ভিটামিন “সি” সমৃদ্ধ কমলালেবু স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায় ও কিডনিতে পাথর হওয়া রোধ করে।

কমলালেবু যেমন সুস্বাদু তেমনি পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ একটি ফল। পাঁকা কমলালেবুর চোখ ধাঁধানো কমলা রং খুবই আকর্ষণীয়। এটি এমন একটি ফল যা ছোট-বড় সবারই পছন্দের। কমলার সুমিষ্ট ঘ্রাণ এমনই চিত্তাকর্ষক যে এটি খোলার সময় ঘ্রাণের জন্য আসে পাশের মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়।

কমলালেবুর প্রতিটি কোয়া যেন ভিটামিন “সি” এর দুর্দান্ত উৎস। একটি কমলা দৈনিক যে পরিমাণ ভিটামিন “সি” দরকার হয় তার ১০০% এরও বেশি পূরণ করে যা অন্য যেকোন সাইট্রাস ফলের চেয়ে বেশি। কমলাতে (orange) ১৭০ টিরও বেশি ফাইটোকেমিক্যালস এবং ৬০টিরও বেশি ফ্ল্যাভোনয়েড রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি বৈশিষ্ট্য এবং শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রভাব রয়েছে।

কমলা আয়রনের শোষণ বৃদ্ধি করে উচ্চ রক্তচাপ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়। এছাড়া কমলা আমাদের কিডনিতে পাথর হওয়া রোধ করতে পারে। মা এবং শিশুদের জন্য ফোলেট খুবই গুরত্বপূর্ণ। কমলা প্রাকৃতিকভাবে ফোলেটের চমৎকার একটি উৎস।

কমলালেবুর পুষ্টি উপাদান

কমলা রঙের এই ফলটিতে ভিটামিন “সি” ছাড়াও পটাসিয়াম, কার্বোহাইড্রেট, ক্যালসিয়াম, থায়ামিন, রাইবোফ্লাভিন, নিয়াসিন, ভিটামিন বি-6, ফোলেট, প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, সেলেনিয়াম এবং কপার এবং আন্টিআইক্সিডেন্ট রয়েছে। একটি কমলা প্রতিদিনের ভিটামিন “সি” এর চাহিদার তুলনায় ১৩০ শতাংশ পূরণ করে। নিচে এর আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান দেওয়া হলো –

  • ক্যালোরি: ৪৭
  • পানি:৮৭%
  • প্রোটিন:০.৯ গ্রাম
  • কার্বহাইড্রেট:১১.৮ গ্রাম
  • চিনি: ৯.৪ গ্রাম
  • ফাইবার: ২.৪ গ্রাম
  • ফ্যাট: ০.১ গ্রাম

কমলার উপকারীতা

যারা সকালের ব্রেকফাস্টে ফলের জুস খেতে পছন্দ করেন, তারা কমলা বেছে নিতে পারেন। এটা আমাদের স্কিনকে ভিতর থেকে সুস্থ্য রেখে ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে তুলবে। নিচে কমলার উপকারীতা নিয়ে আলোচনা করা হলো –

ফাইবার এবং আলসার:

কমলাগুলি ফাইবারের একটি ভাল উৎস। একটি মাঝারি কমলাতে ২.৮ গ্রাম ফাইবার থাকে। ফাইবার আমাদের পাকস্থলী ও অন্ত্রের স্বাস্থ্য ঠিক রাখে। তাছাড়া কমলার ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে ভূমিকা রাখে। কোলেস্টেরল কমায় এবং আলসার দূরে রাখতে সহায়তা করে। ফাইবার আমাদের শরীরে চিনি শোষণ ধীর করে দেয়।

উচ্চ রক্তচাপ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়:

যাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে তাদের সোডিয়াম গ্রহণ কমানোর পাশাপাশি পটাসিয়াম গ্রহণ বৃদ্ধি করা ঠিক গুরুত্বপূর্ণ। কমলা পটাসিয়ামের একটি ভাল উৎস। উচ্চ মাত্রায় পটাসিয়াম সমৃদ্ধ কমলা উচ্চ রক্তচাপ কমানোর পাশাপাশি স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়।

ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়:

শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ভিটামিন “সি” এর দুর্দান্ত উৎস কমলালেবু। কমলায় প্রচুর পরিমাণ ভিটামিনের পাশাপাশি রয়েছে আলফা ও বেটা ক্যারোটিনের মতো ফ্ল্যাভনয়েড ও অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যৌগ যা ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। কমলায় উচ্চমাত্রার পুষ্টিগুণ হচ্ছে ফ্ল্যাভনয়েড যা ফুসফুস এবং ক্যাভিটি ক্যান্সার প্রতিরোধে কার্যকর।

কিডনিতে পাথর হওয়া রোধ করে:

কিডনিতে পাথর আছে এমন রোগীদের জন্য প্রায়শই পটাসিয়াম সাইট্রেট পরামর্শ দেওয়া হয়। কমলা সাইট্রিক অ্যাসিড এবং সাইট্রেট এর একটি ভাল উৎস। কমলালেবু এবং অন্যান্য সাইট্রাস ফলগুলিতে সাইট্রিক অ্যাসিড এবং সাইট্রেটস বেশি থাকে, যা ফলের টক স্বাদের জন্য দায়ী। গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, কমলা থেকে পাওয়া সাইট্রিক অ্যাসিড এবং সাইট্রেট কিডনিতে পাথর গঠনে বাঁধা দিতে পারে।

হার্ট এর স্বাস্থ্যের জন্য ভালো:

কমলালেবুতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার, পটাসিয়াম, ভিটামিন “সি” এবং ফ্ল্যাভোনয়েডস রয়েছে এগুলো সবই হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব লোকেরা প্রতিদিন কম পটাসিয়ামযুক্ত খাবার খেয়েছিল তাদের তুলনায় যারা উচ্চ পটাসিয়াম যুক্ত খাবার খেয়েছিল তাদের মধ্যে হার্ট ডিজিজ এর কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি ৪৯ শতাংশ কম ছিল। এছাড়া উচ্চ পটাসিয়াম খাবার স্ট্রোকের ঝুঁকি হ্রাস করতে, পেশী ভর ঠিক রাখতে, হাড়ের ঘনত্ব বৃদ্ধি করতে পারে। তাই আজ থেকে উচ্চ পটাসিয়াম যুক্ত কমলা লেবু খাওয়া শুরু করুন।

আয়রনের শোষণকে বাড়িয়ে তুলতে পারে:

ভিটামিন “সি” এবং সাইট্রিক অ্যাসিড উভয়ই আমাদের দেহে পাচনতন্ত্রে আয়রনের শোষণকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। এছাড়া কমলালেবুতে রয়েছে ফ্ল্যাভোনেড যা শরীরের ক্ষতিকারক পদার্থ বের করে শরীরের রক্ত পরিষ্কার করতে সাহায্য করে।

ডায়াবেটিস ঠিক রাখে:

গবেষণায় দেখা গেছে যে, টাইপ-1 ডায়াবেটিস রোগীরা যারা উচ্চ ফাইবারযুক্ত ডায়েট গ্রহণ করেন তাদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কম থাকে এবং টাইপ-2 ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করার, লিপিডস এবং ইনসুলিনের মাত্রা উন্নত করতে পারে। তবে ডায়াবেটিস রোগীদের একটু টক কমলা খাওয়াই ভালো।

স্কিনের জন্য দুর্দান্ত:

কমলার অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট, ভিটামিন “সি” আমাদের স্কিনের জন্য ভালো। এটি সূর্য এবং দূষণের কারণে ত্বকের ক্ষয়ক্ষতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে, চামড়া কুঁচকে যাওয়া হ্রাস করতে এবং ত্বকের সামগ্রিক গঠনে উন্নতি করতে পারে। ভিটামিন “সি” ত্বকের কোলাজেন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তবে শুধু কমলার কোয়াতেই নয়, এর খোসাতেও রয়েছে অনেক গুণ। যেমন, কমলার খোসা রূপচর্চায় অত্যন্ত উপকারী। স্কিনে ব্ল্যাকহেডস দূর করতে সহায়ক পাঁকা কমলার খোসা। তাই শীতে কমলা মিস করবেন না।

Share