বাঁধাকপির স্বাস্থ্য উপকারীতা।

শীতের শুরুতে সবজি হিসেবে বাঁধাকপি এক কথায় অতুলনীয়। বাঁধাকপি উপস্থিতি যেমন শীতের আগমনী বার্তা কে স্মরণ করিয়ে দেয় তেমনি সাথে নিয়ে আসে অনেক স্বাস্থ্য উপকারীতা। অনেক পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ বাঁধাকপি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। হৃদরোগ, ক্যান্সারসহ অনেক মরণঘাতী রোগের হাত থেকে দূরে থাকতে বাঁধাকপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাঁধাকপিতে (cabbage) থাকা ভিটামিন “বি-6” এবং ফোলেট উভয়ই শরীরে শক্তি বিপাক এবং স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক ক্রিয়াসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করে। বাঁধাকপির মধ্যে ভিটামিন “সি” বেশি থাকে, এটি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট।

বাঁধাকপি কাঁচা অথবা রান্না করে দুইভাবেই খাওয়া যায়। কাঁচা অবস্থায় সালাদ হিসেবে শসা, গাজর, টমেটোর সাথে কচি বাঁধাকপি মেশালে অত্যন্ত চমৎকার স্বাদ হয়। বাঁধাকপির যুক্ত সালাত খুবই স্বাস্থ্যকর। বাঁধাকপি ভাজি বা বাঁধাকপি ঘন্ট আমাদের দেশের একটি জনপ্রিয় খাবার। মটরশুঁটি দিয়ে বাঁধাকপি অথবা চিংড়ি মাছ দিয়ে বাঁধাকপি খুবই মুখরোচক এবং জনপ্রিয় খাবার।

বাঁধাকপির পুষ্টিগুণ

বাঁধাকপির ইংরেজি নাম Cabbage, এর বৈজ্ঞানিক নাম Brassica oleracea। বাঁধাকপির আদি নিবাস ভূমধ্যসাগরীয় দক্ষিণ ইউরোপে। বাংলাদেশে ১৯৬০-এর দশকে এর চাষ শুরু হয়। নিচে বাঁধাকপির পুষ্টিগুণ দেওয়া হলো –

  • ক্যালোরি:২২
  • প্রোটিন: ১ গ্রাম
  • ফাইবার: ২ গ্রাম
  • ভিটামিন “কে”: ৮৫%(RDI)
  • ভিটামিন “সি”: ৫৪%(RDI)
  • ফোলেট: ১০%(RDI)
  • ম্যাঙ্গানিজ: ৭%(RDI)
  • ভিটামিন “বি-6”: ৬%(RDI)
  • ক্যালসিয়াম: ৪%(RDI)
  • পটাসিয়াম: ৪%(RDI)
  • ম্যাগনেসিয়াম: ৩%(RDI)

এছাড়াও বাঁধাকপিতে অল্প পরিমান ভিটামিন “এ” এবং আয়রন রয়েছে।

বাঁধাকপির উপকারীতা

রক্তচাপ কমিয়ে:

উচ্চ রক্তচাপ বিশ্বব্যাপী এক বিলিয়নেরও বেশি লোককে প্রভাবিত করে। এটি হৃদরোগ ও স্ট্রোকের জন্য একটি বড় ঝুঁকির কারণ। চিকিৎসকেরা প্রায়শই উচ্চ রক্তচাপ আছে এমন রোগীদের খাবার লবণের পরিমাণ কমাতে পরামর্শ দেন। যাইহোক, ডায়েটরি পটাসিয়াম বৃদ্ধি রক্তচাপ হ্রাস করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পটাসিয়াম এর প্রধান কাজের মধ্যে একটি হল দেহের সোডিয়ামের প্রভাব প্রতিরোধ করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করা। প্রস্রাবের মাধ্যমে অতিরিক্ত সোডিয়াম নির্গত করতে সহায়তা করে পটাসিয়াম। এটি রক্তনালী দেয়ালও শিথিল করে, এই শিথিলতা রক্তচাপকে হ্রাস করে। সোডিয়াম এবং পটাসিয়াম উভয়ই স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ডায়েটে সোডিয়ামের পরিমাণ খুব বেশি এবং পটাসিয়ামের পরিমাণ খুব কম থাকে। লাল বাঁধাকপি পটাসিয়ামের একটি দুর্দান্ত উৎস। তাই আমরা পটাসিয়াম সমৃদ্ধ বাঁধাকপি খেয়ে উচ্চ রক্তচাপ কমাতে পারি।

হজমের জন্য ভালো এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে:

আমরা হজম স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে ফাইবার সমৃদ্ধ বাঁধাকপি খেতে পারি। সব ধরণের কুঁচকানো শাকসবজি অ-দ্রবণীয়(insoluble) ফাইবারে পূর্ণ। অ-দ্রবণীয় ফাইবার এক ধরণের কার্বোহাইড্রেট যা অন্ত্রগুলিতে ভেঙে ফেলা যায় না। এই ফাইবার মলের পরিমাণ বাড়িয়ে পাচনতন্ত্রকে সুস্থ্য রাখতে সহায়তা করে। পাশাপাশি কোষ্ঠকাঠিন্যতা দূর করে।

এছাড়াও বাঁধাকপি দ্রবণীয়(soluble) ফাইবার সমৃদ্ধ, যা অন্ত্রে উপকারী ব্যাকটিরিয়ার সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়। আমাদের শরীরে কিছু কিছু উপকারী ব্যাক্টেরিয়া রয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম বিফিডোব্যাকটিরিয়া(Bifidobacteria) এবং ল্যাক্টোব্যাকিলি(Lactobacilli)। এই উপকারী ব্যাক্টেরিয়ার শক্তির প্রধাণ উৎস দ্রবণীয় ফাইবার। ব্যাকটিরিয়া দুটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং কিছু পুষ্টি উপাদান যেমন কে 2 এবং বি 12 তৈরি করে।

হার্টের জন্য ভালো:

লাল বাঁধাকপিতে এন্থোক্যানিনস(anthocyanins) নামে শক্তিশালী যৌগিক থাকে। এন্থোক্যানিনস(anthocyanins) সুস্বাদু বাধাঁকপিকে বেগুনি রঙ দেয়। অ্যান্টোসায়ানিন(Anthocyanins) হল উদ্ভিদ রঙ্গক যা ফ্ল্যাভোনয়েড পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই উদ্ভিদ রঙ্গক সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার ফলে হার্টের রোগের ঝুঁকি কম। ৯৩,৬০০ জন মহিলার উপর গবেষণা করে দেখা গেছে যে, অ্যান্টোসায়ানিন সমৃদ্ধ খাবার বেশি খাওয়া তাদের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেকটা কম ছিল। ৩৪৪,৪৮৮ জনের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে প্রতিদিন ১০ মিলিগ্রাম ফ্ল্যাভোনয়েড গ্রহণ করায় হার্টের রোগের ঝুঁকি ৫% কমে গেছে।
বাঁধাকপি ৩৬ টিরও বেশি ধরণের শক্তিশালী অ্যান্টোসায়ানিন ধারণ করে যা এটি হৃদরোগের স্বাস্থ্যের জন্য একটি দুর্দান্ত সবজি।

কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়:

আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে কোলেস্টেরল পাওয়া যায়। অনেকেই মনে করে যে সব ধরণের কোলেস্টেরল খারাপ, তবে এটি শরীরের সঠিক ক্রিয়াকলাপের জন্য প্রয়োজনীয়। তবে, যাদের কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেশি থাকে তাদের হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়তে থাকে, বিশেষত যখন তাদের “খারাপ” কোলেস্টেরলের(LDL) পরিমাণ বেশি থাকে। বাঁধাকপিতে দুটি উপাদান রয়েছে যা “খারাপ” কোলেস্টেরলের(LDL) অস্বাস্থ্যকর মাত্রা কমায়।

  • দ্রবণীয় ফাইবার
    দ্রবণীয় ফাইবার “খারাপ” কোলেস্টেরলের (LDL) মাত্রা হ্রাস করতে সহায়তা করে। বাঁধাকপি দ্রবণীয় ফাইবারের একটি ভাল উৎস। প্রায় ৪০% দ্রবণীয় ফাইবার বাঁধাকপি থেকে পাওয়া যায়।
  • উদ্ভিদ স্টেরলস
    বাঁধাকপির মধ্যে ফাইটোস্টেরল নামক পদার্থ থাকে। এগুলি হল উদ্ভিদ স্টেরলস যে কাঠামোগতভাবে কোলেস্টেরলের সাথে সমান এবং এগুলি পাচনতন্ত্রে কোলেস্টেরলের শোষণকে বাধা দিয়ে “খারাপ” কোলেস্টেরলের (LDL) হ্রাস করে। প্রতিদিন ১ গ্রাম করে ফাইটোস্টেরল গ্রহণ করার ফলে “খারাপ” কোলেস্টেরলের (LDL) ঘনত্ব ৫% কমে

ভিটামিন “কে” এর একটি দুর্দান্ত উৎস:

ভিটামিন “কে” ফ্যাট-দ্রবণীয় ভিটামিনগুলির সমষ্টি যা শরীরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর প্রধান কাজগুলির মধ্যে একটি হল রক্ত জমাট বাঁধার জন্য দায়ী এনজাইমগুলোর জন্য শক্তিবর্ধক হিসাবে কাজ করে। ভিটামিন “কে” দুটি প্রধান গ্রুপে বিভক্ত।

  • ভিটামিন কে১ (phylloquinone): মূলত ভিটামিন কে১ উদ্ভিদ থেকে পাওয়া যায়। বাঁধাকপি ভিটামিন কে১ এর এক দুর্দান্ত উৎস। দৈনিক আমাদের দেহে যে পরিমাণ ভিটামিন কে১ দরকার হয় তার ৮৫% এক কাপ বাঁধাকপি থেকে পেতে পারি।
  • ভিটামিন কে২ (menaquinone): ভিটামিন কে২ প্রাণীজ খাবার থেকে পাওয়া যায়। এটি বৃহদান্ত্রের ব্যাকটেরিয়া দ্বারাও উৎপাদিত হয়।

ভিটামিন কে ব্যতীত রক্ত সঠিকভাবে জমাট বাঁধার ক্ষমতা হারাবে এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়বে।

ওজন কমায়:

বাঁধাকপি ওজন কমাতে সাহায্য করে। বাঁধাকপিতে খুবই সামান্য পরিমাণে কোলেস্টেরল ও চর্বি রয়েছে। এছাড়া বাঁধাকপিতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার রয়েছে। যাঁরা ওজন কমাতে চান তাঁরা তাঁদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বাঁধাকপি রাখুন। বিশেষ করে বাঁধাকপির সালাদ।

ভিটামিন “সি” এর উৎস:

ভিটামিন “সি”, অ্যাসকরবিক অ্যাসিড নামেও পরিচিত যা আমাদের দেহে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের শরীরের যে প্রোটিনটি খুব বেশি পরিমাণে পাওয়া যায় সেটাই কোলাজেন নামে পরিচিত। ভিটামিন “সি” কোলাজেন তৈরিতে প্রয়োজন হয়। কোলাজেন ত্বকে কাঠামো এবং নমনীয়তা বজায় রাখে। এছাড়া হাড়, পেশী এবং রক্তনালী সঠিক ক্রিয়াকলাপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোলাজেন।

ভিটামিন “সি” আমাদের শরীরকে নন-হেম আয়রন শোষণ করতে সহায়তা করে। এটি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট। ফ্রি র‌্যাডিকাল দ্বারা সৃষ্ট ক্ষতি থেকে দেহকে রক্ষা করতে কাজ করে ভিটামিন “সি” যা ক্যান্সার সহ অনেক দীর্ঘস্থায়ী রোগের সাথে যুক্ত। সাম্প্রতিক ২১ টি গবেষণার বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, প্রতিদিন ১০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন “সি” গ্রহণের ফলে ফুসফুসে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি ৭% কমে গেছে। সবুজ এবং লাল দুই ধরনের বাঁধাকপি অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের দুর্দান্ত উৎস। সবুজ বাঁধাকপির থেকে লাল বাঁধাকপিতে প্রায় ৩০% বেশি পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। এক কাপ (৮৯ গ্রাম) টুকরা করা লাল বাঁধাকপিতে একটি ছোট কমলা লেবুর সমান ভিটামিন “সি” রয়েছে।

Share