লাল শুকনো মরিচ বা লাল মরিচ রক্তচাপ কমায়, ব্যথা কমায় ও শরীর ঠান্ডা রাখে।

লাল মরিচ বা শুকনো মরিচের এতো সুন্দর তীব্র গন্ধ ও স্বাদ কে দেয় বা কোথা থেকে আসে? লাল টুকটুকে বৌয়ের ভেতর বসবাস করে ক্যাপসাইসিন নামক লাল পরী। হা বন্ধুরা, Capsaicin(ক্যাপসাইসিন) নামের যৌগটি লাল মরিচের স্বাদ এবং স্বাস্থ্যগত সুবিধার জন্য দায়ী। লাল মরিচ বা শুকনো মরিচ ছাড়া বাংলাদেশ, ভারত তথা এশিয়া উপমহাদেশের রান্না কল্পনা করা অসম্ভব।পাউডার আকারে বা আস্ত লাল শুকনো মরিচ পাটায় বেটে পুরো দেশ এটি কোনও না কোনও আকারে ব্যবহার করে।

বিশ্বজুড়ে খাবারের প্রতি আকর্ষণ ও স্বাদ বাড়ানোর জন্য শুকনো মরিচ বা লাল মরিচ বা chili pepper ব্যবহার করা হয়। মুখে অগ্নিসম জ্বালাময়ী তাপ সহ্য করেই আমরা এর সুন্দর গন্ধ ও স্বাদের কাছে নতি স্বীকার করেছি। এটি সারা বছর জুড়েই পাওয়া যায়।যতই কাঁচা মরিচ দেওয়া হোক না কেন, শুকনো মরিচ ছাড়া রান্নায় যেন ঠিক সেই স্বাদটা, রংটা আসে না।

Solanaceae-পরিবারের সদস্য এই শুকনো মরিচ বা Red chili pepper. Capsicum জেনাসের এই ফলটির আদি নিবাস মেক্সিকো। বিখ্যাত নাবিক কালোম্বাসের হাত ধরে এটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।শুকনো মরিচ বা লাল মরিচের যৌগগুলি ক্যাপসাইকিনয়েডস হিসাবে পরিচিত।

শুকনা মরিচ ও কাঁচা মরিচের কার্যকারিতা প্রায় এক হলেও কাঁচা মরিচ ও শুকনা মরিচ এর গুনাগুনের কিছু তফাৎ লক্ষ্য করা যায়। লাল মরিচে কাঁচা মরিচের চেয়ে বেশি ভিটামিন ”এ” ও ”সি” থাকে। তাই নিয়মিত এই মরিচ খেলে শরীরে ভিটামিন-সি এর অভাব দূর করে।এটি এমন উদ্ভিদ যা আপনার জিহ্বায় আগুন দেয় এবং আপনি যখন মশলাদার মেক্সিকান, শেচুয়ান, ভারতীয় বা বিখ্যাত থাই খাবার খেতে যাবেন তখন আপনার চোখের জলও কথা বলবে।

শুকনো মরিচ বা লাল মরিচ খেলে কি পেটে আলসার হয়?

না শুকনো মরিচ বা লাল মরিচ খেলে পেটে আলসার হয় না। অতিরিক্ত পরিমাণে লাল মরিচ বা শুকনো মরিচ খাওয়ার ফলে অভ্যন্তরীণ প্রদাহ হতে পারে যার ফলস্বরূপ পেপটিক আলসার হতে পারে। তাই আপনার শরীরের অবস্থা বুঝে পরিমাণমতো খাবেন। এছাড়া লাল মরিচ সংরক্ষণের জন্য বা শুকনো মরিচের গুঁড়োয় ব্যবহার করা কৃত্রিম রঙ এবং সিন্থেটিক রঙের ফলে আমাদের অন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে। আপনার যদি আগে থেকে কোনো কারণে পাকস্থলীর সমস্যা থাকে বা আলসারের ক্ষত থাকে তাহলেও শুকনো মরিচের গুঁড়া অর্থাৎ মসলা জাতীয় খাবার খেতে নিষেধ করা হয়।

 শুকনো মরিচের কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা:

ঝালে ভরা শুকনা মরিচ। মরিচ বা লঙ্কা এক প্রকারের মসলা হিসাবে ঝাল স্বাদের জন্য রান্নায় ব্যবহার করা হয়।মরিচকে দুই (২) ভাবে আমরা ব্যবহার করে থাকি। সবুজ মরিচ কে আমরা কাঁচা মরিচ হিসেবে চিনি অন্যদিকে মরিচ শুকিয়ে লাল হয়ে গেলে তাকে আমরা শুকনো মরিচ হিসেবে চিনে থাকি।

ছত্রাকের সংক্রমণ,সর্দি এবং ফ্লুর বিরুদ্ধে লড়াই করে:

শুকনো মরিচ বা লাল মরিচের বৈশিষ্ট্যযুক্ত লাল রঙ এটি ইঙ্গিত দেয় যে, এটি বিটা ক্যারোটিন বা প্রো-ভিটামিন এ সমৃদ্ধ। ভিটামিন ‘এ’ একটি স্বাস্থ্যকর শ্বাস প্রশ্বাস, অন্ত্র এবং মূত্রতন্ত্রকে বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও, লাল মরিচের ভিটামিন ‘এ’ এবং ভিটামিন ‘সি’ সংক্রমণ এবং অসুস্থতার বিরুদ্ধে আপনার অনাক্রম্যতা বাড়ানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।আপনি যদি অ্যালার্জিতে ভোগেন বা আপনার নাক বন্ধ হয়ে যায় তবে ক্যাপসাইসিন আপনার লক্ষণগুলি থেকে মুক্তি দিতে পারে। তদতিরিক্ত, ক্যাপসাইসিনের বেশ কয়েকটি অ্যান্টিব্যাকটিরিয়াল বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা দীর্ঘস্থায়ী সাইনাস সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে।

প্রাকৃতিক ব্যথার ত্রাণকর্তা:

লাল মরিচে ক্যাপসাইসিন নামে একটি পদার্থ থাকে যা মরিচগুলিকে তাদের বৈশিষ্ট্যযুক্ত কর্মক্ষমতা প্রদান করে। ক্যাপসাইসিন হল প্রদাহজনক প্রক্রিয়াগুলির সাথে সম্পর্কিত একটি নিউরোপেপটাইড। মরিচ যত বেশি গরম, এতে তত বেশি ক্যাপসাইকিন রয়েছে।মাথা ব্যথা এবং মাইগ্রেনের ব্যথা কমানোর ত্রাণকর্তা লাল বা শুকনোমরিচ জয়েন্টে ব্যথা কমাতেও ব্যবহার করা যেতে পারে। ক্যাপসাইসিন ব্যথা রিসেপ্টরগুলির সাথে আবদ্ধ হয় এবং একটি জ্বলন্ত সংবেদন প্রেরণা দেয় যা আপনার ব্যথা রিসেপ্টরগুলিকে সময়ের সাথে সাথে অস্বচ্ছল করে তুলতে পারে। এইভাবে, ক্যাপসাইসিন ব্যথা উপশমকারী হিসাবে কাজ করে। সাধারণত, এটি দাত, জয়েন্টে ব্যথা এবং এইচআইভি নিউরোপ্যাথির চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়:

লাল মরিচ বা শুকনো মরিচে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-A ও C থাকে। প্রতিদিন যদি কেউ শুকনো মরিচ খায়, তবে তার নাসিকাপথ পরিষ্কার থাকবে। অন্ত্র, মূত্রনালী ও ফুসফুসে কোনো সংক্রমণ হবে না।লাল মরিচের উজ্জ্বল রঙ-এতে যে উচ্চ পরিমানে বিটা ক্যারোটিন রয়েছে তার সংকেত দেয়। এই দুটি ভিটামিনকে প্রায়শই সংক্রমণ বিরোধী ভিটামিন বলা হয়, স্বাস্থ্যকর শ্লেষ্মা ঝিল্লির জন্য ভিটামিন এ প্রয়োজনীয়, যা অনুনাসিক প্যাসেজ, ফুসফুস, অন্ত্রের ট্র্যাক্ট এবং মূত্রনালীর আক্রমণকারী রোগজীবাণুগুলির বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরক্ষা হিসাবে কাজ করে।

জমাট সাফ করুন:

ক্যাপসাইসিন কেবল ব্যথা হ্রাস করে না, তবে এর গোলমরিচ উত্তাপ এছাড়াও আপনার নিখুঁত নাক বা জঞ্জালযুক্ত ফুসফুস থেকে শ্লেষ্মা পরিষ্কার করতে সহায়তা করে এমন নিঃসরণকে উদ্দীপিত করে।

কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্য সমর্থন করে:

লাল মরিচের পুষ্টিকর উপাদান আপনার কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমকে ভালো রাখে। হৃদরোগ প্রতিরোধের জন্য মরিচ একটি দুর্দান্ত, প্রাকৃতিক উপায়ও হতে পারে।লাল মরিচে পটাসিয়াম বেশি থাকে, যা মানবদেহে রক্তচাপ কমায়। ফোলেটের সাথে মিলিত পটাসিয়াম আপনার হৃদরোগের সম্ভাবনা হ্রাস করতে পারে। তদুপরি, পটাসিয়াম আপনার রক্তনালীগুলি শিথিল করতে সহায়তা করতে পারে যা আপনার দেহে রক্ত প্রবাহকে আরও সহজ করে তোলে।লাল মরিচে রাইবোফ্লাভিন এবং নিয়াসিনও থাকে। পরবর্তীটি স্বাস্থ্যকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বজায় রাখার জন্য দায়ী এবং ফলস্বরূপ, হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

টাইপ 2 ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়:

শুকনো মরিচ টাইপ 2 ডায়াবেটিসের সাথে সম্পর্কিত ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে।ক্যাপসাইসিন ছাড়াও মরিচে ভিটামিন সি এবং ক্যারোটিনয়েড সহ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে যা ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করতে পারে।

আমেরিকান জার্নাল অফ ক্লিনিকাল নিউট্রিশনের জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় অস্ট্রেলিয়ান গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, খাবারে লাল মরিচ থাকলে খাবারের পরে রক্তে শর্করার পরিমাণ কমাতে প্রয়োজনীয় ইনসুলিনের পরিমাণ হ্রাস পায়। মরিচযুক্ত খাবার যখন ডায়েটের নিয়মিত অংশ হয়, তখন ইনসুলিনের প্রয়োজনীয়তা আরও কম হয়।

হজমশক্তি ও লিভারের উপকার করে:

এটি হজমজনিত পাচনতন্ত্রের অম্লতা হ্রাস করে এটি করে। এটি লালা উৎপাদন করতে সহায়তা করে এবং অন্ত্রের গ্যাস হ্রাস করে হজমে সহায়তা করে।নতুন গবেষণায় দেখা যায় যে, মরিচের সক্রিয় উপাদান ক্যাপসাইসিনের প্রতিদিনের গ্রহণের ফলে লিভারের ক্ষতির উপর উপকারী প্রভাব রয়েছে।

যৌন উদ্দীপনা বাড়ায়:

শুকনো মরিচে থাকা ক্যাপসাইসিন যৌন উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে। যা এন্ডোরফিনের ক্ষরণ বাড়িয়ে, যৌন চাহিদা বাড়ায়।

শরীর ঠান্ডা রাখে:

লাল মরিচ বা শুকনো মরিচের ঝাল রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে বেশি ঘাম সৃষ্টি করে। ঘাম শুকালে তখন শরীর ঠান্ডা হয়। লাল মরিচে যে ক্যাপসাইসিন থাকে তা শরীরের তাপমাত্রা না বাড়িয়ে বেশি ঘাম সৃষ্টি করে।

সতর্কতাঃ

যা কিছু খাবেন পরিমাণমতো খাবেন। আপনার শরীরের অবস্থা বুঝে খাবেন। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়। আপনি যদি কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত হন বা নিয়মিত কোনো মেডিকেল কোর্স-এর ভেতর দিয়ে যান তাহলে খাবার আগে অবশ্যাই আপনার ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী খাবেন।

একটি নতুন সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মশলা মরিচ, স্মৃতিশক্তি হ্রাস পেতে পারে যদি আপনি এটির বেশি পরিমাণে খান।

সূত্রঃ healthline, www.whfoods.com, NDTV

Share