বাচ্চাদের সর্দি-কাশি দূর করার প্রাকৃতিক উপায়।

ছোট বাচ্চাদের মধ্যে সর্দি-কাশি সাধারণ। কাশি দুই সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। কাশি যদি অতিরিক্ত মাত্রায় না হয়তাহলে বাড়িতে বসেই ঘরোয়া চিকিৎসার মধ্যে কাশি সরানো সম্ভব।

কোন উপায়ে আপনার বাচ্চার সর্দি-কাশি দূর করবেন এটা নিয়ে অবিভাবকদের নানা দুশ্চিন্তা। অনেকে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে বাচ্চাদের সর্দি-কাশির চিকিৎসা করাতে ভয় পান।

বাচ্চারা সর্দি-কাশিতে ভোগে শুধুমাত্র দুর্বল রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা হওয়ার কারণে। আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স (শিশু চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের অ্যাকাডেমি) এর মতে, ৬ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের সর্দি-কাশি হলে ঔষধ খাওয়ানো উচিত না এবং প্রাকৃতিক উপায়ে তাদের চিকিৎসা করা উচিত।

সাধারণত, বাচ্চাদের সর্দি-কাশি হলে নাক দিয়ে পানি পরে, হালকা গা গরম হয়, হাঁচি হয়, কফ বের হয়, খাবারে অরুচি দেখা দেয়, অনিদ্রা, ইত্যাদি লক্ষন দেখা দেয়। কিন্তু বাচ্চার সর্দি-কাশি হলে এমন কিছু ঘরোয়া উপায় রয়েছে যা অবলম্বন করলে সহজেই বাচ্চার সর্দি-কাশি দূর করা সম্ভব।

আসুন এবার জেনে নিই সেগুলো সম্পর্কে-

লেবুর সিরাপ:

শিশুদের সর্দিকাশি কমানোর উপায় হিসেবে লেবু ভালো প্রাকৃতিক ঔষধ। এতে প্রচুর ভিটামিন “সি” আছে যা শরীরে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয় এবং ঠান্ডা দূর করতে সাহায্য করে। এতে থাকা এন্টিব্যাক্টেরিয়াল ও এন্টি-ইনফ্লামাটরি সর্দি-কাশি, কফ, গলা শুকিয়ে যাওয়া কমাতে কার্যকর।

২টি লেবু খোসা ছাড়িয়ে ১ টেবিল চামচ ফালি করা আদার সাথে একটি পাত্রে পানি ফুটিয়ে নিন। সেই লেবুর আর আদার ফালি গরম পানিতে ১০ মিনিট ফুটিয়ে নিন। এরপর পানি ছেঁকে নিন এবং এর সাথে স্বাদ বাড়ানোর জন্য সামান্য মধু মেশান। শিশুকে দিনে ৩-৪ বার এই পানি খাওয়ান।

মধু:

সর্দি-কাশি সারাতে মধু খুবই উপকারী। মধু একটি প্রাকৃতিক মিষ্টি যা গলা ব্যথা প্রশমিত করতে সহায়তা করে। মধুতে অ্যান্টিব্যাকটিরিয়াল বৈশিষ্ট্যও রয়েছে এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা করতে পারে। তবে এক বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য মধু নিরাপদ নয়। মধু কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া বন্ধ ও শরীর থেকে ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করে।

২ টেবিল চামচ মধুর সাথে ১ টেবিল চামচ লেবুর রস মিশিয়ে কয়েক ঘণ্টা পর পর বাচ্চাদের খাওয়ান। তাছাড়া ১ গ্লাস গরম দুধের সাথে মধু মিশিয়ে খেলে বাচ্চাদের শুকনা কাশি ভাল হয় এবং বুকে ব্যাথা কমে যায়।

সরিষার তেল:

বড়দের ক্ষেত্রে সরিষার তেল যেমন উপকারী বাচ্চাদের ক্ষেত্রেও তেমন উপকারী। আগের কার দিনে বাচ্চার মাথার তালুতে সরিষার তেলে পাতলা কাপড় ভিজিয়ে দেওয়া হতো।

দুই কোয়া রসুন দিয়ে সরিষার তেল গরম করুন। এবার এ তেল দিয়ে শিশুর পায়ের পাতা, পিঠ, হাতের তালু ও বুকে মালিশ করুন। শিশুর সর্দি থেকে উপশম হবে।

ঘুমন্ত অবস্থায় বাচ্চার মাথা উঁচু করুন:

ঘুমন্ত অবস্থায় বাচ্চার মাথা উঁচু করে রাখলে সর্দির কারণে নাক বন্ধ হয়ে আসবে না। সর্দিতে নাক বন্ধ হয়ে আসলে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। বিশেষ করে বাচ্চা যখন ঘুমিয়ে থাকে। তাই আপনার শিশু যখন শুয়ে থাকবে তখন মাথা উঁচু করে রাখার চেষ্টা করুন।

তবে এটি চেষ্টা করার আগে আপনার শিশু বিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞাসা করা উচিত।

মুরগির স্যুপ:

১ বছরের বেশি বয়সী বাচ্চাদের সর্দি-কাশি দূর করতে মুরগির স্যুপ অনেক কার্যকরী। এতে থাকা এন্টিওক্সিডেন্ট দ্রুত রোগ সারাতে সাহায্য করে। ২০০০ সালে চেস্ট জার্নালে (Chest Journal) প্রকাশিত এক গবেষণায় পরামর্শ দেওয়া হয় যে, মুরগির স্যুপে থাকা পুষ্টিগুলো শ্বাস-প্রশ্বাস জনিত সমস্যায় ঔষধের মত কাজ করে। সর্দিকাশি হলে ঘরে মুরগির সাথে শাকসবজি (গাঁজর, বিট, আদা, রসুন, গোলমরিচ, পালংশাক ইত্যাদি) দিয়ে স্যুপ বানিয়ে বাচ্চাদের দিনে ২-৩ বার খাওয়ান।

কমলালেবু:

যে কোন বাচ্চার কাছে কমলালেবু একটি পছন্দের খাবার। কমলালেবুতে থাকা ভিটামিন “সি” রক্তকোষের উৎপাদন বাড়ায় যা সর্দি-কাশির জীবাণুদের সাথে যুদ্ধ করে। এছাড়াও এটা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। ২ বছরের বেশি বয়সী বাচ্চাদের ১ থেকে ২ গ্লাস কমলালেবুর রস পান করতে দিন।

আদা:

বাচ্চাদের কাশি দূর করতে আদা অনেক কার্যকরী। এটা সাধারণ জ্বর কমাতে সহায়তা করে। একটি পাত্রে ৬ কাপ পানি, আধা কাপ আদা নিয়ে ২০ মিনিট হালকা তাপে জ্বাল দিয়ে নিন। তারপর ছেঁকে নিন। এই পানির সাথে একটু মধু অথবা চিনি মিশিয়ে শিশুদের দিনে ১ বার পান করতে দিন।

মায়ের বুকের দুধ:

বলা হয়, “Breast milk is the best milk for children”. নবজাতকের জন্য এটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ খাবার। বিশেষকরে তারা যখন অসুস্থ হয়। এটা সম্পূর্ণ আলাদা সব পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ যা বাচ্চাদের যেকোনো রোগবালাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। ৬ মাসের ছোট বাচ্চাদের সর্দিকাশি নিরাময়ে পর্যাপ্ত বুকের দুধ পান করান।

এছাড়া পর্যাপ্ত আলো-বাতাস আসতে পারে এমন ঘরে বাচ্চাকে রাখুন, বাচ্চাদের বেশি বেশি পুষ্টিকর খাবার খাওয়ান, শিশুর যথেষ্ট ঘুম হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে খেয়াল রাখুন এবং বাচ্চাকে সব সময় পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করুন।

Share