প্রাকৃতিক উপায়ে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা সমাধান করার উপায়।

গ্যাস্ট্রিক বা গ্যাস এই শব্দটির সাথে আমরা সবাই কম বেশি পরিচিত। খাবারে একটু অনিয়ম হলেই শুরু হয়ে যায় গ্যাস্ট্রিক আর তারপর শুরু হয় পেটে ব্যথা। অনেক সময় সাধারণ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা সৃষ্টি করে আলসার। তাই শুরুতেই আমাদের সতর্ক হওয়া জরুরি।

কেন গ্যাস্ট্রিক হয়?

গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য গ্যাস্ট্রিক কেন হয় তা জানতে হবে। গ্যাস্ট্রিক হজম পদ্ধতিতে দুটি উপায়ে হতে পারে। প্রথমত খাওয়ার সময় বা তরল পান করার সময় আমাদের অজান্তেই অনেক সময় আমাদের শরীরে অক্সিজেন এবং নাইট্রোজেনের মতো বায়ু প্রবেশ করে। দ্বিতীয়ত আমাদের পরিপাকতন্ত্রে যখন খাদ্য হজম হয়, তখন হাইড্রোজেন মিথেন বা কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মতো গ্যাস নির্গত হয় এবং পেটে জমা হয়। আর এটাকেই গ্যাস্ট্রিক বলা হয়।

যেসব খাবারগুলির কারণে গ্যাস্ট্রিক হয়

  • উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার কারণ আঁশযুক্ত খাবার ও শাকসবজি বেশি খেলে পাকস্থলী তার সবটা সহজে পরিপাক করতে পারে না। কিছু খাবার অপরিপাক অবস্থায় চলে যায় ক্ষুদ্রান্ত্রে। সেখানে কিছু ব্যাকটেরিয়া ওসব খাবার খায়। এসব ব্যাকটেরিয়ার আয়ু খুবই কম তাই অল্প সময়েই মারা যায় এবং মৃত ব্যাকটেরিয়াগুলো থেকে গ্যাস্ট্রিক তৈরি হয়।
  • সময় মতো না খাওয়া।
  • উচ্চ ফ্যাট কন্টেন্টযুক্ত খাবার খাওয়া।
  • তেলে ভাজা বা মশলাদার খাবার খাওয়া।
  • কার্বনেটেড পানীয় পান করা।
  • মটরশুটি এবং মসুর ডাল।
  • ক্রুসিফেরাস শাকসব্জী যেমন: ফুলকপি এবং ব্রকলি
  • ল্যাকটোজযুক্ত খাবার যেমন: দুধ, পনির এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত খাবার।

গ্যাস্ট্রিক(Gas) দূর করার প্রাকৃতিক উপকরণ

ফাস্ট ফুড খাওয়া, সঠিক সময় ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন না করা অনেক সময় গ্যাস্ট্রিক সমস্যাযর কারণ হয়ে দাড়ায়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা ঔষুধ খেতে পারি কিন্তু এসব ঔষুধের নিজস্ব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। তাই সহজেই গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমরা কয়েকটি প্রাকৃতিক প্রতিকার বেছে নিতে পারি। নিচে সেগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

শারীরিক কার্যকলাপ:

ব্যায়াম গ্যাস্ট্রিক এবং গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা দূর করতে সহায়তা করে। গ্যাস্ট্রিক এড়াতে খাবারের পরে হাঁটার চেষ্টা করুন। দড়ি লাফ, দৌড় বা হাঁটা গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে।

দারুচিনি:

দারুচিনি গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা সমাধানে বিশেষভাবে কার্যকরী। এটি অ্যাসিডিটি, পেটে ব্যথা এবং পেটের গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা সমাধান করে। কফি বা গরম দুধে দারুচিনি গুঁড়ো মিশিয়ে পান করতে পারেন। তবে যদি দুধে সমস্যা থাকে তাহলে দুধ খাবেন না। এছাড়া এক কাপ পানিতে কয়েক টুকরো দারুচিনি দিয়ে ৩-৪ মিনিট ফুটিয়ে নিন। গরম দারুচিনির পানির সাথে একটু মধু মিশিয়ে চায়ের মতো এটি দিনে ২/৩ বার পান করতে পারেন। এতে উপকার পাবেন।

লেবু:

গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করতে তৃতীয় প্রতিকারটি হল লেবু। গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা থেকে কিছুটা মুক্তি পাওয়ার জন্য লেবু পানি বা লেবু চা পান করা ভাল উপায়। এক চিমটি কালো লবণ, জিরা গুঁড়ো, লেবুর পানিতে মিশিয়ে খেতে হবে। এটি গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করতে দুর্দান্ত।

বেকিং সোডা:

বেকিং সোডা পেটের অ্যাসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা থেকে তাৎক্ষণিক রেহাই পেতে সাহায্য করে। ১ গ্লাস পানিতে ১-২ চা চামচ বেকিং সোডা মিশিয়ে পান করুন। ভালো ফলাফল পাবেন। ২০১৩ সালের একটি স্টাডি অনুসারে, প্রাপ্তবয়স্কদের ২৪ ঘন্টায় আধা চা-চামচ সাত বারের বেশি খাওয়া উচিত নয় এবং ৬০ বছরের বেশি বয়স হলে আধা চা-চামচ তিন বারের বেশি নয়।

প্রচুর পরিমাণে পানি পান:

প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন। এটি শুধু আপনার গ্যাস্টিকের সমস্যা কমাবে না আরো অনেক রোগের হাত থেকে মুক্তি দেবে। প্রতিদিন কমপক্ষে ৬-৮ গ্লাস পানি পান করার চেষ্টা করুন।

পুদিনা পাতা:

পুদিনা পাতা পেটের গ্যাস্ট্রিক ও বমি বমি ভাব দূর করতে সহয়াতা করে। গ্যাস্টিকের ব্যথা যখন অল্প তখন থেকে অল্প কিছু পুদিনা পাতা মুখে নিয়ে ভাল করে চিবুতে থাকুন। দেখবেন কিছুক্ষণের মধ্যে ব্যাথা অনেকটা কমে গেছে। এছাড়া এক কাপ পানিতে কয়েকটি পুদিনা পাতা দিয়ে সিদ্ধ করুন। এটি দিনে ২/৩ বার পান করতে পারেন। স্বাদ বাড়াতে এতে মধু যোগ করতে পারেন।

আলুর রস:

আলু গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করে। আলু বেটে কিংবা ব্লেন্ডারে ব্লেন্ডা করে রস বের করে নিন। এবার এই রস প্রতিবার খাওয়ার আগে খেয়ে নিন। এভাবে তিন বেলা খাওয়ার আগে আলুর রস খেলে কয়েকদিনের মধ্যেই গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে।

আদা:

আমাদের রান্না ঘরের অতিপরিচিত উপাদান হলো আদা। পেটে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করার জন্য আদা প্রাকৃতিক উপাদান হিসাবে কাজ করে। পাশাপাশি এটি বদহজমও দূর করে থাকে। এক্ষেত্রে আদা চা এবং আদা পানি পান করতে পারেন। আদা পানি তৈরি করতে ১-২ টুকরো আদা ৪ কাপ পানিতে সিদ্ধ করুন। তারপর ছেঁকে নিয়ে পান করার আগে লেবুর রস বা মধু যোগ করতে পারেন। এতে করে পেটের গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর হবে। তবে প্রতিদিন আদা খাওয়া ৩-৪ গ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখুন।

লবঙ্গ:

লবঙ্গ অতি পরিচিত একটি মসলা। এটির অনেক ঔষধি গুনাগুন রয়েছে। লবঙ্গ বা লবঙ্গ তেল হজম এনজাইম উৎপাদন করে ফোলাভাব এবং গ্যাস্ট্রিক কমাতে করতে সহায়তা করে। এক্ষেত্রে ২/৩ টি লবঙ্গ মুখে নিয়ে ভালোভাবে চিবিয়ে খেতে পারেন বা লবঙ্গ চা খেতে পারেন। লবঙ্গ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করার সাথে সাথে আমাদের নিঃশ্বাসকে সতেজ রাখতেও সাহায্য করবে।

মৌরি:

মৌরি বদহজমের পাশাপাশি অন্যান্য গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা যেমন- বমি বমি ভাব এবং ফোলাভাব দূর করতে পারে। ১-২ চা চামচ মৌরি ১ গ্লাস পানিতে দিয়ে ১০ মিনিট ধরে ফুটিয়ে নিন। তারপর উষ্ণ গরম অবস্হায় খেয়ে নিন। অথবা মৌরি চিবিয়ে খেতে পারেন।

ভেষজ চা:

পুদিনা পাতা, ক্যামোমিল, রাসবেরি এবং ব্ল্যাকবেরি একসাথে মিশিয়ে তৈরী করুন ভেষজ চা। যা হজম প্রক্রিয়া ঠিক রাখতে সাহায্য করে। আর হজম প্রক্রিয়া ঠিক থাকলে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা অনেকাংশে কমে যায়।

আপেল সিডার ভিনেগার:

পানি বা চায়ের সাথে এক টেবিল চামচ আপেল সিডার ভিনেগার মিশিয়ে নিন। খাওয়ার আগে আপেল সিডার ভিনেগার মিশানো পানি বা চা পান করুন। ভালো ফলাফল পেতে দৈনিক তিনবার পর্যন্ত পান করতে পারেন।

কীভাবে আমরা গ্যাস্ট্রিক প্রতিরোধ করতে পারি

আমরা জীবনযাত্রার অভ্যাস এবং ডায়েট পরিবর্তনের পদক্ষেপের মাধ্যমে গ্যাস্ট্রিক প্রতিরোধ করতে পারি। নিচে কয়েকটি পদক্ষেপ দেওয়া হলো:

  • খাবার সময় সুস্থ্য হয়ে বসে আস্তে আস্তে খেতে হবে।
  • সোডা এবং অন্যান্য কার্বনেটেড পানীয় এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতে হবে।
  • ধূমপান এড়িয়ে চলতে হবে।
  • রুটিন অনুযায়ী চলার চেষ্টা করুন যেমন: খাওয়ার পরে হাঁটাচলা করা।
  • গ্যাস্ট্রিক হয় এমন খাবারগুলি এড়িয়ে চলতে হবে।

গ্যাস্ট্রিক বেদনাদায়ক হতে পারে তবে এটি সাধারণত বিপজ্জনক নয়। যদি গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা বা ফোলাভাবের জন্য সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে আমরা ডায়েট এবং জীবনযাত্রার দিকে নজর দিতে পাড়ি। অনেক সময় জীবনযাত্রা এবং ডায়েটের পরিবর্তনের মাধ্যমে কিছুটা হলেও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করা যায়। এছাড়া আমরা ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে পারি।

Share