কচুর মুখী হজমে ভালো, ডায়াবেটিসে ভালো ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

বাঙালির রসনার সন্তুষ্টি বিধানে কচুর মুখীর অবদান অনেক। গরম ভাত আর কচুর মুখী দিয়ে রান্না করা এক বাটি চিংড়ি বা ইলিশ মাছের ঝোল। ব্যাস থালা একদম পরিষ্কার মুহূর্তেই।

গরম ভাতে কচুর মুখী ভর্তা বা ট্যাংরা, পার্সে, রুই ইত্যাদি মাছের সাথে কচুর মুখী বা গাটি কচুর কেমিস্ট্রিও একেবারে অনবদ্য।

কচুর মুখী বা Eddoe (or Eddo), Taro বা  কচু,  Dasheen বা কচুশাক -এরা সব একই গোত্রের।

মুখী আলুর বিকল্প বিশেষ করে গ্রীষ্ম অঞ্চলের মানুষের আলু হিসাবে বিবেচিত হয়। কচু Araceae গোত্রভুক্ত একধরনের কন্দ জাতীয় উদ্ভিদ।

কচু মানুষের চাষকৃত প্রাচীন উদ্ভিদগুলোর মধ্যে একটি। রাস্তার পাশে, বাড়ির আনাচে কানাচে, বিভিন্ন পতিত জমিতে অনাদরে-অবহেলায় অনেক সময় কচু জন্মাতে দেখা যায়। কচু বহু জাতের হয়ে থাকে।

Eddo বা কচুর মুখী বা গাটি কচু একটি স্টার্চ জাতীয় সবজি। এর চারদিকে ছোট ছোট চুল রয়েছে। প্রথম উৎপত্তি ভারতে তারপরে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

এটির অনেক আশ্চর্যজনক স্বাস্থ্য উপকারিতা রয়েছে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Colocasia antiquorum.

বনে জঙ্গলে যেসব কচু আপনা আপনি জন্মায় সেগুলকে সাধারণত “বুনো কচু” বলা হয়। এ ধরনের কচুর অনেকগুলো জাত মানুষের খাবারের উপযোগী নয়।

মুখী কচু একটি সুস্বাদু সবজি। এ সবজি খরিফ মৌসুমের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই এর চাষ হয়।

মুখী কচু বাংলাদেশের গুঁড়া কচু, কুড়ি কচু, ছড়া কচু, দুলি কচু, বিন্নি কচু, ইত্যাদি নামে ও পরিচিত।মুখী কচুতে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন ‘এ’ এবং লৌহ থাকে।

Eddoe বা কচুরমুখী সবজি কী?

Eddoe বা কচুরমুখী হল ছোট মূলের সবজি। এটি আলু, মিষ্টি আলু এবং Yams-এর কাছাকাছি স্বাদযুক্ত এবং এগুলোর বিকল্প হিসাবে খাওয়া যায়।

মুখী কচুর স্বাস্থ্য উপকারিতা:

Dasheen বা Taro-এর মতো Eddoe বা কচুর মুখীতে ডায়েটারি ফাইবার এবং কার্বোহাইড্রেটের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, সি, ই ও  বি-6, রয়েছে।

এছাড়া ফোলেট, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, দস্তা, ফসফরাস, পটাসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, এবং কপার রয়েছে। নিচে মুখী কচুর স্বাস্থ্য উপকারিতা আলোচনা করা হলো –

হজম স্বাস্থ্য ভালো করে:

প্রোটিনের স্বাস্থ্যের সুবিধাগুলি সম্পর্কে আমরা প্রচুর শুনি এছাড়া আমিষ অর্থাৎ মাছ মাংসের দিকে আমাদের নজরও বেশি। ডিম, মাছ, মাংস ছাড়া তিনবেলা ভাত খেতে পারি না।

এতে প্রোটিনের চাহিদা পূরণ হলেও ফাইবার গ্রহণের কথা আমাদের ভাবতে হবে। হজম স্বাস্থ্যে ফাইবার একটি বড় ভূমিকা পালন করে।

ফাইবার হল কোলন বা মলাশয়ের কোষগুলি সুস্থ্য রাখতে ব্যবহৃত জ্বালানী। ফাইবার অন্ত্রের স্বাস্থ্য ঠিক রেখে পাচনতন্ত্রকে প্রবাহিত রাখতে সহায়তা করে।

বিশেষত শাকসবজিতে পাওয়া ডায়েট্রি ফাইবারগুলি অন্ত্রের গতিবিধি নিয়মিত রাখতে সহায়তা করে। ফাইবার আমাদের মলের পরিমাণ বৃদ্ধি করে এবং হজমে সহায়তা করে।

হাই ফাইবারযুক্ত ডায়েট গ্রহণকারী ব্যক্তিরা কম ফাইবারযুক্ত ডায়েট খাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় কোষ্ঠকাঠিন্যের হার অনেক কম থাকে, পাশাপাশি তাদের কোলনে হেমোরয়েডস এবং ডাইভার্টিকুলা কম থাকে।

ক্যান্সার প্রতিরোধ করে:

Eddo বা এডো রুট বা কচুর মুখী আমাদের দেহের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্রিয়াকলাপেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কচুর মুখীর মধ্যে পাওয়া উচ্চ স্তরের ভিটামিন এ, সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস করে এবং আমাদের শরীর থেকে ফ্রি র‌্যাডিকেলগুলি নির্মূল করতে সহায়তা করে।

আমেরিকান একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যার মধ্যে বলা হয়েছে যে ক্রিপ্টোক্সানথিন, যা কচুর মুখীতে পাওয়া যায়, যা ফুসফুস এবং ওরাল ক্যান্সার হ্রাস করে।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধ:

কচুর মুখীতে ফাইবার রয়েছে যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ভালো কাজ দেয়।

ফাইবার এমন একটি শর্করা যা আমাদের পরিপাকতন্ত্রকে ভালো রাখে এবং ফাইবার যেহেতু পুরোপুরি হজম হয় না তাই এটি আমাদের রক্তে সুগারের উপর কোনো কার্যকারী প্রভাব ফেলে না।

এছাড়া কচুতে যে, প্রতিরোধী স্টার্চ থাকে এটিও রক্তের শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি করে না।

ডায়েট্রি ফাইবারগুলি ডায়াবেটিসের বিকাশের সম্ভাবনা হ্রাস করতেও সহায়তা করতে পারে কারণ এটি শরীরে ইনসুলিন এবং গ্লুকোজ নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ করে।

হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখে:

ফাইবার এবং প্রতিরোধী স্টার্চ আমাদের হার্টের রোগের ঝুঁকি কমাতেও সহায়তা করতে পারে। কচুর মুখী ফাইবার এবং প্রতিরোধী স্টার্চ এর দুর্দান্ত উৎস।

গবেষণায় দেখা গেছে যে, বেশি পরিমাণে ফাইবার গ্রহণের ফলে আমাদের হার্টের রোগের ঝুঁকি হ্রাস পায়।

অন্য আরেকটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, প্রতিদিন অতিরিক্ত ১০ গ্রাম ফাইবার খাওয়ার ফলে, হার্টের রোগের কারণে মারা যাওয়ার ঝুঁকি ১৭% হ্রাস পেয়েছিল।

এবং কঁচুতে থাকা প্রতিরোধী স্টার্চ কোলেস্টেরলকে হ্রাস করে হার্টের রোগের ঝুঁকি কমায়।

দৃষ্টি শক্তি বৃদ্ধিতে:

কচুর মুখীতে বিটা ক্যারোটিন এবং ক্রিপ্টোক্সানথিন সহ বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে।

এই অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টগুলি মুক্ত রেডিক্যালগুলিকে প্রতিরোধ করে এবং ম্যাকুলার অবক্ষয় বা চোখে ছানি পড়া রোধ করে দৃষ্টিশক্তি উন্নত করতেও সহায়তা করতে পারে।

ত্বকের যত্ন:

যখন আমরা ভিটামিন “ই” এবং ভিটামিন “এ” ডায়েটে যুক্ত করি তখন আমাদের ত্বক ভালভাবে সুরক্ষিত থাকে।

এই উভয় ভিটামিন ত্বক সুস্থ্য রাখতে এবং সামগ্রিক সেলুলার স্বাস্থ্যের উন্নয়নে কাজ করে, যার অর্থ আমাদের ক্ষত এবং দাগগুলি দ্রুত নিরাময় করে এবং একটি স্বাস্থ্যকর আভা ত্বকে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে:

স্বাস্থ্যের জন্য কচুর মুখীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কার্যটি হলো প্রতিরোধ ব্যবস্থাতে এর ভূমিকা। এটিতে ভিটামিন সি, ই ও এ রয়েছে যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করে।

এছাড়া ম্যাগনেসিয়াম জিংক-সহ আরো কয়েকটি জীবনরক্ষাকারী মিনারেলসও রয়েছে। এগুলি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

আইরনের চাহিদা পূরণ:

আমরা জানি যে, কচুর সাথে আয়রনের ভালোবাসা যেনো সেই জন্ম থেকেই। কচুর মুখীতে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন

আরো একটা কথা আমরা অনেকেই জানি যে, গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকরা সহজে আয়রন বা লৌহ পাওয়ার জন্য বেশি করে কচু খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

সুস্বাদু কচুর মুখী আয়রনের চাহিদা পূরণে দারুন একটি আইটেম। গর্ভস্থ অবস্থা, খেলোয়াড়, বাড়ন্ত শিশু, কেমোথেরাপি পাচ্ছে- এমন রোগীদের জন্য কচুর মুখী ভীষণ উপকারী।

সতর্কতাঃ

কচুর মুখী বা Eddo রান্নার আগে ভালোভাবে ধুলে এবং পুরো করে ওপরের অংশ কেটে বাদ দিলে অথবা রান্না করার সময় কিছু পরিমাণ লেবুর রস, ভিনেগার অথবা তেঁতুল গোলা পানি দিলে অপালেটের দানা দূর করা যায়।

আর এই অপালেটের দানা দূর হওয়ার কারণে কচু খেলেও গলা ধরবে না।

যা কিছু খাবেন পরিমাণমতো খাবেন। আপনার শরীরের অবস্থা বুঝে খাবেন।

অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়। আপনি যদি কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত হন বা নিয়মিত কোনো মেডিকেল কোর্স-এর ভিতর দিয়ে যান তাহলে খাবার আগে অবশ্যাই আপনার ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী খাবেন।

রেফারেন্স: