উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কি কি খাবার খাবেন এবং কি কি নিয়ম মেনে চলবেন।

উচ্চ রক্তচাপ মানে রক্তচাপ যেটা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনের আরেক নাম নীরব ঘাতক বা সাইলেন্ট কিলার।উচ্চ রক্তচাপকে “নীরব ঘাতক” বলা হয় কারণ এটিতে সাধারণত কোনও সতর্কতা লক্ষণ থাকে না এবং অনেক লোক জানেন না যে, তারা এটিতে ভুগছেন।

স্থূলতা, অতিরিক্ত চিন্তা ও টেনশন করা অর্থাৎ মানসিক চাপ, অনিয়মিত খাবারদাবার এবং ব্যায়ামের অভ্যাস না থাকার কারণে এই সমস্যাগুলো হয়ে থাকে।

আপনার উচ্চ রক্তচাপ আছে কিনা তা জানার জন্য ডাক্তার বা অন্য কোনও স্বাস্থ্য পেশাদারের সাথে যোগাযোগ করুন। রক্তচাপ পরিমাপ করতে খুব অল্প সময় লাগে এবং এটি ব্যথাহীন।

উচ্চ রক্তচাপকে 140/90 মিমিএইচজি বা উচ্চতর (বা আপনার বয়স 80 বছরের বেশি হলে 150 / 90mmHg বা উচ্চতর) হিসাবে বিবেচনা করা হয়। আদর্শ রক্তচাপ সাধারণত 90 / 60mmHg এবং 120 / 80mmHg এর মধ্যে বলে মনে করা হয়।

উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সবথেকে কার্যকরী কিছু খাবারের আলোচনা করা হলো:

উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন এখন ঘরোয়া রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওবেসিটি বা অতিরিক্ত ওজন, স্ট্রেস, অনিয়মিত ডায়েট এবং কম ওয়ার্কআউট, সবকটিই উচ্চরক্তচাপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

কলা (banana), বীট:

আসলে কলাতে যে উচ্চ পরিমানে পটাসিয়াম রয়েছে এবং কলা উচ্চ রক্তচাপ কমায় এটা গবেষণায় প্রমাণিত এবং এটা অনেক বেশি আলোচিত এবং আমরা অনেকেই এই বিষয়ে জানি।তাই উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা কলাকে প্রতিদিনের সঙ্গী করে নিন।

মাটির তলার সবজির মধ্যে বীট সবজিটি খুবই আলোচিত এর উচ্চ পটাসিয়াম ও নাইট্রেট যৌগের জন্য। পটাসিয়াম তো উচ্চ রক্তচাপ কমায় এদিকে নাইট্রেট নাইট্রিক অক্সাইডে রূপান্তরিত হয়ে রক্তনালীগুলি খুলে দেয় অর্থাৎ রক্তনালীগুলি প্রশস্ত ও শিথিল করে।

আঙ্গুর:

এই বাঙালি জনপদে আপনি আঙুরের বাগান না দেখতে পেলেও হাটে-বাজারে, রাস্তা-ঘাটে, অলিতে-গলিতে স্থায়ী-অস্থায়ী ফলের দোকানে থোকায় থোকায় আঙ্গুর সাজানো দেখতে পাবেন। এক কাপ আঙ্গুরের(১৫০gm) মধ্যে ২৮৮ মিলিগ্রাম পটাসিয়াম থাকে। পটাসিয়াম ও ফসফরাসে পূর্ণ আঙ্গুর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভালো কাজ করে।

পেঁয়াজ, রসুন:

পেঁয়াজ ও রসুনে থাকা এডিনোসিন, এলিসিন ইত্যাদি যৌগগুলো রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে দারুন কাজ করে।

তরমুজ, বেদনা, cinnamon:

তরমুজে থাকা পটাসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। এছাড়া তরমুজে আরেকটি গুরত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে, সেটা হলো সিট্রুলিন (citrulline)। সিট্রুলিনের একটি চমৎকার উৎস তরমুজ। সিট্রুলিন আমাদের দেহে অর্জিনিনে (arginine) রূপান্তরিত হয়। এই উভয় অ্যামিনো অ্যাসিডই নাইট্রিক অক্সাইড উৎপাদন করতে সহায়তা করে। নাইট্রিক অক্সাইড হল একটি গ্যাস অণু যা আমাদের রক্তনালীগুলির চারপাশের ক্ষুদ্র পেশীগুলি শিথিল করে এবং বিচ্ছিন্ন করে তোলে। এটি রক্তচাপ হ্রাস করতে পারে।

ডাবের জল:

মিনারেলস-এ ভরপুর। তাই রক্তচাপ কমায়।

পাতিলেবু, সাইট্রাস ফ্রুইটস:

জাম্বুরা, কমলা এবং লেবু সহ সাইট্রাস ফলগুলির শক্তিশালী রক্তচাপ-হ্রাস করার ক্ষমতা রয়েছে। এগুলিতে ভিটামিন, খনিজ এবং উদ্ভিদ যৌগগুলি বোঝাই হয়ে থাকে যা উচ্চ রক্তচাপের মতো হৃদরোগের ঝুঁকির কারণগুলিকে হ্রাস করে আপনার হৃদয়কে সুস্থ রাখতে সহায়তা করতে পারে।

১০১ জন জাপানি মহিলার সাথে জড়িত একটি পাঁচ মাসের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রতিদিনের লেবুর রস খাওয়ার সাথে মিলিতভাবে এসবিপি-র হ্রাসের সাথে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্পর্কযুক্ত।

পাতাযুক্ত সবুজ শাকসবজি:

ভিটামিন ও মিনারেলস এ ভরপুর সবুজ-শাকসবজি রক্তচাপ কমায়।

টমেটো:

টমেটো এবং টমেটো পণ্যগুলি পটাসিয়াম এবং ক্যারোটিনয়েড পিগমেন্ট লাইকোপেন সহ অনেক পুষ্টিতে সমৃদ্ধ।লাইকোপিন হৃদরোগের স্বাস্থ্যের জন্য খুব উপকারী। টমেটো পণ্যগুলি উচ্চ রক্তচাপের মতো হৃদরোগের ঝুঁকির কারণগুলি হ্রাস করতে সহায়তা করে।

২১ টি সমীক্ষার পর্যালোচনা থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, টমেটো এবং টমেটো পণ্য গ্রহণ রক্তচাপকে উন্নতি করে এবং আপনার হৃদরোগ এবং হৃদরোগ-সম্পর্কিত মৃত্যুর ঝুঁকি হ্রাস করতে সহায়তা করে।

whole grain বা পুরো শস্যে:

আঁশযুক্ত খাবার বেশি খান। এগুলো রক্তে কোলেস্টেরলও কমায়। দ্রবণীয় আঁশ পরিপাক নালি থেকে স্পঞ্জের মতো কোলেস্টেরল শুষে নেয়।পুরো গম এবং পুরো ভুট্টা, বাদামি চাল এবং কুইনো সহ ওটমিল, ভুট্টার খই, বাজরা, বাদামী ভাত, পুরো রাই, বন্য ধান, গমের বেরি, বুলগুর, বেকউইট, freekeh, বার্লি পুরো শস্যের অন্তর্গত।

এছাড়া লেন্টিল অর্থাৎ ডাল এন্ড bean বা শিম, seeds বা বীজ এগুলো উচ্চ ফাইবার সমৃদ্ধ। যেহেতু ফাইবার ও মিনারেলস সমৃদ্ধ তাই উচ্চ রক্তচাপ কমায়।

Berries অর্থাৎ বেরি জাতীয় ফল:

স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, রাস্পবেরি, চকবেরি, ক্লাউডবেরি এমন কয়েকটি বেরি যা রক্তচাপ-হ্রাসের প্রভাবগুলির সাথে যুক্ত। উচ্চ রক্তচাপের মতো হৃদরোগের ঝুঁকির কারণগুলি হ্রাস করার সম্ভাব্যতা সহ বেরি বিভিন্ন ধরণের চিত্তাকর্ষক স্বাস্থ্য বেনিফিটের সাথে যুক্ত। বেরি গোত্রের ফলগুলি হল অ্যান্টোসায়ানিন সহ অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলির একটি সমৃদ্ধ উৎস। অ্যান্থোসায়ানিনগুলি রক্তে নাইট্রিক অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি যা রক্তচাপের মাত্রা হ্রাস করতে সহায়তা করতে পারে।

ফার্মেন্টেড ফুডস, ন্যাচারাল youghurt:

এগুলোতে থাকে অন্ত্রবান্ধব ব্যাকটেরিয়া, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়ামসহ আরো অনেক মিনারেলস। রক্তচাপ কমাতে দারুন কার্যকর।

pistachois অর্থাৎ পেস্তা বাদাম:

পিস্তা বাদাম অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং তাদের সেবন স্বাস্থ্যকর রক্তচাপ বজায় রাখতে খুবই কার্যকরী। এগুলির মধ্যে পটাসিয়াম সহ হার্টের স্বাস্থ্য এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুলি ভালো পরিমানে রয়েছে।

21 টি সমীক্ষার একটি পর্যালোচনাতে দেখা গেছে যে, পর্যালোচনাতে অন্তর্ভুক্ত সমস্ত বাদামের মধ্যে, পিস্তু খাওয়ার এসবিপি এবং ডিবিপি উভয় হ্রাস করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাব ছিল।

salmon এন্ড other fatty fish:

ফ্যাটি ফিশগুলি ওমেগা 3 ফ্যাটগুলির একটি দুর্দান্ত উৎস। যা হৃদরোগের উল্লেখযোগ্য লাভ করে। এই ফ্যাটগুলি প্রদাহ হ্রাস এবং অক্সিলিপিনস নামক রক্তনালী-সংকোচনের যৌগগুলির মাত্রা হ্রাস করে রক্তচাপের মাত্রা হ্রাস করতে সহায়তা করতে পারে।

ডার্ক চকোলেট খান, যা ধমনিকে আরো স্থিতিস্থাপক করে।

আপনি এই খাবারগুলি খেলে আপনার উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাবে বিষয়টি তেমন নয়। খাবারগুলো খাওয়ার পাশাপাশি আপনাকে কায়িক পরিশ্রম ও ব্যায়াম করতে হবে। আপনি খাবারগুলি খেলেন, ব্যায়াম করলেন, এরপর আপনাকে কিছু খাবার সতর্কতার সাথে খেতে হবে এবং কিছু বদঅভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।

লাল মাংস অর্থাৎ চর্বিযুক্ত মাংস, ফার্স্ট ফুড, প্রিজারভড ফুড, প্যাকেটজাত খাবার, কোমল পানীয় ইত্যাদি খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক হন। এগুলোতে সোডিয়াম বা লবন ও চিনি বেশি থাকে।

খাবারে লবণ কমান। উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে কাঁচা লবণ খাওয়া যাবে না। আর রান্নাতেও যতটা সম্ভব লবণ কম দিন।

আপনি যে পরিমাণ অ্যালকোহল পান করেন তা সীমাবদ্ধ করুন।ধুমপান ত্যাগ করুন।

ক্যাফেইন (চা, কফি) গ্রহণ সীমিত করুন।

সতর্কতাঃ

যা কিছু খাবেন পরিমাণমতো খাবেন। আপনার শরীরের অবস্থা বুঝে খাবেন। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়। আপনি যদি কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত হন বা নিয়মিত কোনো ডাক্তারের তত্বাবধানে থেকে কোনো ওষুধ গ্রহণ করলে খাওয়ার আগে অবশ্যই আপনার ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী খাবেন।

সূত্রঃ

হেলথলাইন

Share