অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার অভ্যাস কিডনি ও লিভারের জন্য ক্ষতিকর।

চিনি পছন্দ করে না এমন মানুষ পাওয়া যাবে না। বাচ্চাদের চিনি খুবই পছন্দের। শুধু বাচ্চাদেরই নয় অনেক সময় আমরা বড়রা চিনি দেখে লোভ সামলাতে পারি না। বতর্মানে বেশিরভাগ খাবারে প্রচুর পরিমাণে চিনি থাকে। যেমন আইসক্রিম, কেক, পেস্ট্রি, ড্রিঙ্কস, চকলেট, সফট বিস্কিট এবং এনার্জি ড্রিঙ্কস ইত্যাদি। রেস্টুরেন্টের খাবার, বাড়িতে রান্না করা খাবারে ও আমরা চিনি ব্যবহার করে থাকি। চা বা কফি চিনি ছাড়া তো চলেই না।

চিনি এক প্রকার শর্করা, যা আমাদের দেহে শক্তি যোগায়। তাই অনেকের ধারণা চিনি আমাদের শরীরের জন্য ভালো। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন ব্যক্তি দিনে তিন থেকে পাঁচ চামচ চিনি খেতে পারেন। তবে সেই ক্ষেত্রে অন্য খাবার থেকে কতটুকু শর্করা আসছে এবং কতটুকু খরচ হচ্ছে তা খেয়াল রাখতে হবে।

প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় যে শর্করা জাতীয় খাবার থাকে, তাতে যে পরিমাণ চিনি থাকে, তা আমাদের দেহে গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়। পরে দেহে তা শক্তি উৎপাদন করে। আমাদের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় খাদ্য তালিকায় যে শকর্রা জাতীয় খাবার থাকে তাতে যে পরিমাণ চিনি বিদ্যমান থাকে তা আমাদের দেহে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি চিনি গ্রহণ করলে দেহের জন্য তা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা সহজে বিশ্বাস করি না যে, চিনি আমাদের দেহের জন্য ক্ষতিকর।

যাদের পারিবারিক ভাবে ডায়াবেটিস হওয়ার প্রবণতা আছে, তাদের জন্য চিনি ক্ষতিকর। এছাড়া, অতিরিক্ত চিনি খেলে ওজন বেড়ে যায়, এটি কিডনির রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে, দাঁতের জন্যও ক্ষতিকর।

চিনির ক্ষতিকর দিক

যখন দেহে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি চিনি (sugar) গ্রহণ করা হয় তখন তা দেহের জন্য উপকারী না হয়ে বরং ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়ায় এবং প্রচুর শারীরিক অসুবিধা দেখা দেয়। নিচে চিনির ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরা হলো –

ফ্যাটি লিভার হতে পারে:

চিনিতে যে ফ্রুকটোজ থাকে সেটা ফ্যাটি লিভারের (মোটা হয়ে যাওয়া) জন্য দায়ী। গ্লুকোজ এবং অন্যান্য ধরণের সুগার শরীরের বিভিন্ন কোষ দ্বারা শোষিত হয়, সেখানে লিভার সরাসরি ফ্রুক্টোজকে ভেঙে শক্তিতে রূপান্তরিত করে। তবে ফ্রুক্টোজের পরিমাণ বেশি হলে লিভার তা চর্বিতে পরিণত করে। এই চর্বি ফ্যাটি লিভারের জন্য দায়ী। এটা একটি লিভারের রোগ যা NAFLD নামে পরিচিত।

ওজন বৃদ্ধি হতে পারে:

স্থূলত্বের হার বিশ্বব্যাপী দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। এটার জন্য চিনি বা মিষ্টিযুক্ত পানীয়কে অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। ফ্রুক্টোজ সমৃদ্ধ মিষ্টি পানীয় যেমন সোডা, জুস বা মিষ্টি চা খেলে আমাদের ক্ষুধা বৃদ্ধি পায় এবং খাওয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়।

অতিমাত্রায় ফ্রুক্টোজ গ্রহণ করলে আমাদের শরীর লেপটিন নামক হরমোন নিঃসরণ কমিয়ে দেয়। এই লেপটিন হরমোন আমাদের অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখে। অন্য কথায় বলা যায় চিনি জাতীয় এসব পানীয় আমাদের ক্ষুধা নিবারণ করে না বরং অতিরক্ত ক্যালরি গ্রহণ করতে তাড়িত করে। এটাই ওজন বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ।

হার্টের রোগের ঝুঁকির কারণ:

বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর এক নম্বর কারণ হলো হার্টের রোগ। উচ্চ-চিনিযুক্ত খাবার হার্টের রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। এটা প্রমানিত যে, উচ্চ-চিনিযুক্ত খাবার স্থূলত্ব, উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইড, রক্তে শর্করার এবং রক্তচাপের বাড়তে পারে যা হার্টের রোগের ঝুঁকির কারণ।

৩০,০০০ জনেরও বেশি লোকের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, যারা চিনি থেকে ৮% ক্যালরি গ্রহণ করেছে তাদের তুলনায় যারা ১৭-২১% ক্যালোরি গ্রহণ করেছিল তাদের হার্টের রোগে মারা যাওয়ার ঝুঁকি ৩৮% বেশি ছিল।

ব্রণের জন্য দায়ী:

রিফাইন্ড কার্বহাইড্রেড ফুড, মিষ্টিজাতীয় খাবার ও পানীয় ব্রণ হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। প্রসেসড মিষ্টি জাতীয় উচ্চ গ্লাইসেমিক সূচক খাবার নিম্ন গ্লাইসেমিক সূচক খাবারের চেয়ে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, স্বল্প-গ্লাইসেমিক খাবার ব্রণ কমায়।

উদাহরণস্বরূপ ২,৩০০ কিশোর-কিশোরীদের এক সমীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, যারা ঘন ঘন চিনি খাই তাদের ব্রণ হওয়ার ঝুঁকি ৩০% বেশি থাকে।

টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে:

গত ৩০ বছরে বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিসের প্রকোপ দ্বিগুণ হয়েছে। যদিও এর অনেকগুলি কারণ রয়েছে তবে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির অন্যতম কারণ। স্থূলতা বা ওজন বৃদ্ধি যা প্রায়শই খুব বেশি পরিমাণে চিনি খাওয়ার ফলে হয়ে থাকে। এটি ডায়াবেটিসের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ হিসাবে বিবেচিত হয়।

দীর্ঘায়িত উচ্চ-চিনি সেবন করা ইনসুলিনের (অগ্ন্যাশয়ের দ্বারা উৎপাদিত হরমোন) প্রতিরোধকে বৃদ্ধি করে। ইনসুলিন প্রতিরোধের ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

১৭৫ টিরও বেশি দেশ নিয়ে গঠিত একটি জনসংখ্যার সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, প্রতিদিন ১৫০ ক্যালরি চিনি ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি ১.১% বৃদ্ধি করে।

ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে:

অতিরিক্ত পরিমাণে চিনি খাওয়া ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। চিনিযুক্ত খাবার এবং পানীয় স্থূলত্বের দিকে নিয়ে যায়, যা ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।

৪৩০,০০০ জনেরও বেশি লোকের একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, চিনির ব্যবহার প্লুরাল ক্যান্সার এবং ছোট অন্ত্রের ক্যান্সারের ঝুঁকির সাথে জড়িত ছিল। অন্য একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, যেসব মহিলারা প্রতি সপ্তাহে আধা বারের চেয়ে কম মিষ্টি রুটি এবং কুকিজ খেয়েছিলেন তাদের তুলনায় যেসব মহিলারা প্রতি সপ্তাহে তিন বারের বেশি মিষ্টি রুটি এবং কুকিজ খেয়েছিলেন সেসব মহিলাদের মধ্যে এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা ১.৪২ গুণ বেশি ছিল।

হতাশার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে:

স্বাস্থ্যকর ডায়েট মেজাজ উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে। প্রক্রিয়াজাত ও চিনিযুক্ত খাবার হতাশার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলতে পারে। উচ্চ চিনিযুক্ত পণ্য যেমন কেক এবং পানীয় গ্রহণ মানসিক হতাশার সাথে সম্পর্ক রয়েছে। গবেষকরা বিশ্বাস করেন যে রক্তে শর্করার মাত্রা, নিউরোট্রান্সমিটার ডিসরেগুলেশন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য চিনি ক্ষতিকর হতে পারে।

২২ বছর ধরে ৮০০০ জনের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রতিদিন যেসব লোকেরা ৪০ গ্রামের চেয়ে কম পরিমাণে চিনি খেয়েছিল তাদের তুলনায় যারা ৬৭ গ্রাম বা তার বেশি চিনি খেয়েছে সেসব লোকেদের হতাশা ২৩% বৃদ্ধি পেয়েছে।

ত্বকের বলিরেখা বৃদ্ধি করে:

বলিরেখা বার্ধক্যের প্রধান লক্ষণ। আমাদের শরীরে চিনি এবং প্রোটিন বিক্রিয়া করে অ্যাডভান্সড গ্লাইকেশন এন্ড প্রোডাক্টস (AGEs) তৈরি হয়। ধারণা করা হয় AGEs ত্বকের বয়েসের ছাপ বাড়ায়। কোলাজেন এবং ইলাস্টিন আমাদের ত্বকের যৌবন ধরে রাখে। AGEs, কোলাজেন এবং ইলাস্টিনের ক্ষতি করে। কোলাজেন এবং ইলাস্টিন (elastin) ক্ষতিগ্রস্থ হলে, ত্বক তার দৃঢ়তা হারায়।

অন্যান্য ক্ষতিকর দিক:

বেশি পরিমাণে চিনি খাওয়ার ফলে ক্যাভিটিস হতে পারে। প্রতিনিয়ত রক্তে উচ্চ মাত্রার শর্করা যদি আমাদের রক্তে থাকে তাহলে কিডনির সাথে সংযুক্ত রক্তনালীর ক্ষতি করতে পারে। এটি কিডনির রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। শর্করা রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বাড়ায়। উচ্চ-চিনিযুক্ত খাবার স্মৃতিশক্তি হ্রাস করতে পারে।

Share