পাঁকা আমের অসাধারণ স্বাস্থ্য উপকারীতা জেনে নিন।

আমের একটি সাধারণ ডাক নাম (nick-name) প্রতিষ্ঠিত হয়ে রয়েছে। সেটি হলো: ফলের রাজা। সুস্বাদু, রসে ভরা পাঁকা আমের অসাধারণ স্বাদ আমরা যখন গ্রহণ করি তখন প্রতিটি কামড়ের সাথে আসা অসীম স্বাস্থ্য সুবিধার কথা আমরা ভাবি না। মিষ্টত্ব, সুগন্ধ ও অসাধারণ স্বাদের বাইরে পাকা আমে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে যা আমাদের সর্বোত্তম স্বাস্থ্য নিশ্চিত করে।

সত্যি কথা বলতে, পাঁকা আম সম্পর্কে বা পাঁকা আমের স্বাস্থ্য সুবিধার কথা বলতে বেশি ভূমিকার দরকার নেই। আমের বৈজ্ঞানিক নাম Mangifera Indica। এটি ভারত, পাকিস্তান এবং ফিলিপাইনের জাতীয় ফল এবং বাংলাদেশের জাতীয় গাছ। সুমিষ্ট, মনোরম, আনন্দদায়ক পৃথিবীর সকল মানুষের কাছে সমান জনপ্রিয় একটি ফল হলো পাঁকা আম। স্বাদের কথা আর কি বলবো-মহার্ঘ, আশ্চযজনক এই ফলটি অতুলনীয় পুষ্টিগুনে ভরপুর।

ফলের রাজা আমের আদি আবাসস্থল হলো ইন্ডিয়া। উত্তর-পূর্ব ভারত, বাংলাদেশ ও মায়ানমারে প্রায় ২৫-৩০ মিলিয়ন বছর আগে সর্বপ্রথম আমের চাষ করা হয়। হিন্দু ধর্মগ্রন্থে যে কয়টি ফলের নাম পাওয়া যাই তার মধ্যে আম অন্যতম। গৌতম বুদ্ধের খুব প্রিয় ছিলো এই আম। এছাড়া তিনি আম্রকুঞ্জের ছায়ায় শান্ত নির্মল পরিবেশের মধ্যে ধ্যান করতেন।

সত্যি বলতে, শৈশবের সেই মধুর দিনগুলো কিভাবে ভুলি। শৈশবে ভাইবোন ও খেলার সাথীরা মিলে খেলতে খেলতে, প্রতিদন্দ্বিতা করতে করতে আম কুঁড়িয়ে জড়ো করা ও খাওয়া। এছাড়া ঝড়ের পরে আম কুঁড়াতে যাওয়া আসলে এগুলো ভোলার মতো নয়।

স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর চিপস, চকলেট, জুস, বিস্কুট, কেক, আইসক্রিম ২-৩ বছর বাচ্চা থেকে শুরু করে স্কুল পড়ুয়া বাচ্চাদের প্রতিদিনের খাবার হয়ে দাড়িয়েছে। আর্টিফিশিয়াল রং, সেন্ট, বিভিন্ন কেমিক্যাল দিয়ে বানানো এসব খাবার বাচ্চাদের না খাইয়ে পাকা আম খেতে দিন। এতে শরীরের পুষ্টির চাহিদা পুরণের পাশাপাশি পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়বে।

পাঁকা আমের উপকারীতা

১. সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখে :

নিউট্রিয়েন্টস জার্নাল কতৃক প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে আমে বিদ্যমান ভিটামিনস ও অন্যান্য উপাদান এতটা স্বতন্ত্র ও চিত্তাকর্ষক যা আমাদের গোটা স্বাস্থ্যের উপর খেয়াল রাখে। পাঁকা আম পটাসিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ এবং উচ্চ রক্তচাপের জন্য এটি একটি দুর্দান্ত প্রতিকার। এছাড়া পাঁকা আমে সেলেনিয়াম, ক্যালসিয়াম, লোহা এবং ফসফরাস রয়েছে। পাঁকা আমকে ভিটামিনের পাওয়ার হাউস বলা হয়। এতে রিবোফ্লাবিন, ভিটামিন B৬, ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, ভিটামিন কে, নিয়াসিন,ফোলেট, থিয়ামিন এবং প্যানটোথেনিক অ্যাসিড পাওয়া যায়। এগুলো রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।

২. ক্যান্সারের বিপক্ষে লড়াই করে :

আমে ইসোকুয়েরসিট্রিন, কোয়ারসেটিন, অস্ট্রাগালিন, গ্যালিক অ্যাসিড, ফিসেটিন এবং মিথাইল গ্যালেট্ অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমূহ রয়েছে যেগুলো স্তন, কোলন, লিউকেমিয়া ও প্রস্টেট ক্যান্সার থেকে আমাদের দেহকে রক্ষা করে।

৩. কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে :

আপনি একটা আম খেলেন মানে আপনি প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি, ফাইবার ও পেক্টিন গ্রহণ করলেন। এই উপাদানগুলো আপনাকে সিরাম কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া আম পটাসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামেরও ভালো উৎস যা আমাদের রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক রাখে।

৪. মায়েদের শরীরের আয়রন ও ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ :

আমাদের বাংলাদেশে এখনো রক্তস্বল্পতায় ভোগা রোগীর সংখ্যা একেবারে কম নয়। তাই রক্তশুন্যতা দূর করতে পাকা আম খান। গর্ভবতী মায়েদের গর্ভকালীন সময়ে অতিরিক্ত আয়রন ও ক্যালসিয়ামের দরকার হয়। পাঁকা আম গর্ভবতী মায়েদের আয়রন ও ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণের সর্বোত্তম একটি খাবার। এছাড়া মায়েদের মেনোপজ বা রজোবন্ধ সময়েও এটি আইরন ও ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ করে।

৫. কিডনি পাথর কমানো :

পাঁকা আম কিডনি পাথর গঠনের ঝুঁকি হ্রাস করে।

৬. হজম শক্তি বাড়ায় ও ওজন কমায় :

আমে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন রয়েছে। পুষ্টিগুণে ভরপুর বিস্ময়কর এই ফলটি খেয়ে আপনি শুধু পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ হলেন তা নয়। সুস্বাদু এই ফলটি খাওয়ার পর কেমন যেনো পুরো শরীর ও মন ভালো হয়ে যায়। আপনি শরীর ও মনে তৃপ্তি অনুভব করবেন। আমরা সবাই জানি, আমে প্রচুর আঁশ(তন্তু) থাকে। এই আঁশ আমাদের পাকস্থলীর হজমের ক্রিয়াকলাপের্ উন্নতি সাধন করে। অতিরিক্ত ক্যালরিকে কমিয়ে শরীরের ওজন হ্রাসে সহায়তা করে।

আমে যে এনজাইমগুলি পাওয়া যাই সেগুলি প্রোটিন ভাঙ্গতে সাহায্য করে ও হজমে সহায়তা করে। Proboitic dietary ফাইবার, খনিজ ও ভিটামিন সমৃদ্ধ ফল “পাকা আম” হজম শক্তি বৃদ্ধির সর্বোত্তম একটি খাবার।

৭.শরীরের ক্ষারত্ব বজায় রাখে :

পাকা আমে টারটারিক এসিড, ম্যালিক এসিড ও সাইট্রিক অ্যাসিড পাওয়া যায়। এগুলো আমাদের শরীরের ক্ষারত্ব বজায় রাখতে সাহায্য করে।

৮. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে :

টক জাতীয় ফল সবসময় ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ভালো। আম এবং আমের পাতা ডায়াবেটিস রোগীর জন্য একটু বেশি ভালো। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, আম এবং আমের পাতায় পাওয়া মানজিফেরিন যৌগটিতে এন্টি ডায়াবেটিস,এন্টিহাইপেরলিপিডেমিক ও এন্টিএথেরোজেনিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। আম অতি মিষ্টি এবং এতে চিনির পরিমান বেশি হওয়া সত্বেও ভয়ের কিছু নেই। অতি মিষ্টি আম কম খান, টক আম বেশী করে খান। আমরা সবসময় মিষ্টি আম খুঁজি। কেনো জানিনা এটা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে।

ডায়াবেটিস রোগীরা রাতে বিছানায় যাবার আগে ১০ থেকে ১৫টি আম পাতা গরম পানিতে অল্প কিছুক্ষন ফুঁটিয়ে রেখে দিন। সকালে পাতাগুলো ছেঁকে ফেলে খালি পেটে পানি পান করুন। এই পদ্ধতি নিয়মিত অনুশীলন করলে ডায়াবেটিস রোগীর রক্তের শর্করার মাত্রা ব্যাবস্থাপনা ইতিবাচকহারে হ্রাস পায়।

৯. কামোদ্দীপক খাবার :

পাঁকা আমের আরো একটি পরিচিতি রয়েছে। অনেক মানুষ পাকা আমকে “প্রেমের ফল” বা “ভালোবাসার ফল” বলে থাকেন। পুরুষের বীর্য বাড়িয়ে দেয় অর্থাৎ পুরুষের পুরুষত্ব বা বীরত্ব বৃদ্ধি করার ক্ষমতা রয়েছে। আমের একটি নির্দিষ্ট পুষ্টি ভিটামিন ই রয়েছে যা সেক্স হরমোনগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সেক্স ড্রাইভকে বাড়িয়ে তোলে।

১০. তাপ স্ট্রোক প্রতিরোধ করে :

তাপ স্ট্রোক প্রতিরোধের জন্য পাকা আম টনিক হিসাবে কাজ করে। আম টুকরো টুকরো করে কেটে ব্লেন্ড করে মধু ও জল মিশিয়ে পান করুন। এটি শরীর ঠান্ডা করে ও হিট স্ট্রোক দূর করে।

১১. মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি :

পাকা আমে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি, বি ও ফোলেট রয়েছে যেটি আমাদের মস্তৃষ্কের ফাংশন সঠিকভাবে পরিচালনা করা ও মস্তৃষ্কের উন্নতির জন্য অতীব প্রয়োজনীয় কিছু পুষ্টি। এই ভিটামিনগুলো মুড নির্ধারণ ও ঘুমের নিদর্শন সংশোধন করতে অবদানকারী প্রধান নিউরোট্রান্সমিটারগুলোকে একত্রিত করতে সহায়তা করে। নার্ভ-এর কার্যকারীতা ঠিক রাখতে ও সুস্থ্য মস্তৃষ্কের জন্য পাকা আম খাদ্য তালিকায় রাখুন।

আম গ্লুটামিক এসিড সমৃদ্ধ যা আপনার মস্তিস্কের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আলফা-অ্যামিনো অ্যাসিড। আগামীকাল আপনার পরীক্ষা, উপস্থাপনা বা রিপোর্ট পেশ করার দিন। অর্থাৎ আগের দিন পাকা আম খান এবং পরের দিন তাজা মনে, সুস্থ্য ব্রেইন-এ পরীক্ষা দিন। যেসব শিশুরা পড়াশোনায় অমনোযোগী তাদের পড়াশোনায় মনোযোগ বৃদ্ধি ও স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির জন্য পাকা আম খেতে দিন।

১২. ব্রণ কমায় এবং ত্বক ও চুল ভালো রাখে :

পাঁকা আম ব্রণ কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া আমাদের ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। প্রচুর বিটা ক্যারোটিন থাকায় asthma প্রতিরোধ করে।

সতর্কতাঃ

কোনোকিছু অতিরিক্ত খাওয়া ঠিক নয়। অতিরিক্ত খেয়ে এলার্জি হলে কম করে খান।
আমের খোঁসা ও জুস-এ অনেকের এলার্জিক প্রবলেম দেখা দেয়। এজন্য যার সমস্যা সে এড়িয়ে চলুন।

Share