ভিটামিন “সি” সমৃদ্ধ আমলকী ব্রেনের জন্য ভালো, ক্যান্সার প্রতিরোধী ও হার্টের জন্য ভালো।

আমলকী চিবিয়ে খাচ্ছেন? স্বাদ পছন্দ হচ্ছে না? মনে হচ্ছে ফেলে দি। দয়া করে ফেলবেন না। এবার একটু পানি খেয়ে নিন এবার মিষ্টি স্বাদ পাচ্ছেন তো। আয়ুর্বেদে আমলকী অমৃত ফল হিসাবে পরিচিত। ভেষজ গুণে অনন্য আমলকী গাছের ফল ও পাতা দুটিই ওষুধরূপে ব্যবহার করা হয়। আমলকীতে প্রচুর ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে।

পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে- আমলকীতে পেয়ারার চেয়ে ৩ গুণ, কাগজি লেবুর চেয়ে ১০ গুণ বেশি ভিটামিন ‘সি’ রয়েছে। এছাড়াও কমলার চেয়ে ১৫ থেকে ২০ গুণ, আপেলের চেয়ে ১২০ গুণ, আমের চেয়ে ২৪ গুণ এবং কলার চেয়ে ৬০ গুণ বেশি ভিটামিন “সি” রয়েছে। একজন বয়স্ক লোকের প্রতিদিন ৩০ মিলিগ্রাম ভিটামিন “সি” দরকার হয়। দিনে দুটো আমলকি খেলে প্রতিদিনের ভিটামিন ‘সি’ এর চাহিদা পূরণ হয়।

আমলকী মুখের রুচি বৃদ্ধি থেকে শুরু করে রূপচর্চার কাজেও অতুলনীয়। এটি ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে পারে। প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, রিউমেটয়েড আর্থ্রাইটিস এবং অস্টিওপোরোসিস রোগে আমলকীর রস কাজ করে। কয়েক ধরনের ক্যান্সারের বিরুদ্ধেও এর কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

আমলকীর ‘এন্টি-অক্সিডেন্ট’ রূপে কার্যকারিতার পেছনে মূল ভূমিকা ভিটামিন-সি এর নয়, বরং ‘এলাজিটানিন’ নামক পদার্থসমূহের বলে মনে করা হয়। যেমন এমব্লিকানিন-এ (৩৭%), এমব্লিকানিন-বি (৩৩%), পানিগ্লুকোনিন (১২%) এবং পেডাংকুলাগিন (১৪%)। এতে আরো আছে পানিক্যাফোলিন, ফিলানেমব্লিনিন-এ, বি, সি, ডি, ই। এই ফলে অন্যান্য ‘পলিফেনল’ও থাকে। যেমন- ফ্ল্যাভোনয়েড, কেমফেরল, এলাজিক এসিড ও গ্যালিক এসিড। এক কথায় আমলকী যেন সর্ব রোগের ঔষধের ভান্ডার।

আমলকীর পুষ্টি উপাদান

আমলকীতে অনেক পুষ্টি উপাদান রয়েছে। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান দেওয়া হলো –

  • ক্যালোরি: ৬৬
  • ফাইবার: ৭ গ্রাম
  • ভিটামিন “সি”: ৪৬%
  • ভিটামিন বি-5: ৯%
  • ভিটামিন বি-6: ৭%
  • কপার: ১২%
  • ম্যাঙ্গানিজ: ৯%
  • পটাশিয়াম: ৬%

আমলকীর উপকারীতা

আমলকী বা আমলকি (বৈজ্ঞানিক নাম: Phyllanthus emblica). সংস্কৃত ভাষায় এর নাম ‘আমালিকা’। ইংরেজি নাম ‘amla’ বা ‘Indian gooseberry’ বলা হয়। নিচে আমলকীর উপকারীতা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো –

ব্রেনের জন্য ভালো:

আমাদের কোষে অতিরিক্ত আয়রনের উপস্থিতি মস্তিষ্কের অবক্ষয়জনিত রোগের অন্যতম কারণ। আয়রনের মাত্রা খুব বেশি হলে শরীরে ফ্রি রেডিকেল তৈরি হয় যা কোষকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। আমলকী জৈব অ্যাসিডগুলির একটি প্রাকৃতিক উৎস। ১০০ মিলিগ্রাম আমলকীর মধ্যে ১১-১৪ মিলিগ্রাম সাইট্রিক অ্যাসিড রয়েছে। সাইট্রিক অ্যাসিড কোষগুলিতে আয়রন জমতে বাধা দেয় এবং নিয়মিত গ্রহণ করলে অ্যালঝাইমার এবং স্ট্রোকের মতো রোগের ঝুঁকি হ্রাস করে।

উচ্চ ফাইবার এবং কম ক্যালরি যুক্ত:

আমলকীতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার রয়েছে তবে ক্যালোরি পরিমাণ কম, যার অর্থ আপনি খুব বেশি ক্যালোরি না খেয়ে অন্য পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে পারছেন। গবেষণা করে দেখা গেছে যে, আমলকী খাওয়া ওজন হ্রাসে সহায়তা করতে পারে এবং সামগ্রিকভাবে কম ক্যালোরি খেতে সহায়তা করে। আমলকী দ্রবণীয় এবং অদ্রবণীয় ফাইবারের দুর্দান্ত উৎস। ফাইবার মলের পরিমাণ বৃদ্ধি করে আমাদের অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে।

ক্যান্সার প্রতিরোধী:

আমলকী ফাইটোনিট্রিয়েন্টস এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ যা ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে। আমলকীতে ক্যান্সার প্রতিরোধী উপাদান যেমন ফোলেট, ফেনলিক যৌগ এবং ভিটামিন “সি” এবং “ই” রয়েছে। এই উপাদানটি ক্যান্সার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে।

হার্টের জন্য ভালো:

আমলকীতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস এবং পটাসিয়াম সহ হার্টের রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে এমন অনেক পুষ্টি উপাদান রয়েছে। অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টর রক্তের LDL (খারাপ) কোলেস্টেরলের অক্সিডেশন রোধ করে হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নত করে। এছাড়া ফ্ল্যাভোনোলস এবং অ্যান্টোসায়ানিনগুলির মতো ফাইটোনিট্রিয়েন্ট রক্তচাপ হ্রাস করতে এবং রক্তনালীর ফাংশন উন্নত করতে সহায়তা করে, যা হার্টের রোগের ঝুঁকি হ্রাস করে।

রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখে:

রক্তে উচ্চ মাত্রার গ্লুকোজ থাকা টাইপ-2 ডায়াবেটিস, হার্টের রোগ, স্ট্রোক, ডিমেনশিয়া এবং আরও অনেক অসুস্থ্যতার কারণ। আমলকীতে বেশ কয়েকটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। এতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার রয়েছে, যা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রায় স্পাইকগুলি প্রতিরোধ করে আপনার রক্ত প্রবাহে চিনির শোষণকে ধীর করে দেয়।

এন্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ:

অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট এমন যৌগ যা ফ্রি রেডিকেল এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করে। ফ্রি রেডিকেল রিএকটিভ অণু যা কোষের ক্ষতির কারণ এবং নানা ধরনের রোগ ও অল্প বয়সে বুড়ো হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ ডায়েট নির্দিষ্ট ধরণের ক্যান্সার, হার্টের রোগ, টাইপ-2 ডায়াবেটিস, বার্ধক্যজনিত ঝুঁকি হ্রাস এবং মস্তিষ্কের রোগ থেকে রক্ষা করতে পারে। আমলকী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ এর একটি দুর্দান্ত উৎস, যার মধ্যে ভিটামিন “সি”, স্বল্প পরিমাণে ভিটামিন “ই”, এবং ফাইটোনিট্রিয়েন্টস রয়েছে।

চুলের জন্য দুর্দান্ত:

আমলকী চুলের জন্য খুবই কার্যকরী। কাচা আমলকি বেটে রস প্রতিদিন চুলে লাগিয়ে ২-৩ ঘন্টা রেখে দিতে হবে। এভাবে একমাস মাখলে চুলের গোড়া শক্ত, চুলের রং কালো হয়। চুল উঠা এবং তাড়াতড়ি চুল পাকা হ্রাস পায়। এটি চুলের খুশকির সমস্যাও দূর করে।

আমলকীর আরও কিছু উপকারীতা

  • প্রতিদিন সকালে আমলকীর জুস খেলে পেপটিক আলসার প্রতিরোধে কাজ করে।
  • আমলকী শরীরের বিষাক্ত পদার্থ বের করতে সাহায্য করে এবং ওজন কমায়।
  • মধু দিয়ে প্রতিদিন খেলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।
  • ভিটামিন “সি” তে পরিপূর্ণ আমলকী। আমলকী রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে, সর্দি-কাশির সারাতে ও হজম ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। প্রতিদিন এক চামচ আমলকীর রস মধু দিয়ে খেলে সর্দি-কাশির প্রকোপ থেকে রেহাই পাওয়া যাবে।
  • হজমে সাহায্য করে ও ক্ষুধা বাড়ায়।
  • আমলকী ত্বকের বলিরেখা দূর করতেও সাহায্য করে।
  • আমলকী রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমান ঠিক রাখতে ও চোখের দৃষ্টি শক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে।
  • আমলকী লিভারের স্বাস্থ্যর জন্য ভালো। এটি লিভার থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দিতে ও লিভারের কার্যক্ষমতা ভালো করতে সাহায্য করে।

সতর্কতা:

আপনি যদি জটিল কোনো রোগে আক্রান্ত হন বা অন্য কোনো কারণে রেগুলার কোনো মেডিকেল কোর্স-এর মধ্য দিয়ে যান তাহলে অবশ্যই খাওয়ার আগে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন।

সূত্র: হেলথলাইন

Share