কোন ধরণের পেটের সমস্যায় কি খাবেন।

পেট ব্যথা বা পেটের সমস্যা মানেই একটা খারাপ দিন। পেট ব্যথা হলে দিনটাই কষ্টে কাটে। যতই বেছে খাবার খাওয়া হোক না কেনো পেটের সমস্যা দেখা দিতেই পারে। বমি ভাব, পেট ব্যথা, ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য পেটের সমস্যার লক্ষণ।

এমন কিছু খাবার আছে যে খাবারগুলি আপনার পেটের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করবে। নিচে এমন কিছু খাবার ও কোন ধরণের পেটের সমস্যায় কি খাবেন তা দেওয়া হলো –

আদা:

মসলার মধ্যে অন্যতম ভেষজ গুন সম্পন্ন মসলা হলো আদা। ৫০০ জনের চেয়ে বেশি গর্ভবতী মহিলাসহ ৬ টি সমীক্ষার পর্যালোচনাতে দেখা গেছে যে প্রতিদিন ১ গ্রাম আদা গ্রহণ করা গর্ভাবস্থায় ৫ গুণ বমি বমি ভাব কম ছিল।

কেমোথেরাপি বা বড় অস্ত্রোপচার করানো লোকদের জন্যও আদা সহায়ক। আদা এমনকি মোসান সিকনেস অসুস্থতার প্রাকৃতিক প্রতিকার হিসাবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
এছাড়া আদা দীর্ঘস্থায়ী বদহজমের কারণে পেটের উপরের অংশে বা বুকে ব্যথা কমাতে পারে আদা। ২৪ জন স্বাস্থ্যকর ব্যক্তিদের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, খাবারের আগে ১.২ গ্রাম আদা ৫০% পেটের সমস্যা দূর করতে পারে।

পুদিনা পাতা:

জ্বালাময়ী অন্ত্র সিনড্রোম বা IBS একটি দীর্ঘস্থায়ী অন্ত্র ব্যাধি যা পেটের ব্যথা, ফোলাভাব, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং ডায়রিয়ার কারণ হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যে পুদিনা পাতা এই অস্বস্তিকর লক্ষণগুলি হ্রাস করতে সহায়তা করতে পারে।

গবেষকরা বিশ্বাস করেন যে পুদিনা পাতার তেল পাচনতন্ত্রের পেশীগুলিকে শিথিল করে, পেট ব্যথা এবং ডায়রিয়া কমাতে সহায়তা করে। পুদিনা পাতা বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে কিডনির পাথর বা যকৃত এবং পিত্তথলির রোগজনিত রোগীদের পুদিনা পাতা খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়।

যষ্টিমধু:

যষ্টিমধু গ্লাইসিরিঝিজা গ্ল্যাব্রা প্ল্যান্টের (Glycyrrhiza glabra plant) শুকনো মূল থেকে আসে এবং এটি একটি প্রচলিত ঐতিহ্যবাহী ভেষজ ঔষধ যা বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হয়।

কিছু সমীক্ষা রিপোর্ট করেছে যে যষ্টিমধু আলসার-প্রতিরোধক এবং আলসারের সাথে লড়াই করার বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। যষ্টিমধু আলসার সম্পর্কিত ব্যথা কমাতে সহায়তা করতে পারে। গবেষকরা আরও জানিয়েছেন যে যষ্টিমধু পাওয়া যৌগ এইচ পাইলোরি (H. pylori infections) বৃদ্ধি রোধ করতে পারে।

পেঁপে:

পেঁপে বদহজমের প্রাকৃতিক প্রতিকার হিসাবে ব্যবহৃত হয়। পেঁপেতে রয়েছে পেপেইন, এটি একটি শক্তিশালী এনজাইম যা আপনার খাবারের প্রোটিনগুলি ভেঙে দেয় এবং হজম ও শোষককে সহজ করে তোলে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে নিয়মিত পেঁপে গ্রহণ করলে কোষ্ঠকাঠিন্য কমে যায়। পেঁপে আলসারের জন্য ঐতিহ্যগত প্রতিকার হিসাবে পশ্চিম আফ্রিকার কয়েকটি দেশেও পেঁপে ব্যবহৃত হয়। দৈনিক পেঁপে খেলে পাচক যন্ত্রনা নিরাময় হয়।

পেট ঠিক রাখতে অনেকেই আবার কাঁচা পেঁপে খান। এটা অনেকটাই ঔষুধের মতো কাজ করে। পেঁপেতে থাকা পাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য, অ্যাসিডিটি বা অম্লতা, পাইলস ও ডায়রিয়া দূর করতে পারে।

কাঁচকলা:

সংক্রমণ বা খাদ্যজনিত কারণে প্রায়শই ডায়রিয়ার হয়ে থাকে। বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত বাচ্চাদের কাঁচকলা রান্না করে দেওয়ায় ডায়রিয়ার তীব্রতা এবং সময়কাল হ্রাস করতে সহায়তা করে।

ডায়রিয়া বা পেটের যেকোনো সমস্যায় কাঁচকলা ভর্তা বা কাঁচকলা দিয়ে পাতলা ঝোল ঔষুধের থেকেও বেশি কার্যকরী। এতে থাকে এনজাইম, যা ডায়রিয়া এবং পেটের নানা ইনফেকশন দূর করে। তাই ডায়রিয়া হলে চিকিৎসকেরা কাঁচকলা খাওয়ার পরামর্শ দেন।

কাঁচ কলাতে থাকা প্রতিরোধী স্টার্চ এবং পেকটিন অন্ত্রের ভালো ব্যাকটিরিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি করে। তাছাড়া পেটের ভিতরের খারাপ ব্যাকটেরিয়া দূর করে দেয়। ব্যাকটিরিয়া, প্রতিরোধী স্টার্চ এবং পেকটিন এই দুই ধরণের ফাইবার প্রক্রিয়াজাত করে, উপকারী শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করে। শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড বিভিন্ন হজমেজনিত সমস্যায় সহায়তা করতে পারে।

ইলেক্ট্রোলাইটস পানীয়:

পেট খারাপ হলে বমি বা ডায়রিয়ার হয়ে থাকে। এই সময়ে শরীরে তখন পানিশূন্যতা দেখা দেয়। বমি বমিভাব এবং ডায়রিয়া আপনার দেহের খনিজগুলি বের করে দেয় অর্থাৎ ইলেক্ট্রোলাইটস হ্রাস করে। ইলেক্ট্রোলাইটস আপনার দেহের তরল ভারসাম্য বজায় রাখে।

হালকা ডিহাইড্রেশন এবং ইলেক্ট্রোলাইট পূরণ করার জন্য প্রাকৃতিকভাবে ইলেক্ট্রোলাইটস যেমন সোডিয়াম এবং পটাসিয়ামযুক্ত খাবার খেয়ে খেতে হবে। যেমন পানি, ফলের রস, ডাবের পানি, স্পোর্টস ড্রিঙ্কস ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতা পুনরুদ্ধার করতে সাহায্য করে।

জোয়ান:

জোয়ান মূলত পেটের রোগের জন্য প্রচলিত আয়ুর্বেদিক ঔষধে ব্যবহার করা হয়। এটি বদহজম এবং পেট ফাঁপা সারাতে কার্যকরী। এটি পেট পরিষ্কারক হিসাবে ব্যবহার করা হয়। অম্লতা কমাতে এটি ঔষধ হিসাবে কাজ করে।

জোয়ান পেট ভালো রাখে এবং বদহজম হলে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা যেমন পেট ব্যথা, পেট জ্বালা, গ্যাস-অম্বলের ভাব, পেটে বায়ুর উদ্রেক হওয়া, বমি বমি ভাব প্রভৃতির হাত থেকে মুক্তি দেয়।

জিরা পানি:

বহু দিন ধরে জিরা পানি আমাদের হজম শক্তি বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি হজম এনজাইমগুলির ক্রিয়াকলাপ বৃদ্ধি করে হজমের গতি বাড়িয়ে তোলে। হজমে সমস্যা আছে ৫৭ জন রোগীর এক গবেষণায় দেখা গেছে, দুই সপ্তাহ ধরে ঘন ঘন জিরা পানি গ্রহণের ফলে হজমে উন্নতি হয়েছে।

জিরা পানি গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করতে সহায়তা করে। যাদের গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা রয়েছে তারা ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নিয়মিত জিরা পানি পান করতে পারেন।

হরিতকী:

নিয়মিত হরিতকী খেলে হজম শক্তির কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। পেট ফাঁপা এবং অন্যান্য গ্যাস্ট্রিক (গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল) সমস্যা কমাতে পারে। রাতে ঘুমাতে যাবার আগে সামান্য বিট লবণ, লবঙ্গ বা দারুচিনির সঙ্গে হরিতকীর গুঁড়ি মিশিয়ে খান। এতে পেট পরিষ্কার থাকবে। এছাড়া কোষ্ঠকাঠিণ্যতা দূর করে হরিতকী।

মৌরি চা:

গ্যাস্ট্রিক বা ডায়রিয়ার সমস্যায় মৌরি চা খুবই কার্যকরী। মৌরি চা হজমজনিত সমস্যাগুলি দূর করে হজম শক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। তাই যাদের হজমজনিত সমস্যা আছে তারা মৌরি চা খাওয়ার অভ্যাস করতে পারেন।

থানকুনি পাতা:

থানকুনি পাতা সকল ধরনের পেটের রোগের মহৌষধ। থানকুনি পাতা বেটে খাওয়া সবথেকে ভালো। পাতা বেটে মিহি করে একটু লবন ও সর্ষের তেল সহযোগে গরম ভাতের সঙ্গে খান। এছাড়া থানকুনি পাতা কাচ কলা বা দয়া কলা ও আলু দিয়ে ঝোল রেঁধেও খেতে পারেন। এভাবে খেলে বদহজম, ডায়রিয়া, আমাশয় ও পেটব্যথা সেরে যায়। মুখে রুচি আনে।

দই:

সারাদিন আমরা যে, কত রকমের খাবার খাচ্ছি তা বলা মুশকিল। এছাড়া বুঝে হোক বা না বুঝে-বাইরের খোলা খাবারও আমরা খেয়ে থাকি প্রায়শ। ফলে হজমে গরমিল শুরু হয়ে যায়। তার ফলে পেটে ব্যাথাসহ পেটের নানা অসুবিধা দেখা দেয়।

দইয়ে থাকে প্রচুর পরিমাণে প্রোবায়োটিক অর্থাৎ উপকারী ব্যাকটেরিয়া। উদাহরণ হিসেবে ল্যাকটোব্যাসিলাস অ্যাসিডোফাইলাস নামক ব্যাকটেরিয়ার কথা বলা যায়। দইয়ের মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিয়া মানুষের পৌষ্টিকতন্ত্রে পৌঁছয় ও খাদ্য হজমে সাহায্য করে।

দই আমাদের হজম শক্তি বাড়িয়ে তোলে যার ফলে আমাদের শরীরের পরিপাক শক্তি বাড়ে এবং পেটের সমস্যা দূর হয়ে যায়। খাবার খাওয়ার পর দই খেলে তা খাবার পরিপাক হতে সাহায্য করে। দই আমাদের পেটের আলসার হওয়ার সম্ভবনা কে অনেকটাই কমিয়ে দেয়।

ধনিয়া:

ধনিয়া হজমে সমস্যা দূর করতে পারে। জ্বালাময়ী আন্ত্রিক সিন্ড্রোমসহ ৩২ জন লোকের মধ্যে ৮-সপ্তাহের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, একটি ধনিয়াযুক্ত ভেষজ ঔষধের ৩০ ফোঁটা রোজ তিনবার খেয়ে পেটে ব্যথা, ফোলাভাব এবং অস্বস্তি থেকে উপশম হয়েছে। তাই যারা বদহজমের সমস্যায় ভুগছেন তারা খাবারের সঙ্গে অথবা সরাসরি ধনিয়া বীজ খাওয়া শুরু করুন। ভালো ফল পাবেন।

এলাচ:

এলাচ গ্যাস্ট্রিক সমস্যা প্রতিরোধ করে। এটি ডাইজেস্টিভ সিস্টেমকে সক্রিয় রাখে এবং হজমে সাহায্য করে। এলাচ পেটের যে কোনো সমস্যা যেমন- বদহজম নিরাময়ে সহায়তা করে।

হজমে সহায়তা করতে এলাচ হাজার বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অস্বস্তি এবং বমিভাব দূর করতে এটি প্রায়শই অন্যান্য ঔষধি মশলার সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করা হয়। এলাচের সর্বাধিক গবেষিত বিষয় হলো এটি পেটের সমস্যাগুলি দূর করার পাশাপাশি আলসার নিরাময় করতে পারে।

অন্য আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, এলাচের নির্যাস গ্যাস্ট্রিক আলসারগুলির আকারকে কমপক্ষে ৫০% হ্রাস করতে পারে।

মধু:

হজমের সমস্যা দূর করতে প্রতিদিন সকালে মধু খাওয়ার অভ্যাস করতে পারেন। মধু পেটের অম্লভাব কমিয়ে হজম প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। হজমের সমস্যা দূর করার জন্য সকালে খালি পেটে এক চামচ মধু কিন্তু খুবই উপকারী।

ডাবের পানি:

ডাবের পানিতে আছে প্রয়োজনীয় ইলেক্ট্রোলাইট যা শরীর আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে। এই ইলেক্ট্রোলাইট প্রাকৃতিকভাবেই মানব শরীরে পাওয়া যায় কিন্তু শরীর পানিশূন্য হলে বা অসুস্থ হলে শরীর থেকে এর পরিমাণ কমে যায়। ডাবের পানি এটা প্রাকৃতিকভাবে পূরণ করতে সাহায্য করে।

রেফারেন্স:

Share