মটরশুঁটি আমিষের ভাল উত্‍স এবং ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী।

ছোট ছোট সবুজ দানা যেন সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। ভাবতে শুরু করে দিলেন তো কী হতে পারে। আর কিছুই না আমাদের অতি প্রিয় সবজি মটরশুঁটি। বসন্তের শুরুতে বা শীতের শেষে বাজারে আসে মটরশুঁটি।

খাবারের স্বাদ বৃদ্ধিতে মটরশুঁটির তুলনা হয় না। স্বাদ বৃদ্ধির পাশাপাশি খাবারের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। যে কোন বাঁধাকপি ভাজি, তরকারি, সালাদ, মাছ ভুনা, পোলাও, নুডলস, ইত্যাদি সব ধরনের রান্নাতেই আর ব্যবহার হয়। মটরশুঁটি ভাজি বাচ্চাদের খুবই পছন্দের একটি খাবার।

মটরশুঁটি আমিষের ভাল উত্‍স। এতে কার্বোহাইড্রেট, অল্প ফ্যাট, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম, ভিটামিন “সি”, ভিটামিন “এ”, ফসফরাস, ভিটামিন “কে” আছে। এতে ফাইবারের পরিমাণ অনেক, তাই হজমে সহায়ক। কোষ্ঠকাঠিন্যতা দূর করে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য মটরশুঁটি খুব ভালো।

মটরশুঁটির পুষ্টিগুণ

মটরশুঁটিতে ক্যালোরির পরিমাণ কম। পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ মটরশুঁটির কিছু পুষ্টি উপাদান নিচে দেওয়া হলো-

  • ক্যালোরি: ৬২
  • কার্বোহাইড্রেট: ১১ গ্রাম
  • ফাইবার: ৪ গ্রাম
  • প্রোটিন: ৪ গ্রাম
  • ভিটামিন “এ”: ৩৪%(RDI)
  • ভিটামিন “কে”: ২৪%(RDI)
  • ভিটামিন “সি”: ১৩%(RDI)
  • থায়ামাইন: ১৫%(RDI)
  • ফোলেট: ১২%(RDI)
  • ম্যাঙ্গানিজ: ১১%(RDI)
  • আয়রন: ৭%(RDI)
  • ফসফরাস: ৬%(RDI)

মটরশুঁটির উপকারীতা

অন্যান্য শাকসবজি তুলনায় মটরশুঁটিতে (green peas) উচ্চ প্রোটিন রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, রান্না করা গাজরের ১/২ কাপে মাত্র ১ গ্রাম প্রোটিন থাকে, আর ১/২ কাপ মটরশুঁটিতে গাজরের থেকে পরিমাণে চারগুণ বেশি থাকে। নিচে মটরশুঁটির স্বাস্থ্য উপকারীতা দেওয়া হলো –

প্রোটিন:

প্রোটিনের খুবই ভালো একটি উৎস হল মটরশুঁটি। প্রোটিন আমাদের শরীরে কিছু হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি করে যা ক্ষুধা কমাতে সাহায্য করে। প্রোটিন হজমকে ধীর করতে এবং পেট ভরিয়ে রাখতে ফাইবারের সাথে একত্রে কাজ করে। পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন এবং ফাইবার খেলে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। অ্যামিনো অ্যাসিডের ঘাটতি পূরণের জন্য প্রোটিনের অন্যতম উৎস মটরশুঁটি খেতে ভুলবেন না। পেশী শক্তি এবং হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন গ্রহণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া এটি ওজন কমাতে এবং ফিট থাকতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

রক্তে শর্করার মাত্রা ঠিক রাখে:

মটরশুটিতে বেশ কয়েকটি উপাদান রয়েছে যা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। প্রথমত, তুলনামূলকভাবে কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) রয়েছে, যা খাবার খাওয়ার পরে রক্তে শর্করার পরিমাণ কত দ্রুত বেড়ে যায় তার পরিমাপ করে। ডায়েটে যেসব খাবারে নিম্ন-গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) সে সব খাবার রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। মটরশুটি মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার এবং প্রোটিন রয়েছে, যা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে উপকারী। কারণ ফাইবার কার্বস শোষণের হারকে ধীর করে দেয় যা রক্তের শর্করার মাত্রা ঠিক রাখে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খেলে টাইপ-2 ডায়াবেটিস ব্যক্তিদের মধ্যে রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল থাকে।

হজমের জন্য ভালো:

অনেক ফাইবার রয়েছে মটরশুঁটিতে, যা হজম স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী। প্রথমত, ফাইবার আমাদের অন্ত্রের ভাল ব্যাকটিরিয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি করে অন্ত্রকে সুস্থ্য রাখে এবং অস্বাস্থ্যকর ব্যাকটিরিয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। এটি কয়েকটি সাধারণ গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনালের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে, যেমন প্রদাহজনক পেটের রোগ, খিটখিটে আন্ত্রিক সিন্ড্রোম এবং কোলন ক্যান্সার। মটরশুঁটিতে থাকা ফাইবার মলের পরিমাণ বৃদ্ধি করে এবং পাচনতন্ত্রের মাধ্যমে দ্রুত পাস করতে সহায়তা করে।

হার্টের জন্য ভালো:

ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম এবং ক্যালসিয়ামের মতো স্বাস্থ্যকর খনিজ রয়েছে মটরশুঁটিতে। এই খনিজগুলো উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে যা হার্টের রোগের জন্য একটি বড় ঝুঁকির কারণ। মটরশুঁটি মোট কোলেস্টেরল এবং “খারাপ” (LDL) কোলেস্টেরল কমায়। মোট কোলেস্টেরল এবং “খারাপ” (LDL) কোলেস্টেরল উভয়ই হার্টের রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। মটরশুঁটিতে থাকা ফ্ল্যাভোনলস, ক্যারোটিনয়েডস এবং ভিটামিন “সি”, অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট সরবরাহ করে যা কোষের ক্ষতি প্রতিরোধ করে ফলে হার্টের রোগ এবং স্ট্রোকের সম্ভাবনা কমে যায়।

ক্যান্সার:

মরণব্যাধি ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে মটরশুঁটি। এতে থাকা স্যাপোনিনস (উদ্ভিদ যৌগ) ক্যান্সার বিরোধী প্রভাবের জন্য পরিচিত। বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, স্যাপোনিন বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সহায়তা করতে পারে এবং টিউমার বৃদ্ধি রোধ করতে পারে। এতে এমন কিছু পুষ্টিউপাদান আছে যা ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। সেসব পুষ্টিউপাদানের মধ্যে অন্যতম হলো ভিটামিন “কে” যেটা প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমানোর জন্য বিশেষ ভাবে পরিচিত।

শক্তির উৎস:

পুষ্টিতে সমৃদ্ধ এবং প্রাকৃতিক শক্তির একটি দুর্দান্ত উৎস হল মটরশুটি। এটি কার্বোহাইড্রেট, ফাইবার এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ। মটরশুটিতে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ফলিক অ্যাসিড, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ এবং ম্যাগনেসিয়াম আমাদের এলার্জি বা শক্তি বৃদ্ধি করে এবং শরীরের প্রতিটি কোষে সরবরাহ করতে সহায়তা করে।

আমাদের রক্তের শর্করার মাত্রা, হার্ট এবং হজম স্বাস্থ্যের জন্য মটরশুঁটি খুব ভালো। তাই সিজনের সময় মটরশুঁটি আমাদের খাদ্য তালিকায় রাখা ভালো।

Share