে রমেশচন্দ্র, সুকুমার রায়, তস্যপুত্র সত্যজিৎ বা ঠাকুর পরিবারের রবীন্দ্রনাথ থেকে অবনীন্দ্রনাথ সবাই লুচি বলতে অজ্ঞান। অনেকেই খাতায় কলমেও লুচির গুণকীর্তন করে গেছেন। ঈশ্বরচন্দ্র- গুপ্ত নয় বিদ্যাসাগর, সরস্বতী বন্দনা করতে গিয়ে লিখেছেন,

‘লুচি কচুরি মতিচুর শোভিতং
জিলেবি সন্দেশ গজা বিরাজিতং
যস্যা প্রসাদেন ফলার মাপ্লমঃ
সরস্বতী মা জয়তান্নিরন্তম।’

লুচি কিন্তু দেশজ বা বাংলার প্রাকৃত শব্দ নয়। কোনো সংস্কৃত প্রাচীন কাব্যে লুচি, লুচিকা বা কাছাকাছি কোনো শব্দরূপের সন্ধান পাওয়া যায়নি। অনেকের মতে ‘লুচি’ সংস্কৃত শব্দ প্রসূত নয়। বেদ, পুরাণ, রামায়ন-মহাভারত বা আয়ুর্বেদীয় গ্রন্থে লুচির কোনো নামগন্ধ নেই।

লুচি সম্ভবতঃ হিন্দি শব্দ। হিন্দিতে পিচ্ছিল বোঝাতে ‘লুচ’ বা ‘লুচলুচিয়া’ শব্দ ব্যবহার হয়। ঘিয়ে ভাজা লুচি হাতে ধরলে পিছলে পড়ে বলে ‘লুচি’ নামকরণ। দু-একজনের মতে লুচি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘লোচক’ শব্দ থেকে। লোচক মানে চোখের তারা। চোখের তারার মত গোলাকার বলে এমন নাম।

শুনেছি কমলকুমার মজুমদার শ্বশ্রূমাতার চমৎকার লুচিভাজা দেখে ও স্বাদ গ্রহণ করে তস্য কন্যা দয়াময়ী দেবীকে বিবাহ করে ফেলেন।

luchimangso

সত্যজিৎ রায়ের ‘চারুলতা’ ছবিতে ভূপতির খাওয়ার দৃশ্যটা মনে আছে? সন্ধেবেলায় আসন পেতে বসে ভূপতি খাচ্ছেন। চারু পাখা হাতে সামনে বসে। ভূপতি গত শতকের কলকাতার নব্য বাবু সমাজের প্রতিনিধি। তিন আঙুলের ডগা দিয়ে শুভ্র লুচি ছিঁড়ে মাংসের বাটি থেকে মাংস দিয়ে খাচ্ছেন।

এ কথা সবাই জানেন, সামাজিক ও পারিবারিক অবস্থান, রুচি ইত্যাদি বোঝাতে সিনেমায় খাওয়া দেখানোটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু খাবারের থালায় লুচি আর খাবারের ভঙ্গি দেখিয়ে সত্যজিৎ খুব সহজেই ভূপতির চরিত্রের একটা দিক তুলে ধরেছিলেন।

আজ থেকে শতখানেক বছর আগেও লুচি অর্থাৎ ‘সুধারুচি মুচমুচি লুচি’ ছিল উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত বাঙালির প্রিয় এবং একমাত্র জলখাবারের মেনু। সকালে, বিকেলে এবং অবশ্যই সন্ধ্যাকালে। রসিকেরা লুচি খেয়ে কীর্তনের গান ধরতেন,

‘ওগো লুচি নন্দিনী ঘৃতে ভর্জিনি, প্রেয়সী মহিষী প্রিয়ে।
এমো চক্রাকারে বদন মাঝারে জুড়াই তাপিত হিয়ে।’

লুচির উপকারিতা বা স্বাস্থ্যসুবিধা:

আমরা জানি, লুচি তৈরি হয় পুরো শস্য বা Whole Grain নামে পরিচিত গম বা ময়দা থেকে। গমে কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন, খনিজ ও ফাইবার রয়েছে। সাথে তেল বা ঘি।

পুরো শস্য কি?

শস্য হল ঘাসের মতো উদ্ভিদের বীজ যাকে সিরিয়াল বলে। বেশ কয়েকটি প্রচলিত জাতগুলি হল ভুট্টা, চাল এবং গম।

পুরো-শস্য কার্নেলের তিনটি অংশ রয়েছে :

ব্রান: এই শক্ত, বাহ্যিকখোল। এটিতে ফাইবার, খনিজ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এন্ডোস্পার্ম: মাঝের স্তর। দানা বেশিরভাগ কার্বস দিয়ে তৈরি। জার্ম: এই অভ্যন্তরীণ স্তরে ভিটামিন, খনিজ, প্রোটিন এবং উদ্ভিদ যৌগ রয়েছে।

দ্রুত শক্তি যোগায়:

লুচির বা গমের কার্বোহাইড্রেট দ্রুত শক্তি যোগায় এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। পরিশোধিত গমে বা ময়দায় অর্থাৎ ব্রান বা খোসা ফেলে দেওয়া হয় বলে ফাইবার কম থাকলেও এন্ডোস্পার্ম বা মাঝেরস্তর সর্বদা অটুট থাকে।

গম মূলত শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট দিয়ে গঠিত তবে এতে মাঝারি পরিমাণে প্রোটিন রয়েছে। ১০০grams গমে প্রায় ৭৬g কার্বোহাইড্রেট রয়েছে।

কোষ্টকাঠিন্য দূর করে:

পুরো শস্য বা গম থেকে তৈরি আটা বা ময়দায় ফাইবার রয়েছে। তাই লুচি কোষ্টকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে।

ওজন কমায় :

কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফাইবার। পেট ভরিয়ে রাখে। ক্ষুধা কমায়। ওজন কমাতে সাহায্য করে।

হজম ঠিক রাখে:

লুচি দেখলেই মুখের স্বাদগ্রন্থি থেকে লালারস নিঃসৃত হতে থাকে। আর পেতে পড়লে পাকস্থলীর পাচক রস। কার্বোহাইড্রেট ও ফাইবার সমৃদ্ধ গম বা এটা আমাদের হজম ব্যবস্থা ঠিকঠাক রাখে।

রুচি বাড়ায়:

লুচি জাদুকর একটি খাবার । রুটি খেতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু লুচি দেখলে জিভে জল চলে আসে। পুরো শস্য বা গমের উপকারিতা আমরা জানি এবং এটি অনেক সুস্বাদু।

ময়দা মেখে, লুচি গড়ে বেলে কড়াইতে ঘি ঢেলে ভেজে তুলে দিলে লুচি বা লোচিকা হবে। বিশেষ লুচির ক্ষেত্রে তিনি জানাচ্ছেন, দই দিয়ে মাখা ময়দা ভিজে কাপড়ে ৭/৮ ঘন্টার মতো রেখে দিলে, পরে সেই ময়দা-মাখা লুচি ‘মোচক’ অর্থাৎ রসনার তৃপ্তি বৃদ্ধি করে।

আমরাও ছোটবেলায় দেখেছি লুচি করার সময় মা-ঠাকুমারা জলের পরিবর্তে শুধু দুধ দিয়ে ময়দা মাখতেন। তাতে নাকি লুচি নরম হয় আর চার-পাঁচ দিনেও নষ্ট হয় না।

তবে যেভাবেই রান্না হোক লুচি হবে পূর্ণিমার চাঁদের মতো গোল ধবধবে সাদা আর নিখুঁত। লুচিতে দাগ থাকা আর চরিত্রে দাগ সেকালে একইরকম দোষের মানা হতো। এখন তো সব ‘নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি’। সেকালে লুচিতে দাগ থাকলে শাশুড়ি-ননদের কাছে গঞ্জনার শেষ থাকত না বাড়ির বউমাদের। তখনকার লুচি তৈরির ব্যাপারটাই ছিল অন্যরকম।

লুচি বেলার জন্য আলাদা কাঠ বা মার্বেলের চাকি-বেলুন রাখা থাকত রান্নাঘরের এক কোনে সযত্নে। সাধারণত লুচি হতো পাতলা, তিন-চার ইঞ্চি ব্যাসের আর ফুলকো। কলকাতার বাইরে লুচির আকারে ভিন্নতা দেখা যেত। মুর্শিদাবাদের কোনো কোনো অঞ্চলে লুচি হতো পদ্মপাতার মতো বড়। পুজোয় ঠাকুরের প্রসাদী লুচি মোটা এবং প্রায় আঠারো ইঞ্চি ব্যাসের মতো বৃহদাকার। কথায় ছিলো পুজোয় লুচি-মণ্ডা।

মুর্শিদাবাদ ছাড়াও বাংলাদেশের কান্তনগরের লুচিও বেশ বড় মাপের হতো। কান্তনগন হলো দিনাজপুর শহর থেকে ১২ মাইল উত্তরে। নদী পার হয়ে যে জায়গায় মন্দিরটি স্থাপিত, সেটা একটা গ্রাম। ওই ঠাকুরবাড়িতে প্রতিদিন সকালে বাল্যভোগ, দুপুরে অন্নভোগ এবং সন্ধায় আরতি আর পুজোপার্বণ আগেও হতো, আজও হয়। তবে কান্তনগরের ঠাকুরবাড়িতে ওই ‘বগি’ থালার মতো বড় লুচি হতো না। সেটা হতো দিনাজপুরের রাজবাড়িতে।

দুর্গাপুজোর কদিন আগে কান্তজিকে নদীপথে দিনাজপুরে এনে ধুমধামের সঙ্গে কাঞ্চন নদীর ঘাট থেকে প্রায় তিন মাইল পূর্বে রাজবাড়িতে নেয়া হতো। এবং আজও হয়। ওই রাজবাড়িতে কান্তজির পুজোপার্বণ চলে রাসপূর্ণিমার আগে পর্যন্ত ওই সময়টাতে রাজবাড়িতে কান্তজির ভোগ হিসেবে প্রতিদিন ওই লুচি তৈরি এবং বিক্রি হতো। এই লুচির বিশেষত্ব এই যে, লুচি না ভাঙলে ফোলা অবস্থায় থেকে যেত। মাটির সরা বা পাতলা বাঁশের পাতার খাঁচায় করে ওই লু্চি এপার বাংলাতেও এসেছে।

তবে দুঃখের কথা আর কী বলব, আগে লুচি ভাজা হতো শুধুই গাওয়া ঘি দিয়ে, পরে এলো ভঁয়সা ঘি, খুরজা, লক্ষ্মী, শ্রী ঘি। কালে কালে ডালডা, পামতেল, বাদাম তেল হয়ে এখন সয়াবিন তেলে ঠেকেছে। একে কি আর লুচি বলে? বলতে হয় অ-লুচি।

সতর্কতাঃ

মধ্যস্ততাই সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি অর্থাৎ পরিমিত পরিমানে খাওয়া সুস্থ্যতার চাবিকাঠি। কোনো কিছু মোটেও খাবো না সেটা যেমন ঠিক নয় আবার কোনো কিছু অতিরিক্ত পরিমানে খাবো সেটাও ঠিক নয়।

যা কিছু খাবেন পরিমাণমতো খাবেন। আপনার শরীরের অবস্থা বুঝে খাবেন। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়। আপনি যদি কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত হন বা নিয়মিত কোনো ওষুধ সেবন করে থাকেন তাহলে আপনার ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া খাবেন না।

Share