ফল খেয়ে সুগার (ডায়াবেটিস) কমাতে চান, তাহলে প্রতিদিন একটা করে পেয়ারা খান।

আমাদের দেশে আমরা আমকে ফলের রাজা বলি। কোনো কোনো দেশে আনারস-কে ফলের রাজা বলা হয়। আম, আনারস যদি ফলের রাজা হয় তাহলে সুপার ফ্রুট পেয়ারাকে (guava) আমরা ফলের রানী বলতে পারি। সুঘ্রাণ, সুমিষ্ট স্বাদ এই ফলটি ছেলে বুড়ো সকলেই খেতে পছন্দ করে। পেয়ারা শুধু সুস্বাদু একটি ফলই নয়, পুষ্টিগুণেও ভরপুর।

সবুজ এই ফলটিতে ভিটামিন সি, ভিটামিন এ, আঁশ, পানি, কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, পটাসিয়াম, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম ইত্যাদি পুষ্টি উপাদান রয়েছে। ফলটি সম্পূর্ণ পেকে হলুদ হয়ে গেলে খুবই নরম হয়ে যায় এবং সুন্দর গন্ধ চারিদিক ছড়িয়ে পড়ে। পেয়ারার ভেতরের মাংসল অংশ সাদা, গোলাপি, লাল, হলুদ বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকে। পেয়ারার বৈজ্ঞানিক নাম Psidiun guajava. এরা Myrteae পরিবারের সদস্য একরকমের সবুজ রঙের বেরী জাতীয় ফল।

মধ্য আমেরিকাকে পেয়ারার আদি আবাসস্থল হিসাবে গণ্য করা হয়। পেয়ারা উষ্ণপ্রধান অঞ্চলের ছোট-মাঝারি বৃক্ষ যেটা বহুল পরিচিত তার পুষ্টিগুণ ও ঔষধি গুণের জন্য। গ্রীষ্মপ্রধান ও প্রায় গ্রীষ্মমন্ডলীয় অর্থাৎ গরম আবহাওয়ায় পেয়ারা ভালো জন্মে।পেয়ারাতে ক্যালরি খুব কম থাকে। ফাইবার বেশি থাকে, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ভিটামিন ও মিনারেলে পরিপূর্ণ। তাই এই ফলটিকে গ্রীষ্মমন্ডলীয় এলাকায় আপামর জনগণের আপেল হিসাবে বিবেচনা করা হয় অর্থাৎ গরীবের আপেল বলা হয়।

বাংলাদেশের প্রায় সকল জেলাতে পেয়ারা ভালো জন্মে। তবে দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে বরিশালের স্বরূপকাঠী, ঝালকাঠি, পিরোজপুরে পেয়ারার চাষাবাদ বেশি হয়ে থাকে। খুলনা ও বাগেরহাটেও ভালো পেয়ারা জন্মে। চট্টগ্রামের কাঞ্চননগর, কুমিল্লা ,ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নাটোরেও পেয়ারার ভালো ফলন হয়ে থাকে।

তবে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হলো একটি পেয়ারাতে একটি কমলালেবুর তুলনায় দুই থেকে পাঁচগুন বেশি ভিটামিন সি বিদ্যমান।

বিজ্ঞানীদের করা গবেষণায় দেখা গেছে যে, সারাবছর জুড়েই শরীর সুস্থ রাখতে পেয়ারার কোনো তুলনা হয় না। শরীরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যাতে ঠিকমতো কাজ করতে পারে সেজন্য পেয়ারার অবদান অনস্বীকার্য। কম খরচে শরীরকে চাঙ্গা রাখতে অসাধারণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে এই ফলটির মধ্যে।

তো আসুন বন্ধুরা জেনে নেই, পেয়ারার অসামান্য সব উপকারীতাঃ

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে :

পেয়ারায় উচ্চ মাত্রায় ভিটামিন “সি” পাওয়া যায়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে এই ভিটামিন”সি”- এর জুড়ি মেলা ভার। প্রতিরোধী ব্যাবস্থা মজবুত তো সহজে রোগবালাই শরীরের ধারে ঘেঁষতে পারে না। পেঁয়ারা একটু পেঁকে নরম হয়ে গেলে বিশেষ করে ভেতরের নরম মিষ্টি সাদা অংশ বাচ্চারা ও বৃদ্ধরা খেতে পছন্দ করে।

রক্তে সুগারের মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে :

পেয়ারায় রয়েছে প্রচুর পরিমানে ফাইবার, যা রক্তে শর্করার মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ডায়াবেটিস রোগীরা কোনো চিন্তা ছাড়াই পেয়ারা খেয়ে যেতে পারেন। গ্লাইকেমিক ইনডেক্সে পেয়ারার অবস্থান একেবারে নিচের দিকে।

কোষ্টকাঠিন্য দূর করে :

ফলের জগতে উচ্চমাত্রার ফাইবার সমৃদ্ধ যে ফলগুলো রয়েছে তার মধ্যে পেয়ারার অবস্থান একেবারে উপরের দিকে। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া আমাদের প্রতিদিনের কাজ। আর এটা সহজ ও সুখকর না হয়ে যদি হয় কষ্টকর ও ব্যাথা এবং রক্তপাতযুক্ত তাহলে জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিসহ। পেয়ারা পেটের রোগ দূর করার পাশাপাশি কোষ্টকাঠিন্যতা সমস্যা দূর করে।

হার্টের স্বাস্থ্যকে বুস্ট করতে পারে :

পেয়ারায় রয়েছে উচ্চমাত্রার ভিটামিন “সি”-সহ অন্যান্য আরো অনেক ভিটামিন ও এন্টিঅক্সিডেন্টস যেগুলি আমাদের হার্টকে রক্ষা করে ফ্রি-রাডিক্যালস-এর দ্বারা ক্ষতির হাত থেকে। পেঁয়ারাতে বিদ্যমান উচ্চস্তরের দ্রবণীয় ফাইবার ও পটাসিয়াম হৃদরোগের উন্নতিতে অবদান রেখে চলেছে।

ওজন হ্রাস করতে সহায়তা করে :

পেয়ারা হলো একটি লো-ক্যালরি স্ন্যাক। একটি ফলের মধ্যে কেবলমাত্র ৩৭ ক্যালোরি এবং আপনার জন্য প্রস্তাবিত দৈনিক ফাইবার খাওয়ার ১২% ।অন্যান্য লো-ক্যালোরি স্ন্যাকগুলির বিপরীতে, এগুলিতে ভিটামিন এবং খনিজগুলি রয়েছে – তাই আপনি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিগুলি হারাচ্ছেন না। ফাইবারে পূর্ণ এবং ক্যালরি কম থাকে, এর অর্থ পেয়ারা আপনাকে পূর্ণ বোধ করতে অর্থাৎ পেট ভরিয়ে রাখতে এবং ওজন হ্রাসে সহায়তা করতে পারে।

হজমশক্তি বৃদ্ধি করে :

পেয়ারা ডায়েটরি ফাইবারের একটি দুর্দান্ত উৎস। নিয়মিত পেয়ারা খাওয়া মানে সুস্থ অন্ত্রের চলাচল এবং কোষ্ঠকাঠিন্য সাগরে। কেবলমাত্র একটি পেয়ারা আপনার প্রস্তাবিত দৈনিক চাহিদার ১২% ফাইবার সরবরাহ করতে পারে। গবেষণাগুলি সুপারিশ করে যে এটি ডায়রিয়ার তীব্রতা এবং সময়কাল হ্রাস করতে পারে।

দৃষ্টিশক্তির উন্নতি করে :

প্রচুর মাত্রায় ভিটামিন “এ” থাকার কারণে দৃষ্টিশক্তির উন্নত করে। সেই সঙ্গে ছানি পড়া, গ্লুকোমা ও অন্যান্য রোগ দূরে রাখে।

ত্বকের জন্য ভালো:

পেয়ারা ভিটামিন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর যা আমাদের ত্বকের জন্য দুর্দান্ত। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ত্বককে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে এবং ত্বকে বয়সের ছাপ দূর করতে সাহায্য করে।

এছাড়া পেয়ারার পাতার রস ত্বকে প্রয়োগ করলে ব্রণ নিরাময় হয়ে যায়। একটি টেস্ট-টিউব সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, পেয়ারা পাতার রসে থাকা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল এবং অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি বৈশিষ্টের কারনে ব্রণজনিত ব্যাকটিরিয়াকে ধংস করতে কার্যকর।

ব্রেইন পাওয়ার বৃদ্ধি করে:

পেয়ারায় উপস্থিত বি-৩ ও বি-৬ মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়। ফলে স্মৃতিশক্তি, বুদ্ধি ও মনোযোগের উন্নতি ঘটে।

গর্ভবতী মায়েদের জন্য ভালো :

এটি ভিটামিন সি, ক্যারোটিনয়েডস, ফোলেট, পটাশিয়াম, আঁশ এবং ক্যালসিয়াম প্রভৃতিতে সমৃদ্ধ। পেয়ারাতে প্রচুর পরিমাণে এন্টিঅক্সিডেন্ট ও পলিফেনল আছে যা ক্যান্সার প্রতিরোধক। ফোলেট থাকায় এটি গর্ভবতী মায়েদের জন্য ভালো। অধিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ পেয়ারা খেলে মেয়েদের ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।

পেয়ারার ন্যায় পেয়ারার পাতারও অনেক স্বাস্থ্যসুবিধা রয়েছে। পেয়ারা পাতা বেটে রস করে খেলে অর্থাৎ পেয়ারা পাতার নির্যাস মেয়েদের ঋতুস্রাবের সময়ের বিভিন্ন সমস্যা, ডায়াবেটিস, হার্ট-সহ অনেক সমস্যার উপশম করে থাকে।

সতর্কতাঃ

যা খাবেন পরিমাণমতো খাবেন। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়। আপনার শরীরের অবস্থা বুঝে খাবেন। আপনি যদি কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত হন বা নিয়মিত কোনো মেডিকেল কোর্স-এর ভেতর দিয়ে যান তাহলে অবশ্যই আপনার ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী খাবেন।

Share