পালংশাক হাড়ের ক্ষয়রোধ করে, রক্তচাপ হ্রাস করে ও চোখের জন্য ভালো।

প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় মাছ, মাংসের পাশাপাশি শাক কিংবা তরকারি থাকবে না তা কি হয়। আমাদের খাদ্য তালিকায় যে সব শাক থাকে তার মধ্যে পালং শাক অন্যতম। এটি খুবই সুস্বাদু একটি শাক। নানা রকম অসুখ-বিসুখ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে পালংশাক। শাকের রাজা বললেও হয়তো কম বলা হবে। শুধু কি পুষ্টিগুণ সর্বদিক বিবেচনায় পালংশাক অনেক উপরে।

বাংলায় পালংশাক, ইংরেজিতে Spinach. ইটালিয়ান স্পিনাচি, জাপানীজ হোরেঞ্চ, কোরিয়ান চিগুমচি, স্প্যানিশ এসপিনাকা ইত্যাদি নামে পরিচিত এই শাকটি।

ভিটামিন K-তে এতটা সমৃদ্ধ শাক দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া কঠিন বা নেই বললেই চলে। এতে বিদ্যমান ১০টিরও বেশি ফ্ল্যাভোনয়েড ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে কাজ করে।

এছাড়া পালংশাক ভিটামিন “কে”, ভিটামিন “এ”, ভিটামিন “সি” এবং ফোলেটের পাশাপাশি ম্যাঙ্গানিজ, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন এবং ভিটামিন বি-2 এর একটি ভাল উৎস।

Amaranthaceae-পরিবারের এই সবজিটির বৈজ্ঞানিক নাম Spinacia oleracea. প্রাচীন পার্সিয়ায় প্রায় ২০০০ বছর আগে পালংয়ের উদ্ভব হয়েছিল বলে ধারণা করা হয় যেখান থেকে এটি ভারত ও প্রাচীন চীনে নেপাল হয়ে “পার্সিয়ান শাকসবজি” হিসাবে প্রবর্তিত হয়েছিল।

আমিষ কিংবা নিরামিষ দুটোতেই সমান যাই এই পালং। পালং পনির, পাঁচমিশালী সবজির সাথে পালং, পালং শাকের বড়া বা পাকোড়া, পালং পায়েস, মাছ দিয়ে পালংশাক, মাংস দিয়ে পালং কত যে বাহারি রকমের রান্না করা যাই এই পালংশাক দিয়ে। আর ইদানীং পালংশাকের জুসও খাওয়া হচ্ছে স্বাস্থ্যের সুরক্ষার জন্য।

পালংশাকের পুষ্টিগুণ

পালংশাক পুষ্টি গুনে সমৃদ্ধ। নিচে কয়েকটি গুরত্বপূর্ন পুষ্টি উপাদান দেওয়া হল –

  • শর্করা: ৩.৬ গ্রাম
  • ফাইবার: ২.২ গ্রাম
  • প্রোটিন: ২.৯গ্রাম
  • ভিটামিন “এ”(বিটা-ক্যারোটিন): ৫২% (%DV)
  • ভিটামিন “সি”: ৩৪% (%DV)
  • ভিটামিন “ই”: ১৩% (%DV)
  • আয়রণ: ২১% (%DV)
  • ক্যালসিয়াম: ১০% (%DV)
  • ম্যাগনেশিয়াম: ২২% (%DV)
  • ভিটামিন “কে”: ৪৬০% (%DV)

পালংশাকের উপকারিতা:

পালংশাকের স্বাস্থ্য উপকারিতা নিচে আলোচনা করা হলো –

চোখের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো

পালংশাকে থাকা বিটা ক্যারোটিন (ভিটামিন “এ”) আমাদের চোখের জন্য খুব ভালো। উচ্চ মাত্রার বিটা ক্যারোটিন চোখের ছানি পড়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। রেটিনার ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তির উন্নতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

রক্তচাপ হ্রাস করে

পালংশাকে আছে উচ্চ মাত্রার ম্যাগনেসিয়াম, যা রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। এছাড়াও রয়েছে উচ্চ পরিমাণে নাইট্র্রেট রয়েছে, যা রক্তচাপের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।

ক্যান্সার প্রতিরোধী:

পালংশাকে উচ্চ পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফাইবার এবং অন্যান্য যৌগ রয়েছে যা মানুষের ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধিকে দমন করতে পারে। প্রোস্টেট ক্যান্সার ও ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধে খুবই কার্যকর।

হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো:

পালংশাক ভিটামিন “কে” সমৃদ্ধ। ভিটামিন “কে” ফ্যাট-দ্রবণীয় ভিটামিনগুলির একটি গ্রুপকে বোঝায় যা রক্ত জমাট বাঁধা, হাড়ের বিপাক এবং রক্তের ক্যালসিয়ামের স্তর নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

এ ছাড়া পালংশাকে রয়েছে ভিটামিন ডি, ভিটামিন সি, আঁশ, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম। তাই এটি আমাদের হাড়কে শক্ত ও মজবুত করতে সাহায্য করে এবং দাঁত ও হাড়ের ক্ষয়রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এছাড়া এটা সূর্যের অতি বেগুলি রশ্নি থেকে আমাদের ত্বককে রক্ষা করে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে:

পালং শাকে আলফা-লাইপোইক এসিড নামে পরিচিত একটি অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট রয়েছে, যা গ্লুকোজের মাত্রা কমিয়ে, ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ায় এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের ফ্রী রাডিক্যালের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে।

হার্ট ভালো রাখে:

হার্টের রোগে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ মৃত্যু বরণ করে। পালংশাকে ফলিক এসিড থাকায় এটি হার্ট এর সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।

রক্ত স্বল্পতা দূর করে:

পালংশাকে ২১% আইরন রয়েছে যা লোহিত রক্ত কণিকার ঘাটতি দূর করে রক্ত স্বল্পতা দূর করতে সাহায্য করে। এছাড়াও এই আইরন আমাদের চুল পড়ার মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।

পেশি ও স্নায়ুর উন্নতি:

পালং শাক ডায়েটরি ম্যাগনেসিয়ামের অন্যতম সেরা উৎস যা শক্তি বিপাক, পেশী এবং স্নায়ুর ক্রিয়া বজায় রাখতে খুবই জরুরি। ম্যাগনেসিয়াম আমাদের শরীরে কয়েকশত জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

স্বাস্থ্যকর ত্বক এবং চুল:

পালং শাকগুলিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ রয়েছে, যা ত্বক এবং চুলকে ময়েশ্চারাইজ করার জন্য চুলের ফলিকগুলিতে তেল উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে। এই তেলটিই ব্রণ তৈরি করতে পারে। ত্বক এবং চুল সহ সমস্ত শারীরিক টিস্যুগুলির বিকাশের জন্যও ভিটামিন ‘এ’ প্রয়োজনীয়।

কোলাজেন তৈরি এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উচ্চ ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ পালং শাক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা ত্বক এবং চুলের কাঠামো সরবরাহ করে। আয়রনের ঘাটতি চুল পড়ার একটি সাধারণ কারণ। পালংশাকের মতো আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের পর্যাপ্ত পরিমাণে খাওয়ার মাধ্যমে তা প্রতিরোধ করা যেতে পারে।

মস্তিষ্কের জন্য ভালো:

পালংশাকে রয়েছে এন্টি-অক্সিডেন্ট যা মস্তিষ্কের কোষগুলোকে সতেজ এবং কর্মক্ষম রাখে। এটি স্মৃতিশক্তি এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে খুব কার্যকর।

যে কোনো সবুজ শাক বা সবজি আপনার স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ভালো। তাই প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় সবুজ শাক বা সবজি রাখুন।

Share