ত্বকের বয়স ধরে রাখে কোলাজেন। ভাবছেন কোথায় পাবেন বা কি কি খাবেন?

শীতের শুস্কতা আর স্ট্রেসে মুখের সুক্ষ্ণ রেখাগুলি বড়ো হয়ে মুখে ছোট ছোট কালো স্পট ফুটে উঠেছে। এদিকে ক্যাফেইন এবং চিনি খাওয়াও একটু বেশি হয়ে গেছে। ফলে কালো স্পটের পাশাপাশি মুখে ব্রণও ফুটে উঠেছে।

তাদের বয়স হবে হয়তো ৩০ কিন্তু তাদের বয়সের  তুলনায় অনেক বেশি বয়স্ক দেখাচ্ছে। মনটা খুব খারাপ। আয়নার সামনে দাঁড়াতে ভয় পায়। ভুলে গেছে শেষ কবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছে। ত্বকের এই বুড়িয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী কোলাজেনের অভাব।

কোলাজেন ডায়েট শব্দটির সাথে আমরা অনেকেই হয়তো পরিচিত নই। বর্তমান ডায়েট ট্রেন্ডে বিশেষ ভাবে আলোচনা হচ্ছে কোলাজেন শব্দটি নিয়ে।

আমাদের ত্বকের বুড়িয়ে যাওয়া রোধ করে, দীর্ঘদিন তারুণ্য ধরে রাখাই কোলাজেনের কাজ।

বিউটি এক্সপার্টরা ত্বকের সজীবতা ধরে রাখতে কোলাজেন সমৃদ্ধ ক্রিম ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তবে ক্রিমের সমাধান সাময়িক, যদি দীর্ঘ সময় ত্বকের তারুণ্য পেতে চান তবে নজর দিন প্রতিদিনের খাবারে।

কোলাজেন কি?

কোলাজেন আপনার দেহের একটি প্রোটিন। কোলাজেন একটি শক্ত, অদ্রবণীয় এবং তন্তুযুক্ত প্রোটিন যা মানবদেহের প্রোটিনের এক তৃতীয়াংশ। এটি হাড়, ত্বক, পেশী, টেন্ডন এবং লিগামেন্টগুলির অন্যতম প্রধান বিল্ডিং ব্লক।

কোলাজেন রক্তনালী, কর্নিয়া এবং দাঁত সহ শরীরের অন্যান্য অনেক অংশেও পাওয়া যায়। তারা ত্বককে শক্তি এবং স্থিতিস্থাপকতা দেয়। বেশিরভাগ কোলাজেন অণুগুলি দীর্ঘ পাতলা ফাইব্রিলগুলি গঠনের জন্য একত্র হয়ে থাকে। এগুলি একে অপরের সমর্থনকারী কাঠামো এবং অ্যাঙ্কর সেল হিসাবে কাজ করে।

আপনি এটিকে “আঠালো” হিসাবে ভাবতে পারেন যা সমস্ত জিনিসকে একত্রে ধারণ করে। আসলে, শব্দটি গ্রীক শব্দ “কোলা” থেকে এসেছে, যার অর্থ আঠালো।

মানবদেহের সর্বাধিক প্রচুর প্রোটিন হল কোলজেন যা হাড়, পেশী, ত্বক এবং কমনগুলিতে পাওয়া যায়। এটি এমন পদার্থ যা শরীরকে একসাথে ধারণ করে। কোলাজেন শক্তি এবং কাঠামো সরবরাহ করার জন্য একটি স্ক্যাফোল্ড গঠন করে।

এন্ডোজেনাস কোলাজেন হল প্রাকৃতিক কোলাজেন, শরীর দ্বারা সংশ্লেষিত। এক্সোজেনাস কোলাজেন সিন্থেটিক।

এন্ডোজেনাস কোলাজেনের অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। এক্সোজেনাস কোলাজেন শরীরের টিস্যুগুলির মেরামত সহ চিকিৎসা এবং প্রসাধনী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, এটি পুষ্টির পরিপূরক এবং শ্যাম্পু এবং বডি লোশনগুলির উপাদান হিসাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

কীভাবে কোলাজেন প্রাকৃতিকভাবে বৃদ্ধি করবেন?

আপনার শরীর যখন কোলাজেন তৈরি করে, তখন এটি অ্যামিনো অ্যাসিডগুলির সংমিশ্রণ করে। অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি করতে আপনার লাগবে প্রোটিন রিচ খাবার।

প্রোটিন পুষ্টি আপনি প্রোটিন সমৃদ্ধ  খাবার যেমন: গরু, খাসি, ভেড়া শুকর, হরিণ, উট, দুম্বার মাংস, মুরগী, মাছ, মটরশুটি, ডিম এবং দুগ্ধজাত খাবারগুলি থেকে পাবেন। প্রক্রিয়াটিতে ভিটামিন সি, দস্তা এবং কপারও প্রয়োজন।

সাইট্রাস ফল, লাল এবং সবুজ মরিচ, টমেটো, পাতাকপি এবং সবুজ শাকসব্জী খেয়ে আপনি ভিটামিন সি পেতে পারেন।

কোলাজেন উৎপাদন বাড়ায় এমন পুষ্টি উপাদান:

সমস্ত কোলাজেন প্রোকোলাজেন হিসাবে শুরু হয়। আপনার শরীর দুটি অ্যামিনো অ্যাসিড – গ্লাইসিন এবং প্রোলিন একত্রিত করে প্রোকোলজেন তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াতে ভিটামিন সি ব্যবহার করা হয়।

আপনি নিম্নলিখিত পুষ্টিগুণ প্রচুর পরিমাণে পেয়েছেন তা নিশ্চিত করে আপনি আপনার শরীরকে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন তৈরি করতে সহায়তা করতে পারবেন:

ভিটামিন সি:

বড় বা বেশি পরিমাণে সাইট্রাস ফল, টমেটো, কাঁচামরিচ, ক্যাপসিকাম, চালতা, কাঁচা আম, আমলকি, আমড়া, পেয়ারা সহ অনেক ফলে পাওয়া যায়।

প্রলিন:

ডিমের সাদা অংশ, দুগ্ধজাত পণ্য, সবুজ সবজি যেমন: বাঁধাকপি, ব্রকলি, অ্যাস্পারাগাস এবং মাশরুম, বাঁশকোড়ল, সামুদ্রিক শেওলা, পাটশাক, পালংশাকে প্রোলিন প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।

গ্লাইসিন:

শুকরের মাংসের ত্বক, মুরগির ত্বক এবং জেলটিনে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। সবচেয়ে বেশি গ্লাইসিন পাওয়া যায় জেলাটিন, হাড়ের ব্রথ বা স্টক, মুরগি, হাঁস বা টার্কির চামড়ায়। এ ছাড়া অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারেও গ্লাইসিন পাওয়া যায়।

কপার:

পাতাওয়ালা সবুজ শাকসবজি, অরগ্যান মিট যেমনঃ কলিজা, বাদাম এবং বীজ, কোকো পাউডার, ডার্ক চকলেট, সেলফিশ যেমন: ঝিনুক, কাঁকড়া এবং মসুরের ডালে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।

আপনার দেহে উচ্চমানের প্রোটিন থাকা দরকার যাতে নতুন প্রোটিন তৈরি করতে প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড রয়েছে।

এসব খাবারের সঙ্গে খাদ্যতালিকায় আরও যুক্ত করতে হবে  সামুদ্রিক মাছ, গাঢ় সবুজ শাক, ট্রপিক্যাল ফল, যেমন: পেঁপে, পেয়ারা, লিচু, নারকেল, কাঁঠাল, আম, কদবেল, ড্রাগন ফল, আনারস, চালতা, জাম, বরই, রসুন, ধনেপাতা, অ্যাভোকেডো, টফু, অ্যালোভেরা ইত্যাদি। আর অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে প্রক্রিয়াজাত শর্করা এবং অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার।

কোলাজেন উৎপাদন করতে সাহায্যকারী চারটি পুষ্টি হ’ল ভিটামিন সি, প্রলিন, গ্লাইসিন এবং তামা। এছাড়াও, উচ্চ মানের প্রোটিন খাওয়া আপনার শরীরকে প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড দেয়।

কোলাজেনের জন্য কোন খাবারগুলি খারাপ?

হট ডগ, পেপারোনি, বেকন এবং সসেজ হল প্রক্রিয়াজাত মাংসের উদাহরণ যা ত্বকের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। ফার্স্ট ফুড সহ অন্য যেসকল খাবার গুলোতে বা মাংসগুলিতে সোডিয়াম, স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং সালফাইট বেশি থাকে, এই সমস্ত খাবার ত্বককে হাইডাইড্রেট করতে পারে এবং প্রদাহ সৃষ্টি করে কোলাজেনকে দুর্বল করতে পারে।

ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখতে কোলাজেনের কোনো বিকল্প নেই।

দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার দেশ, যেমন: জাপান, কোরিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি দেশের মানুষের তারুণ্যোজ্জ্বল ত্বকের অন্যতম রহস্য কোলাজেন ডায়েট। তাঁরা দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় এমন খাবার রাখে, যা শরীরে কোলাজেন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এ জন্যই অন্যান্য দেশের তুলনায় এসব দেশের নাগরিকদের তাদের বয়সের চেয়ে অনেক বেশি তরুণ দেখায়।

কয়েক বছর ধরে এসব দেশের বিউটি ক্রেজে পরিণত হয়েছে ‘কোলাজেন হটপট’। হটপট একধরনের চাইনিজ রান্নাপদ্ধতি যেখানে, খাবারের টেবিলের ওপর চুলার ব্যবস্থা করে অনেক ধরনের জিনিস মিশিয়ে সুপ বা স্টু তৈরি করা হয়।

চীন, জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, হংকং—সবখানেই অনেক বিশেষায়িত হটপট রেস্টুরেন্ট আছে। এ রকম কিছু রেস্টুরেন্ট আছে, যাদের মেনুতে পাওয়া যায় কোলাজেন হটপট।

কোলাজেনসমৃদ্ধ বা এটি বাড়াতে সহায়তা করে—এমন খাদ্য উপাদান দিয়েই এই হটপট বানানো হয়। সৌন্দর্যসচেতন তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি খুবই জনপ্রিয়। এদের দেখাদেখি পশ্চিমা বিশ্বের অনেক দেশে কোলাজেন প্রোডাক্ট আর সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের পাশাপাশি এটিকে ডায়েটের অংশ করার প্রবণতা বাড়ছে।

সতর্কতাঃ

যা কিছু খাবেন পরিমাণমতো খাবেন। আপনার শরীরের অবস্থা বুঝে খাবেন। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নোই। আপনি যদি কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত হন বা নিয়মিত কোনো চিকিৎসকের তত্বাবধানে থেকে কোনো ওষুধ গ্রহণ করলে খাওয়ার আগে অবশ্যই আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবেন।

সূত্রঃ

MedicalNewsToday, webmd

Share